খাগড়াছড়িখাগড়াছড়ি সংবাদপাহাড়ের সংবাদবিশেষ প্রতিবেদনশিরোনামস্লাইড নিউজ

খাগড়াছড়িতে জমে উঠেছে নারীদের অনলাইন বেচাকেনা 

বিশেষ প্রতিবেদক: পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়ি শহর জুড়ে চাহিদা বেড়েছে অনলাইনে বেচা-কেনা। এতে করে লাভবান হচ্ছে বেকার যুবক-যুবতীরা। সুবিধা ভোগ করছে সর্ব মহলের মানুষ।

গেলো বছর দেশে মহামারি করোনা ভাইরাসের দেখা মিলে। এরপর নিজেদের সচেতন রাখতে মানুষ ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দেয়। সরকারিভাবে বন্ধ ঘোষনা করা হয় বিভিন্ন দোকানপাট।
দেশে করোনা বেড়ে যাওয়ায় কিছু সংখ্যক তরুণ-তরূণী নিত্য প্রয়োজনীয় পন্য নিয়ে অনলাইনে হাজির হয় মানুষের মাঝে। দিনে দিনে বাড়তে থাকে মানুষের মাঝে চাহিদা। বেড়ে উঠতে শুরু করে নতুন আরো উদ্যোক্তা।
গত একবছরে করোনাকালে খাগড়াছড়ি জেলা শহরে সচেতন মহলের মাঝে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অনলাইনে কেনাকাটা। তারা তাদের চাহিদা অনুসারে অর্ডার করে বাসায় বসে সুবিধা নিচ্ছে এই সকল উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে।
জেলা শহরে অনলাইন বেচাকেনার মধ্যে সবছেয়ে বেশি অংশ নিয়েছে নারীরা। তারা তাদের হাতে বানানো পন্য নিয়েই ব্যবসায়ীক কার্যক্রম চালাচ্ছে। তাদের দেখে নতুন অনেকে এই কাজের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে।
অনলাইনে বেচাকেনার জন্য সহজ হয়েছে বায় এন্ড সেল খাগড়াছড়ি নামে ২০ হাজার সদস্যের একটি গ্রুপ। এখান থেকে মানুষ অর্ডার করে বিভিন্ন উদ্যোক্তার কাছে। পণ্য হাতে পাওয়ার পর আবার রিভিউ দিয়ে আরো জনপ্রিয় করে তোলে মানুষের মাঝে।
এই অনলাইন গ্রুপে তরুন তরুণীরা তাদের হাতে বানানো পণ্য থেকে শুরু করে মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় সকল জিনিস নিয়ে গ্রুপে পোস্ট করে থাকে। সাধারণ মানুষ তাদের চাহিদা অনুসারে অর্ডার করলে বিক্রেতারা তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।
জেলা শহরের অনলাইনে কেক বিক্রেতা এক নারী তামান্না আক্তার বলেন, এই করোনাকালে আমি অনলাইন গ্রুপে পোস্টের মাধ্যমে নিজের হাতে বানানো বিভিন্ন প্রোগ্রামের কেক, দই বানিয়ে অর্ডার অনুসারে বাসায় পৌঁছে দেওয়া শুরু করেছি। এতেকরে যেকেউ বাসায় বসে তারা তাদের সুবিধা অনুসারে প্রয়োজন মেঠাতে পারছে। আমিও এগুলো বিক্রি করে অর্জিত অর্থ দিয়ে নিজের পরিবারের বাড়তি জোগান দিতে পারছি। এটি আমার জন্য খুবই সুফল বয়ে আনবে। আশাকরি আমার নিজের বানানো পণ্য দিয়ে মানুষ সন্তুষ্ট করতে সক্ষম হয়েছি। তাই এখন অনেক চাহিদা বেড়েছে।
তাহারিমা সোলতানা শাকিলা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ছয় মাস হলো আমার নিজের হাতে বানানো বিরিয়ানি এবং মিষ্টি বানিয়ে এই অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে বেচাকেনা শুরু করেছি। ইতিমধ্যে আমি খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি। আশাকরি সাধারণ মানুষ আমাদের কাছ থেকে পন্য অর্ডার করে স্বস্তিবোধ করছে। যারফলে দিন দিন চাহিদা অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এভাবে চাহিদা থাকলে আমরা যারা নতুন উদ্যেগতা আছি তাদের সকলের জন্য সুফল বয়ে আনা সম্ভব হবে।
একবছর ধরে অনলাইনে এলোভেড়া ও আচার বিক্রি করা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আমি করোনার শুরু থেকেই অনলাইনে এলোভেড়ার টব ও বিভিন্ন ফলের আচাড় বানিয়ে বিক্রি শুরু করেছি। এ পর্যন্ত আমি লাখ টাকার বেশি পণ্য সরবরাহ করেছি। এতে করে করোনাকালে যে বেকার সময় বসে থাকতে হতো তা আর হয়নি। সময়টা ভালোকরে কাজে লাগাতে পেরেছি। কাজে লাগানোর কারণেই সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।
জেলা ও জেলার বাইরে অনলাইনে পণ্য বিক্রি করা শফিকুল ইসলাম বলেন, আগে থেকেই আমি অনলাইনে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করতাম। এই অনলাইন গ্রুপে যুক্ত হওয়ার পর থেকে করোনা মহামারিতে আরো অনেক বেশি বিক্রি করছি। আমি জেলার বাইরেও বিক্রি করে থাকি। পাহাড়ের বিভিন্ন মৌসুমি ফল সংগ্রহ করে অর্ডার অনুসারে পৌঁছে দেই গন্তব্য অনুসারে। এতে করে পাহাড়ের সুস্বাদু ফলগুলো সাধারণ মানুষ ভোগ করতে পারে সহজে। এই বিক্রির মাধ্যমে আমার যে অর্থ আয় হয় তা দিয়ে চলতে পারি।
মিষ্টি জাতীয় পণ্য বিক্রি করা জুয়েল দেবনাথ বলেন, আমি এই গ্রুপের মাধ্যমে করোনাকালে পণ্য বিক্রি শুরু করেছি। আমার সরবরাহ করা পণ্যগুলো মানে ভালো হওয়ায় এর চাহিদা অনেক বেড়েছে। আশাকরি এই অনলাইনে বিভিন্ন মিষ্টি জাতীয় পণ্য বিক্রি করে আমি সফল হতে পারবো।
কুশি পণ্য তৈরি করে অনলাইনে বিক্রি করা রোজিনা আক্তার বলেন, আমি নিজে বাসায় বসে বসে কুশি পণ্য তৈরি করে থাকি। এই পণ্যগুলো মেয়েদের গলার গহনা, চুড়ি, বেসলাইট, কানের দুলসহ আরো বিভিন্ন জিনিস। এগুলো দেখতে সুন্দর এবং টেকশই হওয়ায় মেয়েরা বেশি কিনে থাকে। আমিও এগুলো বানিয়ে বিক্রি করতে খুব উৎসাহ পাই। এই পণ্য দিয়ে ভবিষ্যতে ভালো কিছু করতে পারবো এটা আমার বিশ্বাস।
নারীদের বিভিন্ন প্রকার কাপড় বিক্রি করা যুঁথি নাথ বলেন, করোনা মহামারিতে অনেক নারীরা বাজারে আসেনি। অনলাইনে কেনাকাটা করেছে। ঈদের আগে আমি অনেক কাপড় সরবরাহ করেছি। চেষ্টা করেছি ক্রেতাদের মন জয় করে বিক্রি করতে। এখন পর্যন্ত যারা কিনেছে সবাই অনেক খুশি।
অনলাইনে পণ্য ক্রয় করা শামীমা আক্তার ঢাকা পোস্টকে জানান, দেশে মহামারি করোনা ভাইরাস শুরু হওয়ার পর থেকে কোথাও বের হওয়া সম্ভব হয়নি। তাই বাসায় বসে বায় এন্ড গ্রুপে বিভিন্ন জনের কাছে প্রয়োজনীয় পণ্য অর্ডার করে বাসার সামনে হাতে পেয়েছি। এতেকরে আমার অনেক সুবিধা হয়েছে। এই অনলাইন বেচা-কেনা চালু থাকলে খুব সহজে প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া সম্ভব। এটির মাধ্যমে মানুষ উপকৃত হবে অনেক বেশি।
অনলাইন গ্রুপের এডমিন হাসানুল করিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে পিছিয়ে পড়া এ জনপদে তরুণদের মধ্যে যে বেকার সমস্যা তা নিয়ে দীর্ঘদিন ভেবেছি। এখানে শিক্ষার্থীদের জন্য নেই কোন খন্ডকালীন অর্থ উপার্জনের ব্যবস্থা। এ ভাবনা থেকে Buy & Sell in Khagrachari ফেসবুক গ্রুপটি ক্রিয়েট করি। একইসাথে তরুণদের উদ্ভুদ্ধ করতে থাকি উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য। বর্তমানে এখানে নানান ধরণের উদ্যোগ নিয়ে বেকার শিক্ষার্থীরা কাজ শুরু করেছে যা জেলার বেকারত্ব দূরীকরনে সহায়তা করছে। অনেকেই ইতোমধ্যে লক্ষাধিক টাকার পণ্য বিক্রয় করেছে। এ ফেসবুক গ্রুপে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যাই বর্তমানে বেশি। ব্যাংকিং খাতে উদোক্তাদের জন্য বিনা সুদে লোন কিংবা অন্য কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এর পৃষ্টপোষকতা পেলে এ গ্রুপ নিয়ে আরও অনেকদূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে আমি মনে করি।