খাগড়াছড়িখাগড়াছড়ি সংবাদশিরোনামস্লাইড নিউজ

খাগড়াছড়িতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি: তিন পার্বত্য চট্রগ্রামের বিদ্যুৎ উন্নয়নের জন্য ব্যাপক উদ্যাগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচশো কোটি অর্থ বরাদ্দ দিয়ে আলাদা প্রকল্প গঠন করা হয়েছে। আর এ প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘তিনটি পার্বত্য জেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প’। ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে এই বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। যার মেয়াদ রয়েছে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু ২ বছর ১০ মাস সময় গত হলেও এখনো ৩০ শতাংশ কাজ শেষ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এদিকে যতটুকু কাজ সমাপ্ত করা হয়েছে সেখানেও রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ। পূর্বের তুলনায় বর্তমান যে বৈদ্যুতিক খুটিগুলো স্থাপন করা হচ্ছে তা অত্যন্ত নি¤œমানের এবং গুণগতমান সম্পন্ন নয়। ১৫ মিটারের বৈদ্যুতিক খুটি বোরিং করার কথা ৮ ফুট কিন্তু সেখানে করা হচ্ছে ৫-৬ ফুট।

খুটির গায়ে দেওয়া বোরিং চিহ্ন থেকে দুই-আড়াই ফুট কম বোরিং করা হচ্ছে। ফলে ঝড়-তুফানে বৈদ্যুতিক খুটি হেলে যাওয়ার ঝঁকি রয়েছে। খুটির নিচে প্লেট দেওয়ার নীতিমালা থাকলেও সব খুটির নিচে প্লেট দেওয়া হচ্ছেনা। যেকোন খুটি একবার দেবে গেলে বৈদ্যুতিক তার ছিড়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। লাইন সরু না রেখে কিঃ মিঃ বাড়ানোর জন্য অযৌক্তিকভাবে বিনা প্রয়োজনে এক একটি প্রধান সড়কে শতাধিক বার ৩৩ হাজার ভোল্টের বৈদ্যুতিক লাইন এপার ওপার করা হচ্ছে। খাগড়াছড়ি জেলার সবকটি উপজেলার প্রধান সড়কের পাশেই নজরে পড়বে এই খুটিগুলো। শুধু দীঘিনালার মধ্যবোয়ালখালী থেকে ডাঙ্গা বাজার পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার রাস্তায় প্রায় ৮০ বার রাস্তার এপার ওপার করা হয়েছে, যেখানে পুরাতন লাইন রাস্তার এপার ওপার করা হয়েছিল মাত্র ৫বার । ৩৩কেভি লাইন সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াা রাস্তা ক্রস করতে না পারার বিধান রয়েছে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে মানা হয়নি সে নীতিমালা। যার কারণে প্রধান সড়কে বৈদ্যুতিক ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। এদিকে দুই বছর ১০ মাস শেষ হয়েছে। বাকি রয়েছে আর মাত্র ২ মাস। এই দীর্ঘ সময় পার হলেও কিছু বৈদ্যুতিক খুটি বোরিং আর কিছু ইনসুলেটরের কাজ ছাড়া আর কোন কাজ শেষ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এখনও প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ বাকি রয়ে গেছে। এর মধ্যে খুটি বোরিং, ইনসুলেটর, তার সংযোজন, ফিটিং, আর্থিং তার, টানা ফুলবেন, ক্রস আর্ম, ৩ ফেজের ৮৫ টি ট্রান্সফরমার ও সিংগেল ফেজের ৭২ টি ট্রান্সফরমার কাজ শুরুই হয়নি। সরেজমিনে গেলে মাঝি পরিচয়দানকারী আরিফ বলেন, ৮ ফুট নয়, অফিস থেকে বলা হয়েছে ৭ ফুট করে গর্ত করতে। তবে আমরা অনেকসময় ৭ ফুট গর্ত করতে পারিনা ৬ ফুট করেও গর্ত করতে হয়। জায়গা বুঝে কখনো কখনো আরও কম গর্তও করতে হয়। আসলে বাস্তব হল, খুটিতে যে দাগ আছে, সে দাগ সমান গর্ত করার নিয়ম। সেটা হল ৮ফুট। খুটির নিচে প্লেট দিতে গেলে অনেক বড় গর্ত করতে হয়, অনেক সময়ের প্রয়োজন। আমরা সব গর্তে প্লেট দেইনা”।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্পের খাগড়াছড়ি জেলার মাঠ তত্ত্বাবধায়ক যতœ মানিক চাকমা বলেন, আমি মানুষ একজন। সব সময় সব সাইটে থাকতে পারিনা। কোথায় কি অনিয়ম হচ্ছে না হচ্ছে তা তথ্য পেলে আমরা সেটা দেখব। পিডিবি থেকে আমরা যতটুকু মালামাল পেয়েছি, আমরা ততটুকু কাজ করেছি। পিডিবি সময় মত আমাদের মালামাল দিতে পারেনি। এছাড়াও বড় বড় ঠিকাদাররা এখানে কখনো আসে না। উনারা সাব কন্টাক দেয়, সাব কন্টাক আবার সাব কন্টাক দেয়। এভাবে কাজ একটু স্লো হয়ে যায়। কোন অনিয়ম হওয়ার তো কথা না। ভাল করে কাজ করতে সবাইকে বলা আছে”। খাগড়াছড়ি পিডিবি নির্বাহী প্রকৌশলী কামাল উদ্দিন বলেন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্প কাজ শেষ করে আমাদের বুঝিয়ে দিলে আমরা সেটা বুঝে নিব। অবশ্যই কাজ ভালভাবে করতে হবে এবং নীতিমালা দেখে কাজ করতে হবে। কোথাও কমবেশি করা যাবেনা। তারা যদি কাজে কোন অনিয়ম বা গাফলতি করে সেটা আমাদের জন্য ক্ষতিকর। আমরা চাই তারা আমাদের ভালমত কাজ বুঝিয়ে দিক, অনিয়ম হলে আমরা কাজ বুঝে নিবনা। যেখানে প্রায় তিন বছরে ৩০ শতাংশ কাজ শেষ করা যায়নি সেখানে শতভাগ কাজ শেষ করতে কত বছর সময় লাগবে তাই যেন এখন দুঃশ্চিন্তাতার বিষয়।

তবে ‘তিনটি পার্বত্য জেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পে’র খাগড়াছড়ি জেলার দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ সাকিব হোসেন কাজে ধীরগতির বিষয়ে বলেন, মালামাল সময়মত না পাওয়ায় কাজে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে। তবুও আমরা অনেক কাজ শেষ করতে পেরেছি। এই মেয়াদে কাজ শেষ না হলে আরও এক বছরের জন্য কাজের সময়ের মেয়াদ বাড়ানো হবে। সব খুটির জন্য ৮ ফুট করে গর্ত করতে হবে, খুটির নিচে অবশ্যই প্লেট দিয়ে তা বোরিং করতে হবে। বিনা কারণে লাইন এপার-ওপার করা যাবেনা। কাজে কোন অনিয়ম সহ্য করা হবে না। আমরা অবশ্যই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিব।