খাগড়াছড়িখাগড়াছড়ি সংবাদপানছড়িপাহাড়ের সংবাদরামগড়শিরোনামস্লাইড নিউজ

‘জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ কর’ এই শ্লোগানে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

ডেস্ক রিপোর্ট: শান্তি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে বিভিন্ন স্থানে এলাকাবাসীর উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ কর’ এই শ্লোগানে ২ ডিসেম্বর ২০১৯, সোমবার খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা, দীঘিনালা, পানছড়ি, রামগড়, লক্ষীছড়ি এবং রাঙামাটির নান্যাচর উপজেলার ঘিলাছড়িতে এসব মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া মানিকছড়িসহ কিছু স্থানে সমাবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে এলাকার জনসাধারণ অভিযোগ করেছেন। সোমবার গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটি সহ সাধারণ সম্পাদক বরুন চাকমা স্বাক্ষরিত সংবাদ মাধ্যমে দেয়া এক প্রেনবার্তায় এ খবর দেয়া হয়েছে।

প্রেসবার্তায় বলা হয় বিভিন্ন এলাকায় অনুষ্ঠিত মিছিল-সমাবেশে সংঘাত চাই না, শান্তি চাই; ভাইয়ে ভাইয়ে হানাহানি বন্ধ কর; সকল জাতির জনগণ এক হও, লড়াই করো; গণতান্ত্রিক অধিকার চাই; মানবাধিকার নিয়ে বাঁচতে চাই; ভূমি বেদখল বন্ধ কর; জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি বন্ধ কর; চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা (ইত্যাদি) এক হও; তথাকথিত জাতীয় দলের লেজুড়বৃত্তি বন্ধ কর; পার্বত্য চুক্তি নিয়ে লুকোচুরি খেলা বন্ধ কর; কেবল নামে শান্তিচুক্তি নয়, প্রকৃত শান্তি চাই; ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে উস্কানি দেয়া বন্ধ কর–ইত্যাদি শ্লোগান সম্বলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করা হয়। এসব সমাবেশ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পার্বত্য চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়েছে।
বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত মিছিল-সমাবেশের খবর:
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা: খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোন ছড়া ও পেরাছড়া এলাকায় এলাকাবাসীর উদ্যোগে মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ভাইবোনছড়া এলাকাবাসীর উদ্যোগে সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে যুব সমাজের প্রতিনিধি জগৎ জ্যোতি চাকমার সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন ৫নং ভাইবোনছড়া ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান আপ্রুসি মারমা, মহিলা সদস্যা করুণাময়ী চাকমা, পেরাছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক অজিত বরণ চাকমা। এছাড়া মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন ইউপি সদস্য শান্তি রঞ্জন চাকমা। এছাড়াও সমাবেশে আরো উপস্থিত ছিলেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান কান্তি লাল দেওয়ান, ইউপি সদস্য মনোরঞ্জন চাকমা, সদস্য মতেন্দ্র লাল ত্রিপুরা প্রমুখ।
বক্তরা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার জনসংহতি সমিতির সাথে পার্বত্য চুক্তি সম্পাদন করেছে। কিন্তু সরকারের সদিচ্ছা না থাকায় পাহাড়ে মূল সমস্যাগুলোর সমাধান হয়নি, সমাধান হয়নি ভমি সমস্যার। বক্তরা বলেন, সরকার চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা বাস্তবায়নের দাবি করলেও আদতে আংশিক কিছু ধারা বাদে কোন কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারের এ ধরনের বক্তব্য অত্যন্ত হতাশাজনক। যা পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বড় বাধা। বক্তারা সরকারকে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন ও পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান।
বক্তরা পাহাড়ে সকল আঞ্চলিক দলগুলোর উদ্দেশ্য বলেন, চুক্তির পর আমরা ভাইয়ে ভাইয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছি। এই বিভক্তি জিইয়ে থাকলে চুক্তি বাস্তবায়ন কিংবা যেকোন ধরনের আন্দোলন কখনোই সফল হবে না। তাই সকল সমস্যা চিহ্নিত করে ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি, হানাহানি বন্ধ করে সকলকে দলমত নির্বিশেষে একত্রিত হতে হবে। তারা বলেন, ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের কারণে আমরা সবসময় ভাই, বন্ধু হারানোর ভয়ে থাকি। এবার আমরা এর থেকে পরিত্রাণ চাই। আমরা কোন মায়ের কোল খালি হোক তাই চাই না। সুতরাং সকল দলকে সংঘাতের পথ পরিহার করে একযোগে চুক্তি বাস্তবায়নসহ স্থায়ী শান্তি এবং মৌলিক মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।
একই দাবিতে সকাল সাড়ে ১১টায় উপজেলার পেরছড়া এলাকাবাসীর উদ্যোগে মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলটি গিরিফুল থেকে পেরাছড়ার দিকে যাওয়ার সময় বাধা দেয়া হয়। এরপর মিছিলকারীরা সেখানে রাস্তার মধ্যেই সমাবেশ করে। উক্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন পেরাছড়া ইইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড মেম্বার কান্তি বিকাশ চাকমা। এছাড়া সমাবেশে আরো উপস্থিত ছিলেন পেরাছড়া ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের মেম্বার জোসনা কান্তি ত্রিপুরা, ৫ নং ওয়ার্ডের নরেশ কুমার চাকমা ও ৬ নং ওয়ার্ডের সোনামনি চাকমাসহ এলাকার নারী-পুরুষ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। বক্তারা পার্বত্য চুক্তি যথাযথ বাস্তবায়নসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে নিপীড়ন-নির্যাতন বন্ধ করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।
পানছড়ি : পানছড়ি উপজেলার উল্টাছড়ি-লতিবান ও লোগাং-পুজগাং এলাকাবাসীর উদ্যোগে পৃথক পৃথকভাবে মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১০টায় উল্টাছড়ি-লতিবান এলাকাবাসী নালকাটা হতে মিছিল নিয়ে কুড়াদিয়াছড়া বাজারে গিয়ে এক সমাবেশে মিলিত হয়।
এতে উল্টাছড়ি লতিবান ইউপি মেম্বার আ¤্রা মার্মার সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন, লতিবান ইউনিয়ন চেয়ারম্যান কিরণ লাল ত্রিপুরা, কার্বারী এসোসিয়েশনের খাগড়াছড়ি জেলা সাধারণ সম্পাদক হেম রঞ্জন চাকমা, কার্বারী রিম্রাচাই মারমা, মহিলা মেম্বার সুজাতা চাকমা প্রমুখ।  অপরদিকে পুজগাং বাজার হতে মিছিল সহকারে এসে পুজগাঙ স্কুল মাঠ সমাবেশের মাধ্যমে শেষ করা হয়। চেংগী ইউপি চেয়াররম্যান কালাচাঁদ চাকমার সভাপতিত্বে ও ইউপি সদস্য তন্তুু চাকমা সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট মুরুব্বী নগেন্দ্র চাকমা ও চেঙ্গী ইউপি সদস্য সুশীলা চাকমা প্রমুখ। সমাবেশে বক্তারা বলেন, আমরা শান্তি চাই, সংঘাত চাই না। আমরা অধিকার নিয়ে বাঁচতে চাই। যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘাত জিইয়ে রেখে কায়েমী স্বার্থ হাসিল করতে চায় আমরা তাদের নিন্দা জানাই।
দীঘিনালা : সকাল সাড়ে ১০টায় উপজেলার পুকুরঘাট থেকে একটি মিছিল শুরু হয়ে উদালবাগান এলাকায় গিয়ে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সমাবেশে সাবেক উপজেলার চেয়ারম্যান ধর্মবীর চাকমার সভাপতিত্বে এবং দীঘিনালা ডিগ্রী কলেজের বিএস এস ১বর্ষ ছাত্র মিঠুন চাকমার সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন বাবুছড়া ইউপি’র ৬নং ওয়ার্ডের সদস্য শান্তি প্রিয় চাকমা ও ঢাকা বাংলা কলেজের ছাত্র অর্ক চাকমা প্রমুখ। বক্তারা বলেন,পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি জনগণের অস্তিত্ব রক্ষা ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে ১৯৯৭ সালে ২রা ডিসেম্বর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও জেএসএস মধ্যকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু সরকার ২২ বছরেও এ চুক্তির পূর্ণবাস্তবায়ন না করে দমন-পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। বক্তারা বলেন চুক্তিতে অস্থায়ী সকল সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের কথা থাকলেও সরকার চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে নতুন করে সেনা ক্যাম্প সম্প্রসারণ ও র‌্যাব মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যার ফলে পাহাড়ের মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। বক্তারা পার্বত্য চুক্তি পুর্ণ বাস্তবায়ন, পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান। এছাড়া সমাবেশ থেকে বক্তারা সকল পক্ষকে দ্বন্দ্ব-সংঘাত পরিহার করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
রামগড় : রামগড়ে সকাল ৯টার সময় গুজাপাড়া স্কুল মাঠে এলাকাবাসী শান্তি, মানবাধিকার ও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সমাবেশ সফল করতে মরাকইল্যা, কালাপানি, হাতিকুম্ভ, গৈয়াপাড়া, রূপাইছড়ি, ছুদুরখীল,বদংপাড়া থেকে শত শত জনগণ স্বতঃস্ফুর্তভাবে মিছিল নিয়ে সমাবেশ স্থলে যেতে চাইলে তাদেরকে দুই বার ব্যারিকেড দিয়ে বাধাদানের চেষ্টা করা হয়। এতে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। তবে পরে ব্যারিকেড ভেঙে জনতা সমাবেশ স্থলে উপস্থিত হয়। সমাবেশে ২৩১ নং মৌজার হেডম্যান চাথোয়াই চৌধুরী সভাপতিত্বে ও শর্মিলা চাকমা’র সঞ্চলনায় বক্তব্য রাখেন, যৌগ্যছলা ইউপি’র ১,২,৩ নং ওয়ার্ড এর সদস্য ¤্রাসাইন্দা মারমা। অন্যদিকে রামগড় উপজেলার বাজার চৌধুরী পাড়া এলাকায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে আলুঅং মারমার (বুলু) সভাপতিত্বে ও সুমন মারমা’র সঞ্চলনায় বক্তব্য রাখেন ১নং রামগড় ইউপি সদস্য মংহ্লাগ্য মারমা, মন্টু পাড়ার কার্বারী দোঅং প্রু মারমা ও মেমং চৌধুরী প্রমুখ। বক্তারা বলেন, সরকার ২২ বছরেও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন না করে সামরিক শাসন জারি রেখে জনগণের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রেখেছে। চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তারা চুক্তি নিয়ে লকোচুরি খেলা বন্ধ করার আহ্বান জানান। বক্তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য জনগণের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ ও গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়া সহ চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি জানান।
লক্ষ্মীছড়ি: একই দাবিতে লক্ষ্মীছড়িতেও এলাকাবাসীর উদ্যোগে মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা পরিষদ হতে একটি মিছিল হাসপাতাল এলাকায় গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সমাবেশে লক্ষ্মীছড়ি সদর ইউপি চেয়ারম্যান প্রবীল চাকমা বক্তব্য রাখেন। এছাড়া দুল্যাতলী ইউপি চেয়যারম্যান ত্রিলন চাকমা ও বর্মাছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হরি মোহন চাকমাসহ এলাকার হেডম্যান-কার্বারীসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
ঘিলাছড়ি (নান্যাচর) : রাঙামাটির নান্যাচর উপজেলার ঘিলাছড়িতেও শান্তি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে উক্ত দাবিতে সমাবেশ করেছে এলাকাবাসী। প্রবীণ বিন্দু খীসার সঞ্চালনায় সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন পাইচি মং মারমা, নিহার চাকমা ও নারী সমাজের প্রতিনিধি সাবেত্রী চাকমা প্রমুখ। সমাবেশে ঘিলাছড়ি এলাকার বিভিন্ন স্তরের নারী-পুরুষ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, সরকার ২২ বছর ধরে চুক্তিকে ঝুলিয়ে রেখে পাহাড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে জুম্ম দিয়ে জুম্ম ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠেছে। তারা বলেন চুক্তির এই ২২ বছরে শান্তি প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা, পাহাড়িদের গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে ছাড়খার হয়েছে, শত শত নারী যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন।  বক্তারা পার্বত্য চুক্তির পুর্ণবাস্তবায়নের দাবি জানান।