চট্টগ্রাম সংবাদরাঙ্গুনিয়াশিরোনামস্লাইড নিউজ

বন বিভাগের যোগসাজশে কাপ্তাই রাইংখিয়ং খাল দিয়ে বেপরোয়া কাঠ পাচার

শান্তি রঞ্জন চাকমা: কাপ্তাই রাইংখিয়ং খাল দিয়ে অবৈধ কাঠ পাচারের মহোৎসব চলছে। কতিপয় চোরাই কাঠ ব্যবসায়ীদের সাথে কাপ্তাই রাইংখিয়ং বনশুল্ক ও পরীক্ষণ স্টেশনের যোগসাজশে বিনাবাধায় চলছে বাঁশ-কাঠ পাচার। এতে পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিন বনবিভাগের হাজার হাজার একর বনায়নকৃত বৃক্ষ শুণ্যে পরিণত হচ্ছে। চোরাইপথে মূল্যবান কাঠ পাচার হওয়ায় সরকার বছরে লক্ষ লক্ষ টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
স্থানীয় হেডম্যান-কার্বারীদের সূত্রে জানা যায়, মাঠ পর্যায়ে বন কর্মচারী-কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলা ও অবৈধ অর্থলিপ্সার কারণে প্রতিদিন বিভিন্নভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিন বনবিভাগের কাপ্তাই রেঞ্জ, কর্ণফুলী রেঞ্জ, আলী খিয়ং রেঞ্জ, ফারুয়া রেঞ্জ, ঝুমনিয়ন্ত্রণ বিভাগের কুতুবদিয়া রেঞ্জ, তিনকোনিয়া রেঞ্জ সহ সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে আহরিত কাঠ কাপ্তাই রাইংখিয়ং খালের নৌপথে হাজার হাজার ঘনফুট কাঠ পাচার হচ্ছে।

ফারুয়া গ্রামের মনি লাল তংচংগ্যা বলেন, এলাকার অধিকাংশ পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বনের ওপর নির্ভরশীল। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে তারা বিভিন্ন অজুহাতে সরকারী বনজ সম্পদ উজার করে। গত কয়েক মাস পূর্বেও হ্রদে পানি কমে যাওয়ায় কাপ্তাই-বিলাইছড়ি-ফারুয়া নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শুকনো মৌসুমে কাঠুরিয়ারা সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে হাজার হাজার ঘনফুট মূল্যবান কাঠ রাইংখিয়ং খালের হরিণছড়া, কুতুবদিয়া, বিলাইছড়ি, সাক্রাছড়ি, ধুপশীল, আলীখিয়ং, তক্তানালা, ওলুছড়ি, ফারুয়া, শুক্কুছড়ি ও কর্ণফুলী রেঞ্জের কর্ণফুলী নদীতে মজুদ গড়ে তোলে। চলতি বর্ষায় কাপ্তাই হ্রদের পানি বৃদ্ধি পেলে মজুদকৃত চোরাইকাঠের ডিপো থেকে ইঞ্চিন চালিত বোট যোগে কাপ্তাই, বরাদম, ভেদভেদি, রাঙ্গামাটি পাচার হচ্ছে।

বোট চালক মো. মফিজ বলেন, পাচার হওয়া কাঠগুলোর মধ্যে রয়েছে আকাশমণি, জারুল, জাম, সেগুন, চাপালিশ, গামারি, কড়ই ও গর্জনসহ নানা প্রজাতির গাছ। দিনে এসব গাছ কেটে রাতভর তা পাচার করা হয়। রাত যত গভীর হয় পাল্লা দিয়ে ততই বাড়তে থাকে কাঠ পাচারের মহোৎসব। রাইংখিয়ং খালে কাঠ পাচারের সময় বন বিভাগ, আঞ্চলিক অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রুপ ও ক্ষমতাসীনদের নামে লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। লট ক্রেতা এক ব্যবসায়ী বলেন, নিলামে বাগান ক্রয় করে সরকারি কোষাগারে টাকা জমা এবং নিয়ম মেনে কাঠ আহরনে বন চেক স্টেশন, বনবিট, রেঞ্জ কর্মকর্তাকে ঘুষ দিতে হচ্ছে।

ব্যক্তি মালিকানাধীন ফ্রি জোত পারমিটের আড়ালে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে হাজার হাজার ঘনফুট কাঠ পাচার হচ্ছে। ভুয়া ফ্রি জোত পারমিট, বিক্রেতার বাগানে গাছের গোড়া না থাকলেও বাহিরে থেকে গাছ এনে বৈধতা, বাগান কর্তনের পর জামাই কাঠ সংযোজনসহ নানাভাবে আর্থিক লেন-দেন কাজ করে যাচ্ছে বনবিভাগ কতিপয় কর্মকর্তা। বাগান বিক্রেতারা জানান, বিক্রিত গাছের বাগান বার বার ফ্রি জোত পারমিট করেও গাছের গোড়া শেষ হচ্ছে না। প্রতি গাছের আনুমানিক ঘনফুট মেজারমেন্ট করে অতিরিক্ত হিসাব নোট করা হয়। ফলে প্রকৃত বাগানের ঘনফুটের চেয়ে অতিরিক্ত ঘনফুট বৃদ্ধি হয়ে থাকে কয়েকগুন বেশী।

বন বিভাগ সূত্র জানায়, জুন, জুলাই ও আগস্ট তিন মাস বাঁশের বংশ বৃদ্ধির জন্য সকল প্রকার আহরন, বিপনন ও পরিবহনের উপর সরকারীভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। বন্ধ মৌসুমেও কাপ্তাই জেডিঘাট থেকে দাখিলার মাধ্যমে প্রায় ১লক্ষ ৮০ হাজার বাঁশ সড়ক পথে পরিবহন করা হয়েছে। প্রতি দাখিলায় ১০৫০টি মিতিঙ্গা বাঁশ পরিবহনের অনুমতি থাকলেও ১১০০-১৪০০ বাঁশ ট্রাকে পরিবহন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কাপ্তাই রাইংখিয়ং বনশুল্ক ও পরীক্ষণ স্টেশনের বন প্রহরী মো. সুলতান আহম্মদ বলেন, বিশেষ দাখিলার মাধ্যমে বাঁশ পরিবহনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। রাইংখিয়ং খাল দিয়ে সম্প্রতি কাঠ পাচার বেড়ে গেছে। অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা কাঠ পাচারে করায় বন বিভাগের করার কিছুই নেই। বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীদের সাথে সম্বনয় করে চলতে হচ্ছে। কাপ্তাই রাইংখিয়ং বনশুল্ক ও পরীক্ষণ স্টেশন থেকে ‘বনফুল রেস্ট হাউস’ এর খরচের টাকা যোগান দিতে বন বিভাগ আমরা (বনবিভাগ) হিমশিম খাচ্ছি। প্রতিমাসে লক্ষ টাকার উপরে খরচ হচ্ছে।