খাগড়াছড়িখাগড়াছড়ি সংবাদপাহাড়ের সংবাদশিরোনামস্লাইড নিউজ

ভাষা সৈনিক ধনঞ্জয়’র প্রতি খাগড়াছড়িতে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন

খাগড়াছড়ি প্রুতিনিধি: খাগড়াছড়িতে ককবরক দিবস উদযাপন কমিটি ২০২১ এর আয়োজনে ‘বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ (বিটিকেএস); ত্রিপুরা স্টুডেন্টস্ ফোরাম-বাংলাদেশ (টিএসএফ), য়ামুক (একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন) ও ককবরক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (কেআরআই) এর সম্মিলিত সহযোগিতায় পালিত হয়েছে ৪৩তম ককবরক দিবস উৎসব। দিবসটি উপলক্ষে ককবরক (ত্রিপুরা) ভাষার জন্য যিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন ভাষা সৈনিক শ্রী ধনঞ্জয় ত্রিপুরার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনসহ বিভিন্ন আয়োজন করা হয়।

মঙ্গলবার (১৯জানুয়ারী ২০২১) বিকালে খাগড়াছড়ি জেলা সদর খাগড়াপুর কমিউনিটি সেন্টার প্রাঙ্গনে নির্মিত শ্রী ধনঞ্জয় ত্রিপুরার অস্থায়ী প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পন করেন ‘বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ (বিটিকেএস); ত্রিপুরা স্টুডেন্টস্ ফোরাম-বাংলাদেশ (টিএসএফ), য়ামুক (একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন) ও ককবরক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (কেআরআই)সহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই। এসময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের সাধারণ সম্পাদক ও ককবরক উৎসব উদযাপন কমিটির আহবায়ক অনন্ত কুমার ত্রিপুরা, বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের সাহিত্য ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক ও ককবরক উৎসব উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক গঠিত ককবরক লেখক প্যানেলের সদস্য প্রার্থনা কুমার ত্রিপুরা, ত্রিপুরা স্টুডেন্টস্ ফোরাম, বাংলাদেশ (টিএসএফ) কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নক্ষত্র ত্রিপুরা, য়ামুকের সভাপতি প্রমোদক বিকাশ ত্রিপুরা ও সাধারণ সম্পাদক যুগান্তর ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এসময় ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের পর সকলে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

বিশিষ্টজন ত্রিপুরা লেখকের জানা যায়, ককবরক ভাষা (তিপ্রা কক বা ত্রিপুরি ভাষা নামেও পরিচিত) ভারতের ত্রিপুরা অঙ্গরাজ্য এবং বাংলাদেশে বসবাসরত ত্রিপুরা জাতির লোকদের মাতৃভাষা। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলার জন্য ঢাকার রাজপথে শহীদ হন রফিক, সালাম, জব্বর, বরকত, শফিউর। রক্তে ভেজা একটি ফুলের জন্ম অমর ২১শে ফেব্রুয়ারি। একুশ এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বর্তমান ৭০০ কোটি মানুষের বিশ্বে সাড়ে ছয় হাজার ভাষার গৌরবের দিন এটি। মাতৃভাষা বাংলার জন্য যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন ‘৫২তে, গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে আমরা তাঁদের স্মরণ করি অমর একুশে’তে। ১৯৭৫ সালে ৩রা মার্চ ত্রিপুরায় ককবরক ভাষার জন্য শহীদ হয়েছিলেন ধনঞ্জয় ত্রিপুরা। ভাষা শহীদ ধনঞ্জয় ত্রিপুরা, এক ভাষা সৈনিক ৷ মাতৃভাষার অধিকার অর্জনের লড়াইয়ে সামিল হয়েছিলেন ৷ একটি বুলেট কেড়ে নিয়েছিল তাঁর জীবন ৷ ত্রিপুরার সরকারি ভাষা বাংলা, তবে সেখানকার আদি ভাষা ‘ককবরক‘৷ এটি ‘ত্রিপুরি ভাষা’ নামেও পরিচিত ৷

এটি ত্রিপুরা ও সংলগ্ন বাংলাদেশে বসবাসরত ত্রিপুরি জাতির মাতৃভাষা । ১৯৭৯ সালের ১৯ জানুয়ারীতে ত্রিপুরা রাজ্যের একটি সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করায় প্রতিবছর এই দিনে ককবরক ভাষা দিবস পালিত হয়।

.ককবরক অর্থাৎ ‘কক’ মানে-ভাষা, আর ‘বরক’ অর্থাৎ ‘মানুষ’৷ সেই অর্থে ত্রিপুরি মানুষের ভাষা ব্রিটিশ আমলে ত্রিপুরা আরও অন্যান্য দেশীয় রাজ্যগুলির তকমা পেয়েছিল ৷ স্বাধীন ভারতের অসম (তৎকালীন আসাম) রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৪৯ সালে ৷ ১৯৭২ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হিসেবে স্বীকৃত লাভ করে ত্রিপুরা ৷ তারপরেই ঘটেছিল সেই ককবরক ভাষা আন্দোলন ৷

১৯৭৫ সাল দেশজুড়ে জরুরি অবস্থার অস্থির পরিস্থিতি তৈরির কিছু আগের কথা ৷ কেন্দ্রে কংগ্রেস সরকার ৷ ত্রিপুরার মাটিতে চলছিল ককবরক ভাষার স্বীকৃতিতে আন্দোলন ৷ রাজ্যের ক্ষমতায় কংগ্রেস, মুখ্যমন্ত্রী সুখময় সেনগুপ্ত আন্দোলনের গতি প্রকৃতি আঁচ করে জারি করা হয় ১৪৪ ধারা।

দক্ষিণ ত্রিপুরার জলাইবাড়িতে ককবরক ভাষার অধিকার চেয়ে শান্তিপূর্ণ মিছিল চলছিল ৷ আইন ভঙ্গকারীদের প্রথমে সতর্ক করে পুলিশ ৷ মেনে নেননি আন্দোলনকারীরা ৷ মিছিল এগিয়ে আরও আসতেই গুলি চালায় পুলিশ। পুলিশের গুলিতে সেই মিছিলে থাকা ধনঞ্জয় ত্রিপুরার মৃত্যু হয় ৷ পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে, লাঠি চার্জ করে মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ ৷ ভাষার দাবিতে ত্রিপুরার মাটিতে রক্তপাত হল ৷

.১৯৭৮ সালে ত্রিপুরাতে ক্ষমতায় আসে সিপিএম ৷ মুখ্যমন্ত্রী হন নৃপেণ চক্রবর্তী ৷ ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদে ছিলেন ৷ তাঁর আমলেই ১৯৭৯ সালে ককবরক ভাষাকে ত্রিপুরা রাজ্যের সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সেই থেকে রাজ্য সরকার ককবরক ভাষা শহীদ দিবস হিসবেই দিনটি ত্রিপুরাতে পালিত হচ্ছে। বর্তমানে এটিকে ভারতের একটি জাতীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে বসবাসরত ত্রিপুরা জাতির জনগোষ্ঠী এই দিনে ককবরক দিবস পালন শুরু করে।

উল্লেখ যে, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার আন্তরিকতা, বদান্যতা ও বিশেষ অবদান স্মরণীয়। ইতোমধ্যে ২০১৭সাল থেকে সরকারের উদ্যোগে ককবরকভাষী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের নিমিত্তে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে প্রাক-প্রাথমিক থেকে ৩য় শ্রেণী পর্যন্ত ককবরক পাঠ্যবই প্রণীত হয়েছে এবং পাঠদানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে ।