খাগড়াছড়িখাগড়াছড়ি সংবাদপাহাড়ের সংবাদমানিকছড়িশিরোনামস্লাইড নিউজ

মানিকছড়িতে নিয়ম ভঙ্গ করে অর্থের বিনিময়ে ২ শিক্ষককে এমপিওভুক্তি

দিদারুল আলম রাজু, খাগড়াছড়ি: বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন না অথচ পাঁচ বছর আগে নিয়োগ দেখিয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে দুই শিক্ষককে। আর এতে লেনদেন হয়েছে মোটা অংকের অর্থ। এমনটাই অভিযোগ উঠেছে খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি ও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে অভিযোগটির সত্যতাও মিলেছে। ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর মানিকছড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত এমপিওভুক্তির ঘোষণা আসে। এরপরই ওই বিদ্যালয়ে এমপিওভুক্ত করা হয় সহকারী শিক্ষক সজল দে (হিসাব বিজ্ঞান) ও সহকারী শিক্ষক লিটন দাশ (বিজ্ঞান বিভাগ) কে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সজল দে ইতোপূর্বে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার নুনছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের নিম্ন-মাধ্যমিক পর্যায়ে সনাতন ধর্ম বিষয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে এমপিওভুক্ত ছিলেন। আর বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসি) কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে পানছড়ি বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন লিটন দাশ।

নুনছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মংসাপ্রু মারমা জানান, ২০১৪ সালের ১৮ অক্টোবর যোগদান করে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা ৫ বছরেরও বেশী সময় আমাদের বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন সজল দে এবং প্রতি মাসে এই বিদ্যালয় থেকে সরকার প্রদত্ত ১৭হাজার ৩৭৬ টাকা উত্তোলনও করেছেন তিনি। তবে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত নুনছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকলেও এমপিওভুক্তির জন্য মানিকছড়ি বালিকা বিদ্যালয়ে সজল দে’র নিয়োগ দেখানো হয়েছে ২০১৫ সালের ২ এপ্রিল। অথচ স্থানীয় লোকজন এবং শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা জানালেন, কখনোই তিনি ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেননি বরং ২০১৪ সাল থেকে টানা ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত শিক্ষকতা করেছেন নুনছড়িতে।

এছাড়াও সজল দে’র বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ হলো তিনি মানিকছড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে এমপিওভুক্ত হবার পর পৃথক দুটি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে প্রতিমাসেই দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সরকার প্রদত্ত ভাতা উত্তোলন করতেন। মানিকছড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে উত্তোলন করতেন ১৩হাজার ৩১২ টাকা এবং নুনছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে উত্তোলন করতেন ১৭হাজার ৩৭৬ টাকা করে। একই সময়ে দুই প্রতিষ্ঠান থেকে ৬ মাসের সরকারি ভাতা উত্তোলন করেছেন বলে প্রতিবেদকের কাছে স্বীকারও করেছেন সজল দে। তবে মানিকছড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নিয়োগের ব্যাপারে কোন কথা বলতে রাজী হননি তিনি।

সজল দে বলেন, আমি কয়েক মাস দুই প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারি ভাতা উত্তোলন করেছিলাম। তবে বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় মানিকছড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিপ্লব বিজয় চক্রবর্তীর সহায়তায় ট্রেজারির মাধ্যমে বাড়তি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়ে দিয়েছি।

অপরদিকে পানছড়ি বাজার উচ্চ বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর যোগদান করে ২০২০ সালের ৩০ মে পর্যন্ত ওই বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন লিটন দাশ। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসি) কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হন তিনি। অথচ মানিকছড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এমপিওভুক্ত করতে লিটন দাশ’র নিয়োগ দেখানো হয়েছে ২০১৫ সালের এপ্রিলে। ২০১৫ সালে নিয়োগ দেখানো হলেও ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন না তিনি।

অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক লিটন দাশ বলেন, মানিকছড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি আগে নি¤œ-মাধ্যমিক পর্যন্ত এমপিওভুক্ত ছিলো। আমি পানছড়ি বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে মানিকছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়টি মাধ্যমিক পর্যায়ে এমপিওভুক্ত হয়। বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হবার পর প্রধান শিক্ষক বিপ্লব বিজয় চক্রবর্তী আমাকে ওই বিদ্যালয়ে যোগদান করার পরামর্শ দেন। উনার সহায়তায় আমি মানিকছড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করি এবং পরবর্তীতে এমপিওভুক্ত হই।

মানিকছড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিপ্লব বিজয় চক্রবর্তী বলেন, ‘বিদ্যালয়ে দীর্ঘ বছর ধরে অনুপস্থিত থাকার পরও ওই দুই শিক্ষককে এমপিওভুক্তির জন্য সহযোগিতা করাটা আমার ভুল হয়েছে। তবে আমি এর জন্য কোন আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করিনি। কেবলমাত্র মানবিক কারণেই আমি তাদের সহযোগিতা করেছিলাম।

মানিকছড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. শফিকুর রহমান ফারুক বলেন, নিয়োগপত্র পর্র্যালোচনা করে দেখা গেছে ২০১৫ সালের ৩১ মার্চ পরিচালনা কমিটির সভায় অভিযুক্ত এই দুই শিক্ষকের নিয়োগের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ওই সময়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য আব্দুল জব্বার। অভিযুক্তদের নিয়োগের ব্যাপারে তিনিই ভালো বলতে পারবেন।

মানিকছড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের বর্তমান সদস্য আব্দুল জব্বার বলেন, ‘সজল দে এবং লিটন দাশকে আমার দায়িত্বকালীন সময়ে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে মনে পড়ছেনা। আর আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও আমার জানা নেই। যদি এতে কোন অনিয়ম হয়ে থাকে তবে তার দায় প্রধান শিক্ষকের।

খাগড়াছড়ি জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা উত্তম খীসা বলেন, অভিযোগটি গুরুতর। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এমপিওভুক্তির জন্য শিক্ষকরা বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিকে ম্যানেজ করে এমনটা করে থাকে। নিয়োগে কোনপ্রকার অনিয়ম হয়ে থাকলে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি এর দায় কোনভাবেই এড়াতে পারেন না। অভিযোগগুলো গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হবে এবং এর সত্যতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

খাগড়াছড়ি জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. জসিম উদ্দিন মজুমদার বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে এক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করতেন অথচ এমপিওভুক্ত হলেন অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, এটি অনিয়মের মধ্যে পড়ে। এখানে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। তাছাড়া একইসাথে দুই প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারি ভাতা উত্তোলনও গুরুতর অপরাধ। বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. জসিম উদ্দিন মজুমদার ।