অন্য মিডিয়াপাহাড়ের সংবাদশিরোনামস্লাইড নিউজ

পার্বত্য চট্টগ্রামে একের পর এক হত্যাকাণ্ড: দায় চাপানো হচ্ছে বাঙালিদের উপর

 নেপথ্যে বাঙালি খেদাও এবং জুম্মুল্যান্ডের দাবি বাস্তবায়ন

আবুল খায়ের: পার্বত্য অঞ্চলে একের পর এক লাশ ফেলে অস্থির করার চেষ্টা করছে একটি গোষ্ঠী। এসব ঘটনার দায় চাপানো হচ্ছে বাঙালিদের উপর। তবে তদন্তে বের হয়ে এসেছে এসব ঘটনার সঙ্গে বাঙালিরা জড়িত নয়। এমন মিথ্যাচার আর প্রপাগান্ডার নেপথ্যে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালি খেদাও আন্দোলন বেগবান করা। এছাড়া জুম্মুল্যান্ডের দাবি বাস্তবায়ন করা। তাদের লক্ষ্য সামপ্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করে উপজাতি-বাঙালি সমপ্রীতি ধ্বংস করা।
ওই স্বার্থান্বেষী মহলের নোংরা রাজনীতির কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সময়ে অস্থিতিশীল পরিবেশের সৃষ্টি হচ্ছে। বাঙালিদের উত্খাত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে তারা। এমনকি নিজেরাই কোন একটি অপরাধ সংঘটিত করে সেটাতে নানান রং চড়িয়ে বাঙালিদের সরাসরি দোষারোপ  করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাশাপাশি তারা ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশে-বিদেশে বিভিন্ন স্থানে মিছিল, মিটিং, সমাবেশ করে সবার নজর কাড়ার চেষ্টা করে আসছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযাগ মাধ্যমে বাঙালিদের উত্খাত করতে নানান মিথ্যাচার, গুজব ছড়াচ্ছে।  চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাঙ্গামাটি জেলা সদরে আপন ভগ্নিপতির ভাড়া বাসায় বোন ও ভগ্নিপতির অনুপস্থিতিতে গলা কেটে হত্যা করা হয় খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ইতি চাকমাকে। কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল এ হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি  করে পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে এ হত্যাকাণ্ডের জন্য সরাসরি বাঙালিদের দায়ি করে নানা রং ছড়ানোর অপচেষ্টা চালায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও এ নিয়ে নানা অপপ্রচার চালানো হয়। পরে এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত তুষার চাকমাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আদালতে তুষার চাকমা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানান, প্রেমঘটিত কারণে ৫ জন চাকমা যুবক এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির পানছড়িতে খুন হন বালাতি ত্রিপুরা। এবারও আটঘাট বেঁধে মাঠে নামে বিভিন্ন সংগঠন। ঘটনার জন্য করিম, নুরু আর মানিক নামে তিন বাঙালিকে দোষারোপ করা হয়। পরে ঘটনার মাত্র ছয়দিনের মাথায় বালাতি ত্রিপুরার খুনের মূল নায়ক কার্বারী সাধন ত্রিপুরা  নামক এক উপজাতি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। সে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার স্বীকার করেছে।
২০১৬ সালের ২৯ মে ‘মা মোবাইল সেন্টার’ নামক এক বাঙালি ছেলের দোকানে কলেজে ভর্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করতে যায় আয়না চাকমা। বাঙালির দোকানে গিয়েছে শুধুমাত্র এ অপরাধে এই চাকমা কিশোরীকে সেখান থেকে ধরে এনে প্রকাশ্যে মারধর করে পাহাড়ের একটি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা। শুধু এখানেই শেষ নয়। পরে এ কিশোরীকে গহিন জঙ্গলে নিয়ে যৌন নির্যাতন করে তারা এবং এ বর্বর মুহূর্তের দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে। অনেক সময় এ ধরণের অপরাধে বাঙালিদের দায়ী করা হলেও আসল অপরাধী ধরা না পড়ায় ষড়যন্ত্রকারীরা তার দায়ভার বাঙালিদের উপর চাপিয়ে রেখেছে। আসল অপরাধীরা ধরা পড়লে বাঙালিরা এ অভিযোগ থেকে মুক্ত হতে পারতো।
২০১৪ সালের ১৩ আগস্ট রাঙ্গামাটির টেক্সটাইল শো রুমের বিক্রয়কর্মী বিশাখা চাকমা কর্মস্থল থেকে বাসায় যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন এবং ২০ আগস্ট রাংগামাটির কাপ্তাই হ্রদ থেকে তার বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পরপরই নড়েচড়ে বসে বিভিন্ন সংগঠন। বাঙালিদের দোষারোপ করে শুরু হয় সমাবেশ-মানববন্ধন। কিন্তু পরবর্তীতে পুলিশের তদন্তে দেখা যায়, বিশাখার স্বামী লক্ষীরাম চাকমার উপস্থিতিতে বখাটে সঞ্জয় চাকমা, তার সহযোগী তত্তারাম ও বিনোদ চাকমা মিলে বিশাখা চাকমাকে ধর্ষণ ও হত্যা করে। ওই সন্ত্রাসীরা শুধু বাঙালিদের দোষারোপ করেই ক্ষান্ত হয় না। সুযোগ পেলে তারা বাঙালিদের হত্যা করতেও কুণ্ঠিত হয় না। এমনি একটি ঘটনা ঘটে ২০১৪ সালের ৬ জুন বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে ব্রাক এনজিওর আনন্দ স্কুলের শিক্ষিকা উ প্রু মারমাকে ধর্ষণ করে হত্যার পর। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে স্থানীয় পাহাড়িরা বাঙালি কাঠুরিয়া মুসলিম উদ্দিনকে ধরে গণপিটুনি দিলে তার মৃত্যু হয়। পরে তদন্তে দেখা যায় এ ঘটনায় জড়িত উপজাতি রশদ তঞ্চঙ্গ্যার ছেলে বিজয় তঞ্চঙ্গ্যা।
২০১৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ির কমলছড়িতে সবিতা চাকমার লাশ তার নিজ বাড়ির পাশের ক্ষেতে পাওয়া যায়। তার মৃত্যুর পর বিভিন্ন পাহাড়ি সংগঠনগুলো সবিতা চাকমা বাঙালি ট্রাক ড্রাইভার ও হেলপার কর্তৃক গণধর্ষিতা হয়ে মারা গেছে বলে দাবি করে ব্যাপক প্রচারণা ও প্রতিবাদ মিছিল বিক্ষোভ সমাবেশ করে। পরবর্তীতে, সবিতা চাকমার লাশের ময়না তদন্ত ও সুরতহাল রিপোর্টে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। পাহাড়ি একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী এই ঘটনাকে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে যে ফায়দা লুটতে চেয়েছিল তা অনুমেয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সব বাঙালি এবং উপজাতি এদেশেরই গর্বিত নাগরিক। পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে তাদের সকলের অবদান অপরিসীম। তাই উপজাতি-বাঙালি ভেদাভেদ আর অতীতের হানাহানি ও বিবাদ ভুলে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অগ্রসর হতে হবে। তবেই পার্বত্য এলাকায় শান্তির পরিবেশ আরও সুসংহত হবে এবং সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় সার্বিক উন্নয়ন সাধিত হবে। অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য অঞ্চলে মুষ্টিমেয় কিছু সন্ত্রাসী কর্তৃক সৃষ্ট সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড উত্পাটন করে সবাই মিলে শান্তি ও সমপ্রীতির সঙ্গে বসবাস করতে পারলেই উন্নয়ন এবং উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিত হবে। একই কথা বলেছেন বাঙালি ও পাহাড়ি অধিকাংশ বাসিন্দা। তারা পার্বত্য অঞ্চলে তিনটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে নির্মুলের দাবি জানান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, পার্বত্য অঞ্চলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাঙালি-পাহাড়িদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দিনরাত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে অপরাধীদের সহজে সনাক্ত করা যাচ্ছে। সূত্র: দৈনকি ইত্তেফাক, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং ।