জাতীয় সংবাদঢাকাপ্রবন্ধ ও কবিতাবিশেষ প্রতিবেদনশিরোনামস্লাইড নিউজ

অনেকের মাঝে একজন . . . ইউএনও রোকন উদ-দৌলা

Ra2wn 4d॥ আসমা আক্তার ॥

লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার মানুষের মাঝে নানা অবদানের কারণে এখনো ইউএনও ফজল আবু মুনসুর, ফেরদৌস মোল্লা, আব্দুল আজিজ, সুনীল চন্দ্র পাল এর নাম আলোচিত হয়। অল্প সময়ের জন্য যারা ছিলেন তাদের মধ্যে ইউএনও মো: আনোয়ার উল্লাহ, মো: সলিম উল্লাহ ও মো: মিজানুর রহমানের অবদানের কথাও লোকমুখে শোনা যায়। তবে সবাইকে ছাড়িয়ে মানুষের হৃদয়ে আজীবন স্থান করে নিয়েছেন তিনি আর কেউ নন বাংলাদেশের খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের নায়ক, ভেজাল বিরোধী অভিযানে নেতৃত্বদানকারি আলোচিত অন্যতম ব্যক্তিত্ব তৎকালীন লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার বর্তমান রাজউক’র নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেড মোঃ রোকন উদ-দৌলা। তিনি ২০০২ সালের ৩০ জানুয়ারী খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলায় ১৮তম উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৫ সালের ৩ মার্চ এই কর্মকর্তা বদলী হন। তাঁর ৩ বছরের কর্মপরিকল্পনার সময়কালে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে কলেজ প্রতিষ্ঠা করা, নারি উন্নয়নে লক্ষ্মীছড়ি নারি কল্যাণ সমিতি গঠনসহ মানুষের কল্যাণ ও এলাকার সার্বিক উন্নয়নে কর্মদক্ষতা দিয়ে যে অবদান রেখেছেন লক্ষ্মীছড়িবাসীর কাছে স্মরনীয় হয়ে থাকবে। আইনী নিয়ম নীতির গন্ডির ভিতরে থেকেও একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও নিরপেক্ষতা, সততা ও নিষ্ঠার সাথে এলাকার উন্নয়নে জনসাধারণের কাছে গিয়ে যে ভাবে মিলেমিশে কাজ করেছেন এই পাহাড়ে তা হয়ত অনেকের ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও কঠিন হবে বলে মনে করি। লক্ষ্মীছড়ি সদর এলাকা ব্যতিত ২২০বর্গ কি: মি: বিশাল অংশই দুর্গম অনুন্নত পায়ে হাঁটা ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। বর্মাছড়ির সেই সব এলাকা যেমন পেক্কুয়া পাড়া, শুকনাছড়ি, বর্মাছড়ি, খিরাম, মরনছড়ি, ডাইনে বানরকাটাসহ বিভিন্ন পাড়া মৌজায় ছুটে গিয়েছেন এই রোকন উদ-দৌলা।

৮ মার্চ ২০০২ সাল আর্নন্তাতিক নারি দিবসে রোকন উদ-দৌলা নারীদের বিশাল সমাবেশে লক্ষ্মীছড়ি নারি কল্যান সমিতি গঠন করার ঘোষনা দেন। ২০০২ সালের ১০মার্চ লক্ষ্মীছড়ি কলেজ প্রতিষ্ঠা করার ঘোষণা দেন। উপজেলার প্রায় সকল হেডম্যান-কার্বারী জনপ্রতিনিধি, সরকারী কর্মকর্তা, ঠিকাদার, গন্যমান্য ব্যক্তিদের উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপস্থিত ছিলেন। সুদুর প্রসারী চিন্তা চেতনা নিয়ে দারিদ্রতা দুরীকরনে লক্ষ্মীছড়ি নারী কল্যাণ সমিতি ও শিা-দীায় অনগ্রসর এ উপজেলাবাসীকে এগিয়ে নিতে কলেজ প্রতিষ্ঠার ঘোষনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় রোকন উদ-দৌলার সরকারী কর্মকান্ডের নতুন মাত্রা। তার মহৎ উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন সকলেই। লক্ষ্মীছড়ি হতে সুদুর বর্মাছড়ি আবার কখনো লক্ষ্মীছড়ি হতে শুকনাছড়ি কালো পাহাড়ের পাদদেশে পরির্দশনে গিয়েছেন তিনি। ১৫/১৬ কোথাও কোথাও ১৮ কিঃ মিঃ পায়ে হেঁটেই যেতে হয়েছে। তাঁর সফর সঙ্গি হয়েছেন, উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান কার্বারী ও সাংবাদিক।

তৎকালীন মাননীয় সংসদ সদস্য পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান ওয়াদুদ ভূইয়া, জেলা প্রশাসক হুমায়ূন কবির খান, জোন কমান্ডার লে: কর্ণেল মো: মাসুদ হোসাইন চৌধুরী ও জনপ্রতনিধিদের সহায়তায় এলাকার শত শত পাহাড়ি-বাঙ্গালি পরিবারের মাঝে ঢেউটিন বিতরণ, গাভি ও ছাগল বিতরণ, বনায়ন করা, নগদ অর্থ সহায়তা, ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান উল্লেখযোগ্য। লক্ষ্মীছড়ির উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানে চট্টগ্রামের হাক্কানী গ্রুপ ও তাঁর স্ত্রী মিসেজ ফারহানা ফেরদৌস’র স্বক্রীয় অংশ গ্রহণ ও আর্থিক অনুদান দিয়ে অবদান রাখেন। তখনকার সময় স্থানীয় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় রোকন উদ-দৌলার প্রশাসনিক কর্মকান্ডের খবর দৈনিক অরণ্যবার্তা, দৈনিক পূর্বকোণসহ বিভিন্ন পত্রিকায় বেশ ফলাও করে ছাপা হয়। রোকন উদ-দৌলা শুধু লক্ষ্মীছড়ি’ই নয়, পূর্বের কর্মস্থল গুলোতেও একইভাবে কর্মদক্ষতা দেখিয়েছেন। ঢাকায় বদলী হয়ে যাওয়ার পর দৈনিক ইত্তেফাকে’র সিনিয়র রিপোর্টার আবুল খায়ের এর ধারবাহিক প্রতিবেদন ‘আমরা কী খাচ্ছি’ শিরোনামে প্রকাশিত খবর দৃষ্টিকাড়ে এই ম্যাজিষ্ট্রেড রোকন উদ-দৌলার। শুরু করেন ‘ভেজাল বিরোধী অভিযান’। মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যে ভেজাল ও ফলমূলে ফরমালিনমুক্ত করতে শুরু করেন এই অভিযান। সারা বাংলায় হোটেল রেস্তরায়সহ সকল স্তরে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে মানুষের খাবারে। এছাড়াও ১৯৯১ থেকে ২০০০ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত যশোরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার, জেলা ত্রাণ ও পূর্নবাসন কর্মকর্তা, সহকারি পরিচালক, ঝিকরগাছা নির্বাচন অফিসার, যশোর সদরের সহকারি কমিশনার (ভূমি), শার্শা ও কেশবপুর উপজেলার আমলী ম্যাজিষ্ট্রেড সহ বিভিন্ন সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি চোরাচালান বিরোধী অভিযান, মেঘনা নদীতে ঝাঁটকা নিধন ও কারেন্ট জাল আটক সহ চাঁদপুরে জাটকা নিধনে ব্যবহৃত হাজার হাজার কারেন্ট জাল আটক করে পুড়িয়ে ফেলেন। তার এই জাতীয় স্বার্থে মহৎ উদ্যোগ সর্ব মহলে প্রশংসিত হয়।

সরকারের নানা জনমূখী ও উন্নয়নমূল কর্মকান্ড বাস্তবায়নে অবদান রাখা এই রোকন উদ-দৌলার জন্ম স্থান রাজধানী ঢাকায়। গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায়। আমবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিা গ্রহণ করে মিরসরাই উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার পর ঢাকা কাফরুল উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণী ও মুসলিম মর্ডান একাডেমীতে দশম শ্রেণীতে কিছু দিন লেখা পড়া করেন। এর পর মিরপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় হতে ১৯৭৯ সালে এস.এস.সি পাশ করেন। ১৯৮১ সালে ঢাকা কলেজ হতে এইচ.এস.সি, ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় হতে ইতিহাস (অনার্স-১৯৮৪/পরীা-১৯৮৬), প্রথম শ্রেণী এবং এম.এ.ইতিহাস(১৯৮৫)(পরীা-১৯৮৬-৮৭ সাল) দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৯১ সনের ২৬ জানুয়ারী এম.ফিল গবেষণারত অবস্থায় নবম বি.সি.এস পরীা দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করেন রোকন উদ-দৌলা। মা’র নাম হোসনে আরা বেগম। পিতা মোঃ নুর সোবাহান (মরহুম)ছিলেন ঢাকা সেনানীবাসের উপ-সহকারী সামরিক ভূ-সম্পত্তি প্রশাসক। সূত্র: মাসিক পাহাড়ের আলো, ডিসেম্বর সংখ্যা ২০১৪, লক্ষ্মীছড়ি,খাগড়াছড়ি।

Comment here