Saturday , 26 May 2018
পাহাড়ে লাশের মিছিল, বিচারের আওতায় আসছে না খুনিরা!

পাহাড়ে লাশের মিছিল, বিচারের আওতায় আসছে না খুনিরা!

জীতেন বড়ুয়া, খাগড়াছড়ি: পাহাড়ে বাড়ছে লাশের মিছিল। পাহাড়ের চারটি আঞ্চলিক সংগঠনের আধিপত্য বিস্তার, অন্তঃকোন্দল, গহীন অরণ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে গুলিবিনিময়, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, চাঁদাবাজির ভাগ-বাটোয়ারায় অমিলসহ নানা ইস্যুতে প্রতিনিয়ত পাহাড়ে ঝরছে তাজা প্রাণ। সংগঠন চারটি হলো- জেএসএস, জেএসএস (এমএন লারমা গ্রুপ), প্রসীত বিকাশ চাকমার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ ও সদ্য ঘোষিত ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। শান্তিচুক্তির পর এ পর্যন্ত কতজন খুনের শিকার হয়েছেন তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া না গেলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গত দুই দশকে সদ্য ঘোষিত ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) সহ চার সংগঠনে প্রায় ৭৮০ জন প্রাণ হারিয়েছে। এর সঙ্গে গত ৪ জানুয়ারি যোগ হয়েছে ইউপিডিএফ’র সংগঠক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করা মেধাবী ছাত্রনেতা মিঠুন চাকমাকে গুলি করে হত্যা। তাকে বাসা থেকে অপহরণ করে খাগড়াছড়ি জেলা শহরের স্লুইচ গেইট এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয়। তবে এসব খুনের ঘটনার সঙ্ড়ে জড়িতরা বিচারের আওতায় না আসায় লাশের মিছিল প্রতিনিয়ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে  রোমহর্ষক খুন-খারাবি।

পুলিশ ও স্থানীয়  সূত্র জানায়, পার্বত্য এলাকায় একের পর এক ঘটনা ঘটলেও বেশিরভাগ ঘটনায় থানায় কেউ মামলা দায়ের করেন না। নিজের এবং পরিবার পরিজনের জীবননাশের ভয়ে অনেকেই মামলা দায়ের না করে ‘খুনের বদলে খুন’ নীতির গ্রহণ করেছে। আবার নীরবে স্বজন হারানোর কান্নায় দিনাতিপাত করার পথ বেছে নিচ্ছে সাধারণ পাহাড়ি-বাঙালিদের অনেকে। বিশেষ করে পাহাড়ি সংগঠনগুলোর সংঘর্ষে নিহতের শিকাররা কখনোই মামলা করার সাহসও পায় না।  এছাড়াও গহীন অরণ্যসহ শহরের আশেপাশে এসব ঘটনা ঘটায় স্থানীয় পুলিশও সারাক্ষণ অত্যাধুনিক অস্ত্রেসজ্জিত এসব অস্ত্রবাজ সন্ত্রাসীদের ভয়ে তটস্থ থাকে।

গত ৮ জানুয়ারি খাগড়াছড়ি জেলা শহরের স্বনির্ভরস্থ জেলা কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ইউপিডিএফ সংগঠক মাইকেল চাকমা অভিযোগ করেন, মিঠুন চাকমার স্ত্রীকে মুঠোফোনে মামলা না করার জন্য খুনিরা ভয় দেখিয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার ও সদর থানার ওসি কর্তৃক মিঠুন চাকমা হত্যাকাণ্ডে পরিবারের সদস্য ছাড়া আর কারো মামলা গ্রহণ না করার অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইউপিডিএফ মামলা করতে পারেননি। এছাড়া পুলিশ বাদি হয়ে করা মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি উল্লেখ করে খুনিদের আঁড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে মাইকেল চাকমা অভিযোগ করেন।

একটি সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সদর উপজেলায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে সুমায়ুন চাকমা নামে জনসংহতি সমিতির এক নেতা নিহতসহ ওই বছরে প্রথম পাঁচ মাসে জেএসএসএসের হামলায় ৩৩ নেতা, কর্মী ও সমর্থক খুন হয়েছে বলে দাবি করেছে ইউপিডিএফ। নিহতদের মধ্যে মহিলাও রয়েছেন। জুম্ম অধিকারের নামে এ চারটি সংগঠনের প্রতিনিয়ত নৃশংস ঘটনায় তিন পার্বত্য জেলায় সাধারণ পাহাড়ি-বাঙালিদের কাছে পার্বত্য এলাকা আতঙ্কের নামে পরিণত হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় দেশের প্রচলিত কোনো আইন চলে না। আর এ নিয়েই মূলত সংঘাত-সংঘর্ষ। ২০১২ সাল থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে খুন-অপহরণ-ধর্ষণ ও চাঁদাবাজি বাড়তে থাকে।

ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ওই বছরের ৩ ও ৪ জুলাই নাইক্ষ্যাংছড়ির দুর্গম এলাকায় দু’টি সংগঠনের মধ্যে ৮ ঘণ্টা সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে যাতে প্রাণ হারান চারজন। আহত হন অনেক কর্মী। পরের বছর ২৯ জুন রাতে প্রতিপক্ষের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে নিহত হন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) সংস্কার গ্রুপের পানছড়ি উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সুপন চাকমা ওরফে সাগর বাদশা।

পানছড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (সন্তু লারমা) খ্রিস্টীয় ধর্মযাজক অরুণ কান্তি চাকমাকে গুলি করে হত্যা করে। মানিকছড়ি-লক্ষীছড়ি সীমান্তে তিনট্যহরী ভোলাছলা পাড়ায় প্রতিক্ষের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) সন্তু লারমা গ্রুপের কর্মী ও সাবেক শান্তিবাহিনী সদস্য উমং মারমা।  পানছড়ি উপজেলার চেঙ্গী ইউনিয়নের দুর্গম পুজগাং এলাকায় ইউপিডিএফ সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের পানছড়ি থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক সমীরণ চাকমা ও জেএসএস এমএন লারমা গ্রুপের সদস্য জার্মান চাকমাকে ব্রাশফায়ারে হত্যা এবং অস্ত্রের মুখে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সদস্য শ্যামল চাকমাকে অপহরণ করে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা।

দীঘিনালা উপজেলার পূর্ণচন্দ্র কার্বারীপাড়ার তাজটিলা এলাকায় জেএসএস এমএন লারমা গ্রুপের সদস্য মিঠুন চাকমাকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে প্রতিপক্ষ গ্রুপ। লক্ষীছড়িতে নারায়ণ লারমা (৩০) নামে জেএসএস এমএন লারমা গ্রুপের কর্মী প্রতিপক্ষের ব্রাশফায়ারে নিহত হন। পানছড়িতে  ইউপিডিএফের দুই কর্মী নতুন কুমার চাকমা (৩৫) ও প্রতুলময় চাকমা (২৮) প্রতিপক্ষের ব্রাশফায়ারে নিহত হন।

এছাড়াও খুন হওয়া তালিকায় আছে সুবলং উকছড়ির সুমন চাকমা, রাঙামাটির স্টালিন চাকমা। কুতুকছড়ি ইউপিডিএফ অফিসে দায়িত্বরত অবস্থায় খুন করা হয়েছে পরাক্রম চাকমাকে। অন্যদের মধ্যে রয়েছেন- অভিলাষ চাকমা (দল ত্যাগ করার কারণে), অনীক চাকমা গোর্কি, দম্বা চাকমা, দিবাকর চাকমা, সংগ্রাম চাকমা, কিশোর মোহন চাকমা, দুর্জয় চাকমা, বরুনন চাকমা, জ্যোতিবিকাশ চাকমা, দেববিকাশ চাকমা, স্টেন চাকমা, জেনেল চাকমা, বীর চাকমা, তুহিন চাকমা, তনদ্রং চাকমা, রাহুল চাকমা প্রমুখ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, পাহাড়ে চাঁদাবাজির কারণে খুনের ঘটনা নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের ১৮ অক্টোবর খাগড়াছড়ির পানছড়িতে চাঁদাবাজি করতে আসা ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীদের নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করায় প্রফুল্ল ত্রিপুরার ছেলে নিরীহ কৃষক জীবন ত্রিপুরাকে (৩২) গুলি করে আহত করে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা। এ সময় জীবন ত্রিপুরা হাতে ও বুকে গুলিবিদ্ধ হন। জানা গেছে, পার্বত্য চুক্তির পরবর্তী বছরে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ছাত্রদের একটি অংশ জনসংহতি সমিতি ত্যাগ করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নামে একটি সংগঠন গঠন করে। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে সন্তু লারমার নেতৃত্ব থেকে পৃথক হয়ে জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) নামে আরও একটি রাজনৈতিক সংগঠন সৃষ্টি হয়।

সর্বশেষ গত বছরের ১৫ নভেম্বর খাগড়াপুর কমিউনিটি সেন্টারে  ইউপিডিএফ ভেঙে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে আরও একটি পাহাড়ি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। এর পরই গত ৫ ও ১৬ ডিসেম্বর নানিয়ারচর বেতছড়িতে সাবেক ইউপি সদস্য অনাদি রঞ্জন চাকমা ও বন্দুকভাঙায় ইউপিডিএফ সংগঠক অনিল বিকাশ চাকমা হতার শিকার হন।

 সূত্র: পরিবর্তন ডটকম।

Share This:

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes