Thursday , 16 August 2018
ফের অশান্ত পাহাড়: ১ মাসে ১৩ খুন, অপহরণ ৫

ফের অশান্ত পাহাড়: ১ মাসে ১৩ খুন, অপহরণ ৫

এম.সাইফুল ইসলাম: আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র কওে সবশেষ হত্যার শিকার হলেন, ইউপিডিএফ (গনতান্ত্রিক) গ্রুপের প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মা। নিহত হয়েছেন আরো ৫ সহকর্মী। নিহতের তালিকায় রয়েছেন একজন বাঙ্গালিও। খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার মো: সজিব মাইক্রোবাস নিয়ে ভাড়ায় যাচ্ছিলেন। নানিয়ার চর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাসহ ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে নিহত হলেন ৬জন।
সংঘাত আর কোন্দলে অশান্ত পাহাড়। নতুন করে দানা বেঁধেছে হিংসা। অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দল বিভক্তি, আধিপত্য বিস্তার ও মতের ভিন্নতার জেরে পাহাড়ের বিবাদমান দলগুলো জড়িয়ে পড়েছে সংঘাত-হানাহানিতে। খুন, অপহরণ, গোলাগুলির মত ঘটনায় শংকিত পাহাড়ের মানুষ।
মাঝখানে বেশ কয়েক বছর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধ থাকলেও এখন আবার ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) বিভক্ত হওয়ার পর থেকে দলগুলো সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। তবে একের পর এক ঘটনা ঘটে গেলেও দলগুলো দায় চাপানোর রাজনীতি নিয়েই ব্যস্ত। শুধু গত ১১ এপ্রিল থেকে ০৪ঠা মে পর্যন্ত ২৪ দিনে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ির সীমান্তঘেঁষা নানিয়ারচর ও মারিশ্যাতে খুন হয়েছেন অন্তত ১৩ জন। এর মধ্য রয়েছেন একজন প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিও। তবে একটি সূত্র বলছে, খুনের সংখ্যা আরো বেশি। ৫ টি অপহরণের ঘটনাও ঘটেছে। বিবাদমান গ্রুপগুলোর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটছে প্রতিদিন।
সর্বশেষ গত ৪ মে খাগড়াছড়ি থকে রাঙগামাটি যাওয়ার পথে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে নিহত হয়েছেন ইউপিডিএফ (গনতান্ত্রিক) গ্রুপের প্রধান তপন জ্যাতি চাকমা ওরফে বর্মাসহ ৫ জন, এর মধ্য খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার মাইক্রোবাস চালক সজিব ও রয়েছেন। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরো ৮ জন। জানা গেছে এর একদিন আগে ইউপিডিএফ এর হাতে নিহত রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেএসএস (সংস্কার) গ্রুপের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি শক্তিমান চাকমা। তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে একটি মাইক্রোবাস যোগে নানিয়ারচর যাচ্ছিলেন দলটির নেতা, কর্মী ও সমর্থকরা। পথিমধ্য খাগড়াছড়ির নানিয়ারচর বেতছড়ি এলাকায়  তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমন করে বসে সন্ত্রাসীরা।
এদিকে এর একদিন আগে গত ৩ মে রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেএসএস (সংস্কার) গ্রুপের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি শক্তিমান চাকমাকে গুলি করে হত্যা করে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা, এ সময় আরো ১ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র মতে, শক্তিমান চাকমা নানিয়ারচর বাজার থেকে মোটরসাইকেল যোগে উপজেলা পরিষদ চত্বরে পৌঁছালে সেখানে আগে থেকে ওৎ পেতে থাকা ৩ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী তার ওপর এলোপাতাড়িগুলি করতে থাকে। তাৎক্ষনিক ঘটনাস্থলেই নিহত হন শক্তিমান চাকমা ।
গত ২২ এপ্রিল পানছড়ির মরাটিলা এলাকায় ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের গুইমারা ও মাটিরাঙ্গা ইউনিট প্রধান সুনীল বিকাশ চাকমা (৪০) প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন। এই ঘটনায় একজন আহত হয়। একই দিন বিকালে খাগড়াছড়ির জেলা সদরের কমলছড়ি এলাকা থেকে পিতাপুত্রসহ ৩ জনকে অপহরণের অভিযোগ করেছে ইউপিডিএফ।
এর আগে গত ১৮ এপ্রিল নিখোঁজ হওয়ার ৪ দিনের মাথায় মাটিরাঙ্গার ভাঙ্গামুড়া এলাকা থেকে নতুন কুমার ত্রিপুরা (৩২) নামে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ১৬ এপ্রিল জেলা শহরের পেরাছড়ায় সূর্য বিকাশ চাকমা (৪৫) নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৫ এপ্রিল দীঘিনালা মারিশ্যা সড়কে তপন চাকমা (৪০) ও বিজয় চাকমা(৩২) নামে দুজনকে হত্যার হত্যার কথা শোনা যায়। এছাড়া রাঙ্গামাটির নানিয়ারচরে ১১ ও ১২ এপ্রিল জনি তঞ্চঙ্গা(৩২) এবং সাধারণ চাকমা(৪০) খুন হন। গুলি ও ছুরিকাঘাতে আহতের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।
এছাড়া গত ১৫ এপ্রিল বাড়ি ফেরার পথে দীঘিনালা বাস স্টেশন থেকে নিখোঁজ হন কলেজ ছাত্র জেরান চাকমা (২১)। ১৬ এপ্রিল মহালছড়ির মাইছড়ি এলাকায় কাঠ কিনতে যাওয়ার পর থেকে নিখোঁজ তিন জন। তারা হলেন কাঠ ব্যবসায়ী মোঃ সালাউদ্দিন(২৮), একই এলাকার মহরম আলী (২৭) ও ট্রাকচালক বাহার মিয়া। এই ঘটনা উত্তাপ ছড়াচ্ছে পাহাড়ে। ইতিমধ্যে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও হরতালের মত কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
আঞ্চলিক দলগুলোর বিরোধের জেরে খাগড়াছড়িতে প্রায় দেড়শ পরিবার নিজ বসতবাডি ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়েছে। এর মধ্যে খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ির বর্মাছড়ি, বাইন্যাছোলা, দুল্যাতলী, গুইমারা, রাঙ্গামাটির নানিয়ারচরের উদ্বাস্তু ৪৪ টি পরিবার বর্তমানে মহালছড়ির সিঙ্গিনালা কুলারামপাড়া হাই স্কুলসহ আশপাশের এলাকায় অন্যের বাসাবাড়িতে বসবাস করছে।
গত ২০ এপ্রিল প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের ত্রাণ সহায়তা দেয়া হয়েছে। এছাড়া উদ্বাস্তু অন্য পরিবারগুলো বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করছে। শুধু তাই নয়, দীঘিনালা, পানছড়ি, রামগড়, মাটিরাঙ্গায় প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ-ভাংচুরের মতো ঘটনা ঘটেছে। তবে জানুয়ারি থেকে হিসেব করতে গেলে এই খুন, অপহরণের সংখ্যা আরো বেশি।
প্রসঙ্গত, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির শীর্ষ নেতা ও আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নেতৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে ২০১০ সালের প্রথম দিকে সংগঠনটি দ্বিধাবিভক্ত হয়। এমএন লারমাপন্থী বলে পরিচয় দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির আরেকটি অংশের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তখন ‘ইউপিডিএফ’ এর সাথে এমএন লারমাপন্থী জনসংহতি সমিতির সম্পর্ক ভালোই কাটছিল। দীর্ঘদিনের সখ্য উবে গিয়ে এই দুই সংগঠনের মধ্যে নতুন করে সংঘাত-সংঘর্ষ, অপহরণের মত ঘটনা ঘটছে।
অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর থেকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির সাথে ইউপিডিএফ এর মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত লেগে থাকলেও গেলো দু‘বছরের মধ্যে পার্বত্য চুক্তির পক্ষ-বিপক্ষের বিবদমান সংগঠন দুটির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হানাহানির ঘটনা ঘটেনি।
২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর খাগড়াছড়ি জেলা সদরের খাগড়াপুর কমিউনিটি সেন্টারে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্ব প্রত্যাখ্যান করে তপন জ্যাতিÍ চাকমাকে আহবায়ক ও জালেয়া চাকমা কে সদস্য সচিব করে ১১ সদস্যের নতুন দল ‘ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক’’র আত্মপ্রকাশ ঘটে। অন্যদিকে নতুন এই সংগঠনকে ‘নব্য মুখোশবাহিনী’ আখ্যায়িত করে প্রতিরোধের ঘোষণা দেয় প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ। এরপর থেকে শুরু হয় সংঘাত।
ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক) এর সদস্য সচিব জলেয়া চাকমা বলেন, প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের বুলি আওড়ালেও তারা এখন লক্ষ্যচ্যুত। তারা এখন ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির মত ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছে। তারা গণতান্ত্রিক পন্থার পরিবর্তে জোর জবর দস্তিতে দলীয় কার্যক্রম চালাতে চায়। তারা এখন সন্ত্রাসী সংগঠন।
প্রতিষ্ঠার সাড়ে ৫ মাসের মাথায় গণতান্ত্রিক প্রধান তপন জ্যাতি ওরফে বর্মা সংঘাতে নিহত হওয়ায় বর্তমানে সংগঠনটির নেতৃত্ব সংকটে পড়বে কি না তা নিয়েও নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা গ্রুপ)’র কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, ‘রক্তপাত করে অধিকার আদায় হবে না। অধিকার আদায় করতে হলে সম্মিলিত প্রচেষ্টা লাগবে। কিন্তু  ইউপিডিএফ (প্রসীত) এতে বিশ্বাসী না বলে পাহাড়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাচ্ছে। আমাদের বহু নেতাকর্মী তাদের হাতে মারা গেছে। অপহৃত হয়েছে। বাড়িছাড়া হয়েছে।
তবে প্রসীত খীসার ইউপিডিএফ এর মুখপাত্র নিরণ চাকমা বলেন, ‘নব্য মুখোশবাহিনী (ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক) ও জেএসএস সংস্কার টার্গেট কিলিংয়ে নেমেছে। তারা আমাদের নেতাকর্মীদের একের পর এক হত্যা, অপহরণ করে যাচ্ছে। তাঁরা যদি মনে করে খুন করে ইউপিডিএফ নেতাকর্মীদের দমানো যাবে তাহলে ভুল করবে।’ চলতি বছর ১০জন নেতাকর্মীকে হত্যা ও ১জনকে অপহরণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে গত সোমবার (২৩ এপ্রিল) খাগড়াছড়ি টাউন হলে আয়োজিত এক সভায় শরণার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, ‘পাহাড়ের মানুষ এখন ভালো নেই। একের পর সংঘাতের কারণে মানুষ আতঙ্কিত।’ তিনি সবাইকে সজাগ থাকার এবং সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এমএম সালাউদ্দিন জানিয়েছেন, ‘এসব ঘটনা ঘটার পরও পরিবারগুলো থেকে তেমন কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয় না। তবে কোনো অবস্থাতেই সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না। আমরা সতর্ক রয়েছি। প্রয়োজন অভিযানও চালানো হচ্ছে।’
স্থানীয়দের দাবি পার্বত্য সন্ত্রাস দমনে সরকার আন্তরিকতা এখন বেশি প্রয়োজন। আজ পাহাড়ের পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের নতুন করে ভেবে দেখা দরকার। সমতলে সন্ত্রাস দমনে সরকারের  প্রসংশনীয় ভূমিকা রয়েছে। তাহলে কেন? পাহাড়ে অনবরত একের পর এক খুন হবে এমন প্রাশ্ন এখন সাধারণ মানুষের। সন্ত্রাস নির্মূল এবং অস্ত্র উদ্ধার করা জরুরূ হয়ে পড়েছে।
সধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সংঘাত বন্ধ করে পাহাড়ে শান্তি ধরে রাখতে সবাই একসাথে কাজ করবে, নচেৎ পাহাড়ের পরিস্থিতি আরো ভয়াভহরুপ নিবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করে।

Share This:

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes