চট্টগ্রাম সংবাদফটিকছড়িশিরোনামস্লাইড নিউজ

সবুজ মাল্টার বিপ্লবী ফরেষ্টার ইউনুছ

এম এস আকাশ, ফটিকছড়ি: সবুজ ও মিষ্টি মাল্টা বিপ্লবী ফরেষ্টার ইউনুছ। সৃষ্টি করেছে কর্মসংস্থান ও তার দেখানো পথে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন কৃষি উদ্যোক্তার। আবহাওয়া ঠিক থাকলে এই বছর প্রায় ৩৫টন মাল্টা বিক্রি করবেন তিনি। আর আয় করবেন প্রায় ৪৫ লক্ষ টাকা। তার মাল্টা বাগানে দৈনিক ৮-১২ জন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। দৃষ্টি নন্দন মাল্টা বাগানটি চোখে পড়বে ফটিকছড়ি উপজেলার দাঁতমারা ইউনিয়নের রাবার বাগান এলাকায়। এই বাগানের মালিক ও উদ্যোক্তা নিচিন্তা গ্রামের বাসিন্দা ফরেষ্টার মোহাম্মদ ইউনুছ। ইতিমধ্যে ইউনুছ মাল্টা চাষের জন্য উপজেলা পর্যায়ে উদ্যোক্তা ও সফল চাষীর পুরষ্কার পেয়েছেন। জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ট পুরষ্কারের জন্য একাদিকবার মনোনীতও হয়েছেন।

এদিকে গত ২০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ডিডি (কো-অর্ডিনেশন) অঞ্জন কুমার বড়ুয়া, ডিডি (কোয়ারেন্টাইন) শৈবাল কান্তি নন্দী ও এডিডি (ক্রপ) মো: নাছির উদ্দীন মাল্টা বাগানটি পরিদর্শন করেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেন।

সরেজমিনে ইউনুছের মাল্টা বাগান পরিদর্শনে জানা যায়, বন বিভাগে চাকুরী করলেও ফলজ বৃক্ষের প্রতি অনেক আগ্রহ রয়েছে ইউনুছের। আর এ আগ্রহ থেকেই মনযোগ দেন মাল্টা চাষে। ২০১৩ সালে মনযোগ দেন মাল্টা চাষে। নিজের বাড়ীর পাশেই জমি বাছাই করেন তিনি। হেয়াকোঁ চট্টগ্রাম সড়কের পাশে তাঁর মাল্টা বাগানের তিন দিকেই রয়েছে ছড়া। সমতল ভূমি হলেও পানি জমে না থাকার কারণে মূলত জমিটি বাছাই করেন তিনি। এরপর হাটহাজারীর কৃষি গবেষনার কর্মকর্তা ড. আমিন সাহেব’র নিকট থেকে প্রাথমিক পরামর্শ নেন তিনি। একই বছরের জুন মাসে শুরু করেন চারা রোপন। এর আগে চারা রোপনের জন্য গর্ত করে সেখানে গোবর সহ নানা ধরনের কিটনাশক দেয়া হয়। ১০ দিন পর বাছাই করা চারা সেসব গর্তে রোপন করেন। প্রতিটি গর্তে ২০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম পটাস, ৪০০ গ্রাম টিএসপি, ২০০ গ্রাম চুন এবং ২০ থেকে ৩০ কেজি মাটি মিশ্রিত করা হয়। চারার গোড়ায় যাতে করে পানি জমে না থাকে সে জন্য এ জমিটি বাছাই করেছেন তিনি। এর পর শুরু হয় চারার পরিচর্যা। চাকুরীতে থাকলে ফোনে এ দুই কেয়ারটেকারকে প্রয়োজীয় পরামর্শ দেন।

কর্মচারীদের পাশাপাশি তার চার্টার একাউন্টিন পড়া ছেলে জাফরুল হাসান ইকবালও বাগানে সময় দেন। ইকবাল জানান, বর্তমানে তাঁদের বাগানে ৫একরের মাল্টা বাগান। কমলা গাছ রয়েছে শতাদিক। কলা বাগান, আঁখ, আম, বড়ই (কুল) সহ সহ বিভিন্ন ফলজ বৃক্ষের বাগান রয়েছে ৮ একর মতো। বাগানে রয়েছে গবাদি পশুর খামার, ছাগলের খামার, মুরগীর খামার। শখ করে তিতির পাখি, টার্কি মুরগী সহ রাজহাসও রাখা হয়েছে। গত কোরবানীর সময় দুই লক্ষ টাকার গরুও বিক্রি করা হয়েছে।

ফরেষ্টার ইউনুছ জানান, মাল্টা ফল ধরা পর্যন্ত প্রতিটি চারার পিছনে খরচ হয়েছে ৮শ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। প্রথম বছর হিসেবে প্রায় ৫ টন মাল্টা ফলন হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৫ মনের মত মাল্টা তিনি স্থানীয় গ্রামবাসির মাঝে বিতরণ করেছেন। এ বছর গত সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে মাল্টা বিক্রি শুরু হয়েছে। প্রতি কেজি ১৩০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। মাল্টার উৎপাদন দাড়াবে ৩০-৩৫ টন। আওহাওয়া ঠিক থাকলে এবং চলতি মুল্য পেলে আয় হবে প্রায় ৪৫ লক্ষ টাকা। তাতে আমার বিগত সময়ের মাল্টা বাগানের যাবতীয় আয় উঠে আসবে। এখানে দৈনিক মজুরী ভিত্তিক ৮-১২ জন শ্রমিক কাজ করে। তাদের মজুরি দিতে হয় প্রতি মাসে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। তিনি আরো বলেন, আমার মাল্টা বাগানের উৎপাদন দেখে এই অঞ্চলে প্রায় একশটি মাল্টা বাগান গড়ে উঠেছে। তাদের বেশির ভাগই আমার বাগানের কাটিং করা ছারা লাগিয়েছে। তাদের মধ্যে ৮-১০জনের বাগানে এই বছর ফলন পাবে। স্থানীয় ইউপি সদস্য সুব্রত জানান, ফরেষ্টার ইউনুছের অনুকরণে আমি ও আমার এলাকায় প্রায় ২০টি মাল্টা বাগান করেছি। তার বাগানের মাল্টা সবুজ ও সুস্বাধু। এখানে প্রতিদিন দুরদুরান্ত থেকে লোকজন মাল্টা ও ছারা সংগ্রহ করতে আসে।

ফটিকছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লিটন কুমার দেবনাথ বলেন, ফরেষ্টার ইউনুছ ফটিকছড়ি তথা চট্টগ্রামের গর্ব। তার মাল্টা বিপ্লবে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরী হচ্ছে প্রতিদিন। তাকে আমরা উপজেলা পর্যায়ে একাদিকবার পুরষ্কৃত করেছি। জাতীয় পর্যায়ে পুরষ্কারের জন্য কয়েকবার তার নাম পাঠিয়েছি। ক’দিন আগে কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তরের তিনজন বড় কর্মকর্তা তার মাল্টা বাগান পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন।