চট্টগ্রাম সংবাদজাতীয় সংসদ নির্বাচননির্বাচন বিবিধফটিকছড়িশিরোনামস্লাইড নিউজ

ফটিকছড়িতে দলীয় প্রার্থী চান আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীরা

ফটিকছড়ি প্রতিনিধি: আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-২ ফটিকছড়ি আসনে নৌকার মাঝি হিসেবে দলীয় প্রার্থী চাইছেন দেশের সর্ববৃহৎ এ উপজেলার আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা। তৃনমূল থেকে দলীয় সিনিয়র নেতা পর্যন্ত সকলের প্রত্যাশা একটাই এবারের নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে দলীয় ব্যক্তিকেই মনোনয়ন দেয়া হউক। সে ক্ষেত্রে প্রার্থী দলের যে কোন পর্যায়ের নেতা বা কর্মী হলেও আপত্তি নেই তৃনমূলের । এখন তারা দলের অস্থিত্ব রক্ষায় দলীয় প্রার্থী নির্বাচনের কঠোর নীতি গ্রহণ করেছেন বলে জানিয়েছেন দলের সংশ্লিষ্ট সূত্র গুলো। বর্তমান সরকারের গত দু দফায় ক্ষমতায় দল থেকে প্রার্থী নির্বাচন না হওয়ার কারণে দলের অবস্থা যে নাজুক পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে তার থেকে উত্তোরনের জন্য এবার দলীয় প্রার্থীর বিকল্প চাইছেনা নেতাকর্মীরা। এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে উপজেলা আওয়ামীলীগ তৃনমুলের মতামত নিয়ে দলের বর্ধিত সভা থেকে একটি রেজ্যুলেশন কপি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে প্রেরন করেছে। দলীয় প্রার্থী পেতে এবার অনেকটা কঠোর অবস্থানে রয়েছে উপজেলার তৃনমুল আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীরা।

উপজেলা আওয়ালীগের দলীয় সুত্রগুলো জানান, নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী জোটের এমপি হলেও দলগতভাবে আওয়ামীলীগের তেমন কোন লাভ হয়নি। উল্টো গত প্রায় ৫ বছরে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়েছে দলের নেতাকর্মীরা। দলের সাংগঠনিক অবকাঠামোও অনেকটা ভঙ্গুর পর্যায়ে চলে গেছে। জামায়াত বিএনপি অধ্যুষিত এ আসনে বিগত সময়ে আওয়ামী রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ৫২ জন নেতাকর্মী প্রাণ দিয়েছে। দু দফায় দল ক্ষমতায় থাকলেও বিচার হয়নি এসব নেতাকর্মী হত্যার। সবচেয়ে আলোচিত দলের প্রবীণ নেতা উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি জহুরুল হক হত্যা মামলাটিরও কোন কুল কিনারা হয়নি।

বিগত দুই জাতীয় নির্বাচনে জোটগত কারণে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হয়ে তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান আলহাজ¦ সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী সাংসদ নির্বাচিত হয়ে বিগত ৫ বছরে গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে তেমন একটা কাজ করতে পারেননি বলে দাবি আওয়ামী নেতাকর্মীদের। আওয়ামীলীগ সরকার সারাদেশের উন্নয়ন কাজ চালিয়ে গেলেও এ আসনে তার তেমন কোন ছোঁয়া লাগেনি। বরং সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন বরাদ্দ ভাগ বাটোয়ারার মাধ্যমে ব্যক্তি বিশেষের পকেট ভারি হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে নেতাকর্মীদের দিক থেকে। অভিযোগ রয়েছে উপজেলা আওয়ামীলীগের পদ বঞ্চিত নেতৃবৃন্দদের নিয়ে গত ৫ বছর ধরে সাংসদের কার্যক্রম চলে আসছে। এ অবস্থায় বিভক্ত হয়ে পড়া উপজেলা আওয়ামীলীগের একাংশের নেতৃবৃন্দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর ছায়াসঙ্গী হয়ে পড়ে।

এমপি’র ছায়াসঙ্গি হওয়ার কারণেই অনেকটা দলের সিনিয়র ৫ নেতাকে দলীয় কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হলে দলীয় বিভক্তি আরো প্রকটাকার ধারন করে। গত ৪ অক্টোবর সর্বশেষ এর বর্হিপ্রকাশ ঘটে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেনের ফটিকছড়ি সফরের সময়।  এদিকে আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেতা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এটিএম পেয়ারুল ইসলাম, উপজেলা সভাপতি মজিবুল হক চৌধুরী, সাধারন সম্পাদক নাজিম উদ্দিন মুহুরী, সাবেক এমপি রফিকুল আনোয়ারের কন্যা খাদিজাতুল আনোয়ার সনি, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো.শাহজাহান, সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দরা উপজেলা আওয়ামীলীগের সক্রিয় নেতৃবৃন্দদের নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করে চলেছেন। ফলে তৃণমূল পর্যায়ের নেতৃবৃন্দরা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে চট্টগ্রামের এ আসনের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে তাদের মধ্য থেকে যে কাউকে দেখতে চান। তৃণমূল নেতাদের দাবি অন্যান্য উপজেলার তুলনায় ফটিকছড়িতে কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি। জনপ্রিয় এসব ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী করার সময় এসেছে এবার। তবে এবারও যদি জোটগতভাবে আওয়ামীলীগ নির্বাচনে অংশ নেয় সেক্ষেত্রে শরীকদল হিসেবে বর্তমান সাংসদ তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর ভান্ডারী এ আসনের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হবেন বলে জানা গেছে। এ আশা নিয়ে বুক বেঁেধছেন উপজেলা তরিকত নেতৃবৃন্দ। তরিকত ফেডারেশনের উপজেলা সভাপতি মো.বেলাল উদ্দিন শাহ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন প্রয়াত সাবেক এমপি রফিকুল আনোয়ারের কন্যা খাদিজাতুল আনোয়ার সনি। কিন্তু জোঠগত কারণে তরিকত ফেডারেশনকে ছেড়ে দিলে আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মাহমুদ হাসানের সাথে প্রতিদন্ধিতা করে এমপি হন সৈয়দ নজিবুল বশর। তখন খাদিজাতুল আনোয়ার সনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। এরপর শুরু হয় ফটিকছড়ি আওয়ামীলীগের গৃহদাহ। এখানে আওয়ামীলীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে এলাকায় রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ড করে বেশ এগিয়ে আছেন ২০০৮ সালে দলীয় মনোয়ন প্রাপ্ত সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এটিএম পেয়ারুল ইসলাম, সাবেক সংসদ সদস্য রফিকুল আনোয়ারের ছোট ভাই চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামীলীগের শিল্প ও বানিজ্য বিষয়ক সম্পাদক আলহাজ্ব ফখরুল আনোয়ার, রফিকুল আনোয়ারের কন্যা ও ২০১৪ সালে দলীয় মনোয়ন প্রাপ্ত খাদিজাতুল আনোয়ার সনি,সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও আমেরিকা প্রবাসী মোহাম্মদ শাহাজাহান।

ফটিকছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, জোঠগত এমপির কারণে আমাদের দল ভেঙ্গে চৌচির হয়েছে। গুটি কয়েক নেতাকর্মী সুবিধা ভোগ করলেও বাকিদের সাথে হয়েছে বিমাতা সুলভ আচরণ। সরকারের এই আমলে ফটিকছড়িতে দৃশ্যমান কোন উন্নয়ন হয়নি। ফটিকছড়ি আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ্ব মুজিবুল হক চৌধুরী বলেন, বৃহত্তর এই উপজেলা থেকে আওয়ামীলীগের জোঠের এমপি (তরিকত চেয়ারম্যান) ব্যক্তিগত ভাবে লাভবান হয়েছেন। আওয়ামীলীগ এবং ফটিকছড়িবাসী লাভবান হয়নি। তাই আমরা একজন আওয়ামীলীগের দলীয় নেতা-কর্মীকে মনোয়ন দিতে দলীয় হাইকমান্ডের প্রতি দাবী জানাচ্ছি।

একই অভিমত ব্যক্ত করেন উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক নাজিম উদ্দিন মুহুরী । তিনি বলেন প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে দলের তৃনমুলের নেতাকর্মীদের দাবীর কথা লিখিতভাবে দলের হাইকমান্ডকে জানানো হয়েছে। দলের মনোনয়ন বোর্ড এ ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন। রফিকুল আনোয়ারের কন্যা খাদিজাতুল আনোয়ার সনি বলেন, একবার দলীয় সিদ্ধান্তে জোঠকে ছাড় দিয়েছি। এবার আর নয়। নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামীলীগের একজন নুন্যতম কর্মীকে মনোনয়ন দিলেও তার পক্ষেই কাজ করবো।
আওয়ামীলীগ নেতা ফখরুল আনোয়ার বলেন, আমার বড় ভাই প্রয়াত সংসদ সদস্য রফিকুল আনোয়ারের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে মনোনয়ন চাইব। জোটের কারণে গতবার মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছি। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো.শাহজাহান বলেন, ১৯৮৫ সালের পর থেকে ৯১ সাল পর্যন্ত প্রত্যেক দিন যে সংগঠনের জন্য ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছি সে সংগঠন এখন আর নেই। যারা কালোবাজারি,হুন্ডি ব্যবসা করে আবার কেউ ধর্মান্ধ রাজনীতি থেকে আওয়ামীলীগে এসে এমপি নির্বাচিত হয়ে দলের ভিতরে প্রবেশ করে আওয়ামীলীগের বুকে ছুরিকাঘাত করেছে। শাহজাহান বলেন, যারা এমপি হয়েছেন তারা নিজের আখের গুছিয়েছে। আওয়ামীলীগের রাজনীতি এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাদের কোন পরিকল্পনা ছিলনা। তিনি বলেন,যাদের কাছে নিজের অস্তিত্বের কোন দাম নেই তাদের কাছ থেকে ফটিকছড়িবাসি কোন প্রাপ্তি আশা করতে পারেনা।

সূত্র জানায়, ১৯৯৬ সালে এই আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন প্রয়াত সংসদ সদস্য রফিকুল আনোয়ার। তখন আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে এলাকায় বেশ উন্নয়নও হয়। ২০০১ সালে তিনি আবার নির্বাচিত হলেও ক্ষমতায় আসে বিএনপি’র জোঠ সরকার। তখন রাজনৈতিক গ্যাঁড়াকলে এলাকায় উন্নয়ন হয়নি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ প্রার্থী এটিএম পেয়ারুল ইসলাম বিএনপি প্রার্থী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (পরে যুদ্ধাপরাধের রায়ে ফাঁসি হয়) এর কাছে পরাজিত হন। ৭৭৩ বর্গ কিলোমিটারের ফেনী জেলার চাইতেও বড় এই উপজেলায় প্রায় ৭ লক্ষ মানুষের বসবাস। দুইটি থানা, দুইটি পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়ন নিয়ে বৃহত্তর এই উপজেলা। এখানে প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে, যে দল ক্ষমতায় যায়, তার উল্টো দলের প্রার্থী এখান থেকে জিতে। যার কারণে এলাকার মৌলিক উন্নয়ন হয়নি।

এ আসনে ১৯৭৩ সালে আওয়ামীলীগ প্রার্থী নরুল আলম চৌধুরী, ১৯৭৯ সালে বিএনপি প্রার্থী জামাল উদ্দীন আহমদ, ১৯৮৬ সালে আওয়ামীলীগ প্রার্থী নুরুল আলম চৌধুরী, ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির মাজহারুল হক শাহ্ চৌধুরী, ১৯৯১ সালে আওয়ামীলীগ প্রার্থী সৈয়দ নজিবুল বশর, ১৯৯৬ সালে (১৫ ফেব্রুয়ারী) বিএনপি প্রার্থী সৈয়দ নজিবুল বশর, ১৯৯৬ সালে (৬ জুন) আওয়ামীলীগ প্রার্থী রফিকুল আনোয়ার, ২০০১ সালে আওয়ামীলীগ প্রার্থী রফিকুল আনোয়ার, ২০০৮ সালে বিএনপি প্রার্থী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, ২০১৪সালে তরিকত ফেডারেশন প্রার্থী (মহাজোট) সৈয়দ নজিবুল বশর নির্বাচিত হয়েছেন।