চট্টগ্রাম সংবাদজাতীয় সংসদ নির্বাচননির্বাচন বিবিধফটিকছড়িশিরোনামস্লাইড নিউজ

চট্টগ্রাম-৭: হ্যাটট্রিকের চান্সে আওয়ামীলীগ, পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি

শান্তি রঞ্জন চাকমা, রাঙ্গুনিয়া: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া ও বোয়ালখালীর দুই ইউনিয়ন) আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ভোটের প্রচারণায় কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড তুলে ধরে গ্রাম-গঞ্জের অলিগলি চষে বেড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। ১০ বছরে রাঙ্গুনিয়ায় আড়াই হাজার কোটি টাকা উন্নয়নের সুফল হিসেবে হ্যাটট্রিক করতে চায় আওয়ামীলীগ। আসনটি পুনরুদ্ধারে চুড়ান্ত লড়াই হিসেবে একাট্টা বিএনপি। জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে সকল জল্পনা-কল্পনা অবসান ঘটিয়ে চমক দেখাতে চায় হেফাজতে ইসলাম। জাতীয় পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।

উপজেলা আওয়ামীলীগ নেতা মো. এমরুল করিম রাশেদ বলেন, ড. হাছান মাহমুদ আওয়ামীলীগের একক প্রার্থী। আওয়ামীলীগ হাই কমান্ডের গ্রিণ সিগন্যাল পেয়ে ড. হাছান মাহমুদ (এমপি) রাঙ্গুনিয়ায় নির্বাচনী পথ সভা, মতবিনিময়, কর্মী সমাবেশ ও সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরে নৌকায় ভোট চাচ্ছেন। গত ১০ বছরে শেখ রাসেল এভিয়ারী এন্ড ইকো পার্ক, রাবার ড্যাম, রাস্তা, ব্রিজ, কালভার্ট, বিদ্যুতায়ন, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, ক্লিনিক, মসজিদ, মন্দির, প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্মাণ, নদীভাঙ্গনরোধ প্রকল্প, সংস্কার, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ, বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ও কৃষিখাত সহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা উন্নয়ন করেছেন। দেশ স্বাধীনের পর ব্যাপক উন্নয়নের কারনে রাঙ্গুনিয়ার চিত্র বদলে গেছে। এমন কোন এলাকা নেই উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি।

২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগের ড. হাছান মাহমুদ বিপুল ভোটে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। ড. হাছান মাহমুদ প্রথম মেয়াদে সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পরে বন ও পরিবেশমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী হিসেবে ড. হাছান মাহমুদ বিনা প্রতিদন্ধিতায় দ্বিতীয় মেয়াদে এমপি নির্বাচিত হন।

দুই মেয়াদে ড. হাছান মাহমুদ রাঙ্গুনিয়ায় প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার উন্নয়নকাজ সম্পন্ন করেছে বলে দাবী করছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি মনোনয়নপ্রত্যাশী। তাঁর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ থেকে আরো একাধিক নেতা মনোনয়ন চান। তাঁরা হলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবলীগের সহসভাপতি, রাঙ্গুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য ও বঙ্গবন্ধু স্মৃতি সংসদ উত্তর জেলার সভাপতি, মরহুম এম. সাদেক চৌধুরীর ছোট ভাই মো. ওসমান গণি চৌধুরী, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. ফয়সল ইকবাল চৌধুরী।

এ আসনে হেভিওয়েট প্রার্থী ড. হাছান মাহমুদ সহ অন্যান্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা লবিং তদবীরের পাশাপাশি কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, সামাজিক, মানবিক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে প্রাথমিক প্রচারণায় অব্যাহত রেখেছেন। অনেকে জনসংযোগের পাশাপাশি শোডাউন করছেন, পোস্টার ও ব্যানারের মাধ্যমে এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।

আওয়ামীলীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী মো. ওসমান গণি চৌধুরী বলেন, রাঙ্গুনিয়া আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম আমার পিতা হাজী ওবাইদুর রহমান। পরবর্তীতে সংগঠনের দু:সময়ে আমার বড় ভাই এম. সাদেক চৌধুরীর আওয়ামীলীগের হাল ধরেন এবং পর পর দু’বার আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে এ আসন থেকে নির্বাচন করেন। এ আসনে মরহুম এম. সাদেক চৌধুরীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইমেজ এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়ে আমাকে মনোনয়ন দিলে নির্বাচিত হতে পারব। আমার বড় ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল এমপি হয়ে রাঙ্গুনিয়াবাসীর ভাগ্যোন্নয়ন করবে। উনার স্বপ্ন রাঙ্গুনিয়াবাসী ও দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে বাস্তবায়ন করতে পারব। রাঙ্গুনিয়ার তৃণমুল নেতাকর্মীরা আওয়ামীলীগের ক্লিন ইমেজের নতুন নেতৃত্বকে চাচ্ছে। পরিচ্ছন্ন নেতাকে মনোনয়ন দিলে এ আসনটি আওয়ামী লীগের থাকবে। এ গুরুত্বপূর্ণ আসনটি ধরে রাখতে সকল প্রকার ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত আছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ ঐক্যবদ্ধ। সর্বোপরি উনার সিদ্ধান্ত যা থাকবে তার পক্ষে কাজ করবো। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হলেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, উপজেলা বিএনপির একাংশের সভাপতি অধ্যাপক কুতুব উদ্দিন বাহার, উপজেলা বিএনপির একাংশের আহবায়ক শওকত আলী নূর।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা সেচ্ছাসেবকদলের সহসভাপতি জসিম চৌধুরী বলেন, মরহুম সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এ আসন থেকে তিনবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং তাঁর ছেলে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে রাঙ্গুনিয়ার আপামর জনগন চাচ্ছে। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর শুন্যতায় রাঙ্গুনিয়ার জিয়া আদর্শের সকল মানুষ উজ্জীবিত হয়েছে। বিএনপি এখন সাংগঠনিক ভাবে অনেক বেশী শক্তিশালী। দলের সকল কর্মসূচী পালনে রাঙ্গুনিয়ার তৃণমুল বিএনপি ঐক্যবদ্ধ। বিএনপি যেহেতু বড় দল অনেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী হতে পারে। একক প্রার্থী ঘোষনার পর দলের নেতাকর্মীরা তার পক্ষে কাজ করবে। আসনটি পুনরুদ্ধার করতে বিএনপি একাট্টা।

উপজেলা ছাত্রদলের নেতা মোহাম্মদ মোজাফফ্র বলেন, কিøন ইমেজের কর্মীবান্ধব উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক কুতুব উদ্দিন বাহারকে মনোনয়ন দিলে হারানো আসন পুনরুদ্ধার করে দলকে উপহার দিতে পারবেন। ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে নির্বাচন পরিচালনা করেন এবং গত উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে প্রতিদন্ধিতা করেন কুতুব উদ্দিন বাহার। ২০০৮ সালে ১/১১ পর রাঙ্গুনিয়ায় বিএনপি পরিবারের উপর দূর্যোগের পাহাড় নেমে আসে শুরু হয় জেল, জুলুম, নির্বিচারে খুন, গুম সহ দলীয় নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলায় জর্জরিত করে এলাকা ছাড়া ও স্বাভাবিক জীবন যাপনে ব্যাঘাত হয়। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী গ্রেপ্তারের পর রাঙ্গুনিয়ায় নেতৃত্ব শুন্য হয়ে পড়লে কুতুব উদ্দিন বাহারের নেতৃত্বে দলীয় কর্মসূচী ও কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। ছুঁটে চলেন রাঙ্গুনিয়ার এপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। তৃণমুলকে সুসংগঠিত করে দলের সকল আন্দোলন সংগ্রাম সাহসিকতা ও সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। মামলায় জর্জরিত নেতাকর্মীদের সব রকমের আইনি সহায়তা ও নিজ অর্থে মামলা পরিচালনা করেন। ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন সবসময়। রাজনৈতিক কর্র্মকান্ড পরিচালনা করতে গিয়ে প্রায় ১৫টি রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়েছেন। সম্প্রতি একটি মামলায় কুতুব উদ্দিন বাহার জেলা হাজতে রয়েছেন।

উপজেলা বিএনপির একাংশের আহবায়ক শওকত আলী নূর বলেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী এখন এলাকার সাংগঠনিক বিষয়াদি তদারকি করছেন। তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে সালাহউদ্দিন কাদেরের পরিবারের কেউ নির্বাচন না করলে আমি অবশ্যই দলের মনোনয়ন চাইব। কারণ দলের দুঃসময়ে বিভিন্ন মামলা-হামলা মাথায় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। তার পরও দল থেকে যাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয় তাঁর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব।’একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তাঁরা হলেন জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মো. নুরুল আলম।

নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, ১৫ ইউনিয়ন, ১ পৌরসভা ও বোয়ালখালী উপজেলার শ্রীপুর-খরণদ্বীপ ইউনিয়ন নিয়ে (চট্টগ্রাম-৭) রাঙ্গুনিয়া আসনটি গঠিত। ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৬৯ হাজার ৮৭২ জন। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬২৬ জন এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ৩০ হাজার ২৪৬ জন।

উল্লেখ্য, বিগত দশটি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ৩ বার, ২ বার বিএনপি, ১ বার স্বতন্ত্র, ১ বার জাতীয় পার্টি ও মুসললিমলীগের প্রার্থী ১ বার জয়লাভ করে। ১৯৭৩ সালে আওয়ামীলীগের ক্যাপ্টেন আবুল কাশেম, ১৯৭৯ সালে মুসলিমলীগের প্রয়াত সালউদ্দিন কাদের চৌধুরী, ১৯৮৬ ও ৮৮ সালে জাতীয় পার্টির গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও নজরুল ইসলাম এমপি নির্বাচিত হন। এরপর ’৯১ সালে ৮ দলীয় জোট থেকে সিপিবি মনোনীত প্রার্থী মো. ইউসুফ নির্বাচিত হয়। ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনে সতন্ত্রপ্রার্থী বর্তমান এলডিপির যুগ্ম মহাসচিব মোঃ নুরুল আলম তালুকদার, ’৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ৩৯ হাজার ২৯৬ ভোট পেয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধি আওয়ামী লীগের এম. সাদেক চৌধুরী পেয়েছিলেন ৩৪ হাজার ৭৫৪ ভোট। ২০০১ এর নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ৬৫ হাজার ১১৬ ভোট পেয়ে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবারও তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধী ছিলেন আওয়ামী লীগের এম. সাদেক চৌধুরী। তিনি ভোট পেয়েছিলেন ৫৫ হাজার ২৬৭ ভোট। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগের ড. হাছান মাহমুদ ১ লাখ ১ হাজার ৩৪০ ভোট পেয়ে জয়ী হন। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পেয়েছিলেন ৭২ হাজার ৭৩ ভোট। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে বিনা প্রতিদন্ধিতায় ড. হাছান মাহমুদ দ্বিতীয় মেয়াদে এমপি নির্বাচিত হন।