খাগড়াছড়িখাগড়াছড়ি সংবাদগুইমারাজাতীয় সংবাদপাহাড়ের সংবাদবিশেষ প্রতিবেদনমহালছড়িরামগড়শিরোনামসম্পাদকীয়স্লাইড নিউজ

জীবন দিয়ে ৫০০ মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন কাদের

এ এইচ এম ফারুক : মহান মুক্তিযুদ্ধে খাগড়াছড়ি জেলায় একাধিক সম্মুখযুদ্ধ সংগঠিত হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষনার সাথে সাথেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় খাগড়াছড়ি তথা পার্বত্যাঞ্চলসহ চট্টগ্রামে। দীর্ঘ নয় মাস পাকবাহিনী ও তাদের মিত্র মিজু বাহিনীর (তৎকালীন সময়ে খাগড়াছড়িতে শক্তিশালী অবস্থানে থাকা স্থানীয় একটি উপজাতীয় বাহিনী) সাথে ত্রিমুখী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দফায় দফায় শত্রুমুক্ত হতে থাকে খাগড়াছড়ি। সর্বশেষ বিজয় দিবসের আগের দিন ১৫ ডিসেম্বর চুড়ান্ত বিজয় অর্জন করে খাগড়াছড়ির মুক্তিকামী বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

বিভিন্ন গ্রন্থ ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ অবলম্ভনে নিম্নে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো।

সম্মুখ যুদ্ধে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ৫০০ সহ মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচিয়ে দিলেন ক্যাপ্টেন কাদের :

ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের, বীর উত্তম। মুক্তিযুদ্ধে নিয়মিত সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রথম শহীদ হয়েছিলেন ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের। তিনি কর্মরত ছিলেন পাকিস্তানের (তখন পশ্চিম পাকিস্তান) হায়দরাবাদে, ফিল্ড রেজিমেন্টে।

খালাতো বোন জুঁইকে ভালোবাসতেন ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের। জুঁইও তাঁকে ভালোবাসতেন। তাঁরা বিয়ে করবেন। নানা জটিলতা বিশেষত, সেনা চাকরির কারণে আফতাবুল কাদের সময় ও সুযোগ করে উঠতে পারছিলেন না। অবশেষে তাঁর সেই সুযোগ হলো ১৯৭১ সালে। সে সময় ছুটি নিয়ে ঢাকায় আসেন। ২০ মার্চ চট্টগ্রামে রেজিস্ট্রি বিয়ে হয় তাঁদের। কয়েক দিন পর আনুষ্ঠানিক জীবন শুরু করবেন তাঁরা, এমন সময় দেশে নেমে এল চরম দুর্যোগ। ২৫ মার্চের কালরাত। সেদিন তিনি ঢাকাতেই ছিলেন। ফরিদাবাদে ছিল তাঁর মা-বাবার বাসা।

এমন সময় একদিকে নতুন বিবাহিত জীবনের হাতছানি, অন্যদিকে দেশমাতৃকা। দেশের সন্ধিক্ষণে আফতাবুল কাদের বেছে নিলেন দেশমাতৃকাকেই। ২৮ মার্চ ফরিদাবাদের বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। সেখানে অবরুদ্ধ থাকার সময় স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান এর চট্টগ্রাম বেতারের ঘোষণা তিনি শুনেছিলেন। বাসা থেকে বেরিয়ে তিনি যান চট্টগ্রামে।

রামগড়ে তাঁর দেখা হয় তৎকানলিন মেজর ও মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমানের (বীর উত্তম) সঙ্গে। তিনি তাঁকে মহালছড়ি এলাকায় অবস্থানরত প্রতিরোধযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিতে বলেন। এরপর তিনি সেখানে যান। যোগদান করেন ৮ম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়ার এক নম্বর সেক্টরে। ২৮ মার্চ যুদ্ধে অংশ নিতে চট্টগ্রামের পথ বেয়ে ফেনীর শুভপুর হয়ে ২ এপ্রিল রাতে কাদের পদার্পন করেন সীমান্ত শহর রামগড়ে। শুরু হয় তাঁর কর্মব্যস্ততা।

রামগড় কে শত্রুমুক্ত রাখার লক্ষে তিনি ইপিআর হাবিলদার কাশেম এর প্লাটুনসহ ৫ এপ্রিল সফল অপারেশন চালিয়ে ধুমঘাট রেলওয়ের ব্রিজ উড়িয়ে দেন। প্রায় ৫০০ সংগ্রামী তরুণ এসে জড়ো হয় রামগড় সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই অস্ত্র ট্রেনিং নেওয়া। এতদিন বেঙ্গল রেজিঃ আর ইপিআর (ইস্টপাকিস্তান রাইফেল্স) যুদ্ধ করেছে পাকহানাদার বাহিনীর সাথে এবার করবে বাংলার তরুণ সমাজ। তিনি নিজেই প্রশিক্ষণার্থীদের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। তাঁর সহযোগী হিসেবে বেছে নেন ইপিআর সুবেদার এ,কে,এম, মফিজুল বারি (বিডিআর এর প্রথম উইং কমান্ডার) এবং কয়েকজন ইনস্ট্রাকটর প্লাটুনে ভাগ করে দেয়া হয় সবাইকে। শুরু হয় পুরোদমে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং। শতশত মুক্তিকামী যুবককে দুঃসাহসী যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠা করা হয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

১০ এপ্রিল মেজর জিয়া, লেঃ খালেক ও ক্যাপ্টেন কাদের ৫০ জনের একটি গ্রুপের সাথে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রামগড় ত্যাগ করেন। তিনি তার গ্রুপসহ মহালছড়ি, রাঙ্গামাটি, মানিকছড়ি, বিভিন্ন স্থানে বিচরণ করেন। রাঙ্গামাটির বন্ধুকভাঙ্গা নামক স্থানে অবস্থান কালে তাঁরা প্রায় দুই লঞ্চবোঝাই পাকবাহিনীর হাতে বাধা গ্রস্থ হয়। প্রায় দুই ঘন্টা যুদ্ধে এই দ্বীপে শক্রপক্ষের বেশ কয়েক জন সৈন্য নিহত হয়। শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয় পাকবাহিনীর সদস্যরা। এদিকে পাকসেনারা নিজেদের দলভারী করার জন্য হাজার হাজার মিজোদের তাদের দলে অর্ন্তভুক্ত করে প্রশিক্ষণ দেয়। আর মুক্তি যোদ্ধাদের গুরুত্বপূর্ণ সকল ঘাঁটির উপর বিমান হামলা শুরু করে। অন্যদিকে মুক্তিবাহিনীর রসদ এবং গোলা বারুদ শেষ হবার পথে, তাছাড়া মুক্তি যোদ্ধাদের অধিকাংশেরই ছিলোনা পাহাড়ী এলাকায় কোন যুদ্ধের পূর্ব প্রশিক্ষণ। পরবর্তীতে মুক্তি যোদ্ধাদের পজিশন দুর্বল হয়ে পড়ে প্রায়। ঠিক এই নাজুক পরিস্থিতিতে ২৭ এপ্রিল সকালে মহালছড়িতে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধারা আক্রান্ত হয় শত্রু বাহিনীর হাতে। শত্রুরা ছিলো দলে ভাড়ী ও একটি নিয়োমিত কমান্ডো কোম্পানী। তাদের ছিলো ১৫-১৬ শ মিজোর দুটি ব্রিগ্রেড। যা মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যার চেয়ে দু’তিন গুন বেশি। ক্যাপ্টেন কাদের ছিলেন রাঙ্গামাটি রেকীতে। রেকী শেষে মেজর শওকতের প্লান অনুযায়ী ক্যাপ্টেন কাদের অসীম সাহসের সাথে বীর দর্পে মহালছড়িতে শত্রুদের উপর ঝাপিয়ে পড়েন তুমুল যুদ্ধে।

১৯৭১ সালে মিজোরা পাকিস্তানিদের পক্ষাবলম্বন করে। তারাও সংখ্যায় কয়েক’শ। এদিকে এক কোম্পানি পাকিস্তানি কমান্ডো আগেই ছদ্মবেশে মিজোদের সঙ্গে মিশে ছিল। এসব প্রতিরোধযোদ্ধাদের ধারণার বাইরে ছিল। তবুও ক্যাপ্টেন কাদেরের অসামান্য রনকৌশলের কাছে শত্রুরা হেরে গিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। মুক্তি যোদ্ধাদের পাল্টা আক্রমনে মিজোরা পিছু হটতে চাইলে পাকবাহিনীরা এমন ভাব দেখাত যে, পিছু হটতে চাইলে তারা নিজেরাই মিজোদের হত্যা করবে। তাই তারা এক রকম উম্মাদ হয়ে ওঠে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবন বাঁচানোর তাগিতে পাক হানাদাররাও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তারা মিজোদের সামনে রেখে একটার পর একটা আক্রমন চালিয়ে সামনে অগ্রসর হয়।

দুই কোম্পানি পাকিস্তানি কমান্ডো ও শত শত প্রশিক্ষিত বিদ্রোহী মিজো প্রতিরোধযোদ্ধাদের তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে। প্রতিরোধযোদ্ধারা অসীম সাহসের সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডো ও মিজোদের মোকাবিলা করতে থাকেন। প্রায় তিন ঘণ্টা যুদ্ধ চলার পর তাঁদের গোলাবারুদ প্রায় শেষ হয়ে আসে। এ অবস্থায় তাঁরা বেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন। তখন তাঁরা কৌশলগত কারণে পাকিস্তানি ও মিজোদের বেষ্টনী থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় প্রতিরোধযোদ্ধাদের সবচেয়ে কার্যকর মেশিনগান অবস্থান থেকে কভারিং ফায়ার দেওয়া হচ্ছিল, যাতে তাঁরা নিরাপদে পশ্চাদপসরণ করতে পারেন। হঠাৎ সেই মেশিনগান অকেজো হয়ে পড়ে। তা স্বচল করার চেষ্টা কালে শত্রুরা মুক্তিযুদ্ধাদের ঘিরে ফেলে, গর্জে ওঠে পাক-বাহিনীর মেশিন গান, নতুন এই বিপর্যয়ে ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের এককভাবে সাহসী ও অনন্য ভূমিকা পালন করেন। নিজের জীবনের মায়া উপেক্ষা করে তিনি গোলাগুলির মধ্যেই দৌড়ে গুরুত্বপূর্ণ উঁচু স্থানে একটা এলএমজি নিয়ে অবস্থান নেন। তিনি এলএমজি দিয়ে একনাগাড়ে কভারিং ফায়ার করতে থাকেন। তাঁর এই দুঃসাহসিক ভূমিকা ও এলএমজির কার্যকর ফায়ারের কারণে প্রতিরোধযোদ্ধাদের বেশির ভাগই নিরাপদে সরে যেতে সক্ষম হন। মহালছড়ি থানার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে কবর স্থানের ডান পার্শে বটবৃক্ষের নিচে অবস্থান করছিলেন ক্যাপ্টেন কাদের। দু’পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলছেই। এমন সময় পাক বাহিনীর তিন-চারটি গুলি এসে লাগে আফতাবুল কাদেরের বুকে। গুলি তাঁর হৃৎপি- ভেদ করে পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। এর পরও তিনি বেঁচে ছিলেন। মুমূর্ষু অবস্থাতেও গুলি করার চেষ্টা করেন। অস্ত্র থেকে হাত সরাননি।

তাঁর কাছেই ছিলেন অপরযোদ্ধা শওকত (ছাত্র) ও ফারুক নামের দুজন স্বেচ্ছাসেবী। গুরুতর আহত অবস্থায় মেজর মীর শওকতের নির্দেশে সহকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আফতাবুল কাদেরকে উঁচু স্থান থেকে নামিয়ে গোলাগুলির মধ্যেই একটি জিপে করে রওনা হন ফিল্ড হাসপাতালে। রামগড় নিয়ে যাওয়ার পথে জালিয়াপাড়া নামক স্থানে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ২৭ এপ্রিল বিকালে শহীদ বীরযোদ্ধা ক্যাপ্টেন কাদের এর পবিত্র মরদেহ রামগড় নিয়ে আসা হয়। এসময় সকলের চোখে মুখে নামে শোকের ছায়া। সন্ধ্যার প্রক্কালে রামগড় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গনে শহীদ ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদেরের জানাজা নামাজ শেষে কেন্দ্রীয় কবরস্থানে পূর্ণ সামরিক ও ধর্মীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। তাকে কবরস্থ করার সময় তার হাতে বিবাহের মেহিদীর রঙ ঝলঝল করছিল। তিনি সদ্য বিবাহীত স্ত্রীকে রেখে বাংলা মা’কে শক্রদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য ঝাপিয়ে পড়ে ছিলেন।

সেদিন আফতাবুল কাদেরের সাহসিকতা বীরত্বের জন্য প্রায় ৫০০ প্রতিরোধযোদ্ধা ও স্বেচ্ছাসেবী বেঁচে যান। মুক্তিযুদ্ধে নিয়মিত সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনিই প্রথম শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধের অসাধারণ ও গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতির স্বরূপ বিশেষত মহালছড়ির যুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য শহীদ আফতাবুল কাদেরকে ১৯৭৩ সালে সরকার মরণোত্তর বীর উত্তম খেতাব প্রদান করা হয়েছে।

তাঁর নামে খাগড়াছড়িতে স্মৃতি সৌধ, মহালছড়িতে ভার্স্কয, রামগড়ে কেজি স্কুল ও রাস্তার নাম করণ করা হয়েছে। রামগড়ে চির নিদ্রায় শায়িত বীরযুদ্ধা ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদেরকে মরণোত্তর “বীর উত্তম” উপাধিতে ভূষিত করা হলেও তাঁর নামে আজো কোন স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠান করা হয়নি। এমনিতেই খাগড়াছড়িতে কোন যাদুঘর নেই। এ মহান বীর মুক্তিসেনা নায়কের নামে শিঘ্রই একটি স্মৃতি যাদুঘর স্থাপনের জন্য সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন বলে খাগড়াছড়িবাসী আশা করেন।

জানাযায়, ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের ১৯৪৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহন করেন তিনি। পৈত্রিক নিবাস ছিল লক্ষীপুরের রামগঞ্জে টিওড়া গ্রামে। তার মাতা রওশনারা বেগম একজন গৃহিনী হলেও বাবা অবদুল কাদের ছিলেন ইংরেজ আমলের একজন ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট। তিনি ১৯৬৪ সালে ময়মনসিংহ জেলার মৃত্যুঞ্জয় স্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৬৬ সালে আনন্দ মোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ে ইংরেজি ¯œাতকে (সম্মান) ভর্তি হন। ১৯৬৭ সালে পাকিস্থান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। ১৯৬৯ সালে তিনি আর্টিলারী কমিশন প্রাপ্ত হন। ১৯৭০ সালে তিনি পাকিস্থান হায়দ্রাবাদ ক্যান্টনমেন্ট ৪০ফিল্ড আর্টিলারী রেজিমেন্টে ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগদেন।

৮ ডিসেম্বর রামগড় মুক্ত দিবস :

চড়াই উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে চলছিলো পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধ। মহান এ যুদ্ধে তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় (বর্তমান চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশিষ রায় এর পিতা) ঘোরতর বিরোধিতা করেছেন। অবশেষে স্বাধীনতার প্রাক্কালে তিনি পাকিস্তান পালিয়ে যান এবং আমৃত্যু বসবাস করেন। একই পথ অবলম্ভবন করে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন বোমাং সার্কেলের তৎকালিন রাজা অং শৈ প্রু চৌধুরীও। কিন্তু খাগড়াছড়ি মং সার্কেলের রাজা মং প্রু সাইন আবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। সে সময় রাজা মং প্রু সাইন মুক্তিবাহিনীর জন্য নিজ প্রাসাদ উজাড় করে দেন। মুক্তিযোদ্ধারা তার প্রাসাদে থেকেই যুদ্ধ করেছিলেন, বহু সাহায্য পেয়েছিলেন।

পরে ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর। খাগড়াছড়ি জেলার সীমান্ত শহর রামগড় হানাদারমুক্ত হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তি বাঙালি জনতা জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে রামগড় প্রবেশ করেন। ওইদিন পড়ন্ত বিকেলে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও পরবর্তীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য প্রয়াত সুলতান আহমেদ মুক্তিকামী বাঙালিদের নিয়ে রামগড় ডাকঘরের শীর্ষে বাংলার লাল-সবুজের পতাকাটি উত্তোলন করে রামগড়কে হানাদারমুক্ত ঘোষণা করে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন ফেনী নদীর তীরে অবস্থিত তৎকালীন মহকুমা শহর রামগড় ছিল চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামের প্রাণকেন্দ্র। রামগড় সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবির।

তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান এখান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। মেজর জিয়াউর রহমান একপর্যায়ে যোগাযোগ স্থাপন করেন ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় বিএসএফর প্রধান ব্রিগেডিয়ার পান্ডের সঙ্গে। ৪ এপ্রিল তেলিয়া পাড়া বিএসএফ ক্যাম্পে ব্রিগেডিয়ার পান্ডের সঙ্গে কনফারেন্স করেন, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর শফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশারফ ও মেজর শাফায়েতসহ বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তারা। ওই কনফারেন্সে মেজর জিয়াউর রহমানকে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

২ মে পাক বাহিনীর রামগড়ের ব্যাপক আক্রমন চালায়। রামগড়ে মুক্তিযুদ্ধ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের দায়িত্ব প্রাপ্ত মেজর রফিকুল ইসলাম সমস্ত স্থাপনা ও যুদ্ধ সামগ্রী সীমান্তের ওপারে ভারতের সাবরুমে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অসম সাহসী লাড়াইয়ের পরেও রামগড়ের পতন হয়।

পরবর্তীতে ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবির থেকে মুক্তিযোদ্ধারা মিত্র বাহিনীর সহযোগিতায় আবারো পাক সেনাদের ওপর আক্রমন শুরু করে। ৭ ডিসেম্বর রাতে এবং ৮ ডিসেম্বর ভোরে ভারতীয় দুটি জঙ্গি বিমান রামগড়ে পাক বাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনার উপর দুই দফা সফল হামলা চালিয়ে রামগড়কে হানাদারমুক্ত করে।

১৫ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি মুক্ত দিবস :

স্বাধীনতা যুদ্ধে চুড়ান্ত বিজয়ের একদিন পূর্বেই খাগড়াছড়িকে শত্রু মুক্ত করে বিজয়ের পতাকা উড়ানো হয়। মুক্তি সেনারা এই দিনে পাক বাহিনী, ও তাদের মিত্র মিজু বাহিনী ও রাজাকার বাহিনীর সাথে তুমুল যুদ্ধের মধ্যদিয়ে খাগড়াছড়িকে শত্রু মুক্ত করে। খাগড়াছড়ির স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন স্মৃতিচারণ থেকে জানাযায়, ভারত থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ও সাব এডমিনিষ্ট্রেটর হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হাজ্বী দোস্ত মোহাম্মদ চৌধুরী মুক্তি যোদ্ধাদের নিয়ে খাগড়াছড়ির তবলছড়ি, পানছড়ি, ভাইবোন এলাকায় পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে পাক বাহিনীকে পরাজিত করে। পরে খাগড়াছড়ি সদর অভিমুখে আসার পথে কুকিছড়া এলাকায় পাকিস্তানি অনুগত মিজো বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের উপর অতর্কিত গুলি বর্ষণ করে। মুক্তিযোদ্ধারাও পল্টা গুলি চালালে বাধে তুমুল যুদ্ধ। এ যুদ্ধে মিজু বাহিনী পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায় পূর্বের পাহাড়ের দিকে। বিজয়ের আগের দিন পর্যন্ত পাক সেনা, মিজো বাহিনী ও রাজাকারদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের দফায় দফায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এ সংঘর্ষে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে মিজো বাহিনী ও রাজাকার মিলে প্রায় ৩শ জনের মত নিহত হয়। এ সময় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে হাজ্বী দোস্ত মোহাম্মদ চৌধুরী ও উকিল আহাম্মদ বেশ সাহসী ভুমিকা রাখেন। সব শেষে ১৫ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি সদরে মুক্তিযুদ্ধের সাব ডিভিশন কমান্ডর ও সাব এডমিনিষ্ট্রেটর হাজ্বী দোস্ত মোহাম্মদ চৌধুরী সঙ্গীয় মুক্তি যোদ্ধাদের নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়ের পতাকা উড়ান।

সূত্র: উইকিপিডিয়া, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ১ ও মোজাম্মেল হক।

লেথক : উপদেষ্টা সম্পাদক, পাহাড়ের আলো।

Comment here