প্রবন্ধ ও কবিতা

নববর্ষঃ প্রেরণা আর উদ্দীপনার পার্বণ

॥ মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল ॥

বৈশাখের প্রথম দিবসটি আবহমান কাল থেকেই আমাদের সত্তায়, চেতনায় ও অনুভবের জগতে এক গভীরতর মধুর সম্পর্ক নিয়ে বিরাজ করছে। পহেলা বৈশাখ পুরনো জীর্ণকে ঝেড়ে ফেলে আমাদের যাপিত জীবনে নতুন সম্ভাবনা ও নতুন প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলতেই শুধু নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে একাকার হওয়ার প্রেরণাও জোগায়।

বৈশাখের প্রথম দিন হালখাতার দিন। বৈশাখের প্রথম দিন নতুন বছর শুরুর দিন। বৈশাখের প্রথম দিন থেকে বাঙালি-জীবনে নতুন বছরের সূচনা। নতুন জীবনের গোড়াপত্তন। বৈশাখের সঙ্গে বাঙালি-জীবনের একটা অতি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। নবান্নের পর মানুষ এ মাসে যেন কর্মকান্ত জীবনের মাঝে অনাবিল স্বস্তি ফিরে পায়। অনেক গ্রামেই সন্ধ্যায় গানের আসর বসে। আসরে পালাগান হয়, পুঁথিপাঠ হয় যাত্রাপালাও। বছরের অন্যান্য মাসে যেন সারা দিনমান ক্ষেত খামারে কাজ করতে হয়, বৈশাখে এসে জীবনের ধারা বদলে যায়। সারাদিন কাজ নয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা হয়ে ওঠে উৎসবে মুখরিত। গান-বাজনায় মেতে ওঠে জীবন। এ জীবনের মাঝেই বাংলাদেশের মানুষ খুঁজে পায় এক নতুন আস্বাদ, নতুন করে জীবন চলার পথের উপাদান, প্রেরণা আর উদ্দীপনা। তাই বাঙালি জীবনে এ মাসের গুরুত্ব অপরিসীম। জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেয়ে পল্লী মানুষের জীবনে এ মাসে, এ ঋতুতে নেমে আসে এক নব আনন্দধারা। এ ধারায় সিঞ্চিত হয়ে মানুষ নব উদ্যমে পরের মাসগুলোর কর্মমুখর জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

এক সময় গ্রামের কৃষকের কাছে নববর্ষের আগমন তেমন একটা গুরুত্ব ছিল না। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম সংখ্যাধিক্যের এ ব-দ্বীপে ‘ঈদ আনন্দের’ আদলে বিষেশত্ব খুঁজে পেত না বা দেখতো না। তাদের কাছে প্রতিটি সকাল একই রকম ছিল। তখন এতদাঞ্চলের কৃষকরা শুধু কাজ, কাজ আর কাজ নিয়ে সারা বছর ব্যস্ত থাকতো। ধর্মান্ধতার কূপমন্ডকতাও ছিলÑ যদিও এখন তা শুধুই অতীত। এ নিয়ে আলোকপাত না করলেই নয়।

প্রকৃতির এক অদ্ভুত রহস্য সময়ের আসা-যাওয়া, পবিত্র ইসলাম ধর্মে সময়ের সদ্ব্যবহারের কথা বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ সে জন্য ‘ওয়াল আসরে’ শব্দ উল্লেখের মাধ্যমে যুগের কসম করেছেন। যিনি সময়ের নিয়ন্ত্রণ কর্তা তিনি কেন সময়ের শপথ করলেন- এ প্রশ্নে ইসলামী চিন্তাবিদদের যুক্তি পাল্টা যুক্তি বিভিন্ন কিতাবে বিবৃত আছে। তবে এেেত্র সাধারণ অভিমত হলো ঈমান, সৎকর্ম, সত্য ও সবুরের উপদেশ দানের মাধ্যমে মানুষ যাতে তার আয়ুস্কাল বা সময়ের সদ্ব্যবহার করতে পারে এবং নিজেদের অনিষ্টের কবল থেকে রা করতে পারে-সেজন্য আল্লাহ কুরআনে সময়ের কসম  করেছেন। বাঙালি জাতির জীবনে বাংলা নববর্ষ উৎসব একটি বিশেষ অনুষ্ঠান এবং এটিও মহাকালের ঘূর্ণায়নের ইঙ্গিতবাহী। এই একবিংশ শতাব্দিতেও কেউ কেউ মনে করে বৈশাখি উৎসব হিন্দুদের, ওই অনুষ্ঠানে মুসলিমদের অংশ নেয়া হারাম। এটি আসলে ঠিক নয়। ইতিহাস স্যা দেয়, বাঙলা নববর্ষ উৎসবে প্রথমদিকে মুসলমানরাই পুরোপুরি সম্পৃক্ত ছিল। বাঙলা নববর্ষ প্রথম উদযাপিত হয়েছিল তৎকালীন মুসলিম নবাবদের মাধ্যমে। মোগল স¤্র্রাট শায়েস্তা খাঁ এক সময় ইরানি ঐতিহ্যে ঘেরা, ‘নওরোজ’ অনুষ্ঠান পালন করতেন। ঢাকায় এ অনুষ্ঠান বেশ জাকজমকের সাথে পালিত হতো। শায়েস্তা খাঁ ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে আঁতশবাজি ও রণতূর্যের সাথে ঢাকাবাসীর অভিবাদন গ্রহণ করতেন। মুসলিম নবাবদের অনেকেই নববর্ষের আনন্দে উদ্বেলিত হতেন এবং এ উপল্েয বিভিন্ন মিছিলে নেতৃত্ব দিতেন। পরবর্তীতে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ নানা ধর্মের মানুষের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে এটি এখন সার্বজনীন অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

প্রখ্যাত গ্রন্থ আইন-ই আকবরী থেকে জানা যায়, মুঘল সম্রাট আকবর বাঙলা সনের উদ্ভাবন করেন। বাঙলা সন ছাড়াও কৃষিকাজ ও রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে তিনি আমলি সন, বেলায়েতি সন, সুরাসানি সন-এসব ফসলি সনের প্রবর্তন করেন। তার নবরতœ সভার জ্যোর্তিবিজ্ঞানী ফতেহ উল্যাহ সিরাজীর নেতৃত্বে তিনি ভারতের বিভিন্ন এলকায় সনকে চান্দ্র ও সৌর বৈশিষ্ট্য সমন্বিত করেন। মূলত: হিজরি সনের সিড়ি বেয়েই বাঙলা সন জন্মলাভ করেছে। স¤্রাট আকবর প্রবর্তিত সেই বাঙলা নববর্ষই আজ বাঙালির প্রাণের অনুষ্ঠান।

এক সময় পশ্চিম পাকিস্তনিদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃৃতিক চাপে এ অনুষ্ঠান হারিয়ে যেতে বসেছিল। স্বাধীনতা-উত্তর বাঙালি মুসলমানদের প্রবল উৎসাহে তা আবার পুনরুজ্জীবিত হয়। ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাঙলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক বাঙলা নববর্ষের প্রথম দিনে ছুটি ঘোষণার মাধ্যমে বাঙালি জাতির এ লোকজ অনুষ্ঠানকে আরো বেগবান করেন। বাঙালি মুসলমান সে বছর অবশ্য বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মাধ্যমে নববর্ষকে বরণ করেছিল। ষাটের দশকের পরে নগর সংস্কৃতি আর মুসলিম উগ্রবাদের চাপে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বহুকাল ধরে পালন করা এ অনুষ্ঠান অনেকাংশেই তার জৌলুস হারায়।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রাণের এ উৎসবে হাওয়া লাগতে শুরু করলেও কতিপয় ধর্মান্ধ উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর অপপ্রচারে উৎসবটি খুড়িয়ে চলছিল। ৯০-এর দশকে এসে বাঙালির পালা-পার্বণের হাত ধরে এটি সার্বজনীনতা পায়।
আমাদের দেশ মূলত: পালা-পার্বণের দেশ। এখানে সামাজিক অনুষ্ঠান লেগেই আছে। তারপরও মানুষ ভুলে থাকে, আবার বৈশাখ এলেই তা মনে পড়ে। সামাজিক অনুষ্ঠানে নানা ধরণের গান পরিবেশিত হয়। এসব গানে বাংলার মানুষের প্রাণের কথা, মনের ভাষা, হৃদয়ের আবেদন আর অন্তরের আকুলতা অত্যন্ত বাস্তব হয়ে ধরা পড়ে। মাঠের গান, ঘাটের গান, লোকগান বাংলা মানুষের আপন সংস্কৃতি। এতে রয়েছে গ্রামীণ  মানুষের সহজ-সরল ভাবের প্রকাশ। এতে শাস্ত্রীয় সংগীতের জটিলতা নেই। সুরের বক্রতা বা ব্যকরণ নেই। আছে শুধু সহজ-সরল অনুভূতি আর আবেদন। তাই লোকসংগীত বাংলার মানুষের প্রাণ। এ সঙ্গীত চিরায়ত। এই গান বিষয়, ভাব, রস আর সুরের দিক দিয়ে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও হৃদয়গ্রাহী।
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে গ্রীষ্মের খরতাপের বৈশিষ্ট্য কবিতা ও গানের মাঝেও প্রতিফলিত। এ ঋতুর গানের বাণীতে গ্রীষ্মের রূপ ফুটে উঠেছে। গ্রীষ্মের রূপ দু’ভাবে ধরা পড়েছে। একটি তার বহিরঙ্গ দৃশ্যমূর্তি, অপরটি অন্তরঙ্গ ভাবমূর্তি। গ্রীষ্মের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রূপটি রু, কঠোর, বিশুদ্ধ ও প্রচন্ড। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈশাখের এই রূপের কথা ভেবে গান লিখেছেন, ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ, তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে, বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক। যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি; অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক’। জাতীয় কবি নজরুলের ভাষায়Ñ‘ওই নতুনের কেতন ওড়ে,কালবোশেখির ঝড়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর’।

এখন বৈশাখে উৎসবের ঢল নেমে আসে। মেলা বসে গ্রামে গ্রামে। শহরে-নগরে গঞ্জে। কত না বিচিত্র হাতের তৈরি দ্রব্যসম্ভার সেসব মেলায় বিক্রি হয়। সে সকল দ্রব্যসামগ্রীতে বাংলার মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবনধারার একটা স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। এ সকল মেলা যেন গ্রাম-বাংলার মানুষেরই প্রতিচ্ছবি। তাদের জীবন যেন খন্ড খন্ড হয়ে ধরা পড়ে তাদের হাতের কারুকাজে। মাটির পুতুল, পাটের শিকা, তালপাতার পাখা, সোলার পাখি, বাঁশের বাঁশি, ঝিনুকের ঝাড়, পুঁতিরমালা, মাটির তৈরি হাতি-ঘোড়া-বাঘ-সিংহ কত যে অদ্ভুত সব সুন্দর জিনিসের সমাবেশ ঘটে সেই মেলায়, চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হয় না বাংলার মানুষের জীবন কত সমৃদ্ধশালী। মানুষ গরিব হতে পারে, দারিদ্র্যতা সাথী হতে পারে, কিন্তু এসব জীবন জটিলতা তাদের মনকে আনন্দ খুশি থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। কবিতায়-গানে-সঙ্গীতে তারা তাদের জীবনকে ভরিয়ে তোলে। শীত পেরিয়ে আসে বসন্ত। কোকিলের কুহুতান শেষ হয়ে গেলে বসন্ত পেরিয়ে গ্রীষ্ম আসে। পৌষ-মাঘের শীত আর ফাল্গুন-চৈত্রের বসন্ত যেন এক হয়ে বাঙালির জীবন আনন্দ হিল্লোলিত করে তোলে বৈশাখের আগমনে।
স্বাগত হে ১৪২৩ সাল। এই নতুন বছর জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুফল বয়ে আনবেÑএটাই দেশবাসীর সঙ্গে আমাদেরও প্রত্যাশা। আমরা এখনও পারিনি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ও বাংলা সনের প্রবর্তন করতে। রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি অনুষ্ঠানে আমরা বাংলা সনের ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাই। নতুন বছরের আগমনের সময়েও দেশজুড়ে নানা সংকটের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ইউপি নির্বাচন। প্রচন্ড তাপদাহে পুড়ছে গোটা দেশ। তপ্ত চারদিক, তপ্ত মানুষের মনও। রৌদ্রে ঝলসানো প্রকৃতি পোড়ামাটির রূপ নিয়েছে। এরই মধ্যে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সঙ্কট মানুষকে নাজেহাল করছে। হাজারো সমস্যার আবর্তে থেকেও আমরা নি¤œমধ্যবিত্ত জাতিতে পরিণত হতে পেরেছিÑ এ পাওয়া নিয়ে জাতি গর্ব করতেই পারে।

বাংলা নববর্ষের দিন বাঙালির জীবনে এক সর্বজনীন উৎসবের দিন। ঈদ, দুর্গাপূজা, বৌদ্ধপূর্ণিমা, খ্রিস্টমাস ডে ইত্যাদি নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্ব^ীদের উৎসব। কিন্তু নববর্ষ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাই পালন করে। বাংলা নববর্ষ বাঙালির জাতীয় উৎসব। অশুভ সংঘাত-সংঘর্ষকে ভুলে নবসৃষ্টির জন্য নতুন সাধনা ও নতুন সংগ্রাম দেখা দিক আমাদের জীবনধারায়। সব অন্যায়, অবিচার, মতালিপ্সা, সম্পত্তিলিপ্সা ও ভোগলিপ্সার জায়গায় দেখা দিক সর্বজনীন কল্যাণকর শুভবোধ ও শুভকর কর্মধারা। গণতন্ত্র, পরমতসহিষ্ণুতা, ঐক্য, ন্যায়বিচার, দায়িত্ব, কর্তব্য, দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা, বিনয়, ভদ্রতা, সৌজন্য, সহ্য, ধৈর্য, শ্রদ্ধা ভালোবাসা, সততা, জাতীয়তাবোধ ও জাতীয় স্বাধীনতার চেতনা দেখা দিক সবার মধ্যে। স¤্রাট নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘বিশ্ব খারাপ মানুষের হিং¯্রতার কারণে কষ্ট পায় না, পায় ভালো মানুষগুলোর নীরবতার কারণে’। তাই আসুন আমরা সব অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ ও বঞ্চনা, নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটিকে সবার কল্যাণকর করে গড়ে তুলতে ‘দেশপ্রেম’ জাগ্রত রেখে পথচলার অঙ্গিকার করি। নতুন বছরে এসব অশুভ শক্তির পাপ-তাপ ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে নবপ্রভাতের সূর্য উদিত হোক, বর্ণিল আলোকচ্ছটায় নিঃশেষ হয়ে যাক সব গ্লানি, জরাÑএটাই হোক এবারের নববর্ষের প্রেরণা। লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

Comment here