অন্য মিডিয়াআন্তর্জাতিকজাতীয় সংবাদশিরোনামস্লাইড নিউজ

ঈদুল ফিতর দেশে দেশে

ড. আবদুস সাত্তার :

সমগ্র মুসলিম দুনিয়ায় সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসবের নাম ঈদুল ফিতর। মুসলিম প্রধান দেশ ছাড়াও বিশ্বের নানা দেশে বসবাসকারী মুসলমানরাও এই ঈদুল ফিতরের উৎসব অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করেন। জাকার্তা এবং ম্যানিলায় মহিলাদের বিশাল ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। কোথাও কোথাও নারী-পুরুষ একত্রে ঈদ উৎসব পালন করেন। এসব দেশের ঈদ উৎসবের ছবি দেখলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে উৎসব কত

বিস্তৃত। বাংলাদেশে এ ধরনের উৎসব পালন করতে দেখা যায় না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঈদ উপলক্ষে মেলার আয়োজনও করা হয়। নানা ধরনের খেলাধুলা এবং শিশুদের চিত্রাঙ্কনেরও ব্যবস্থা করতে দেখা যায়। দিনব্যাপী এ সব অনুষ্ঠান চলে। ফলে প্রকৃত অর্থে ঈদের পুরো আনন্দ তারা উপভোগ করে থাকে। কোনো কোনো দেশে উটকে নানা সাজে সজ্জিত করে ঈদকার্ড তৈরি করা হয় ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য। ইন্দোনেশিয়ায় নানা বয়সের মেয়েরা বাহারি সাজে উৎসবে যোগদান করেন। বিভিন্ন ধরনের জীবজন্তুর চিত্র সংবলিত নানা রঙয়ের অসংখ্য বেলুন আকাশে উড়িয়ে থাকেন এসব মহিলারা। নানা ধরনের পসরা নিয়ে মহিলারা মেলায় হাজির হন। কাগজ, তালপাতা ও অন্যান্য সমাগ্রী দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খেলনা ও দর্শনীয় সামগ্রী তৈরি করে উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলেন তারা। এরূপ নানাধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে ঈদের দিনকে প্রকৃত উৎসবের দিনে পরিণত করা হয় বিভিন্ন দেশে। আমেরিকান লং আইল্যান্ডের (নিউ ইয়র্কে) বিশাল ময়দানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ম্যানিলা, চায়না, ফালুজা, গাজা স্ট্রিপ, কায়রো এবং তিউনিসিয়াসহ অসংখ্য দেশে নানাভাবে ঈদকে উৎসব মুখর করে তোলা হয়। আর এসব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সবার সহযোগিতা থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে ঈদের দিন মসজিদে নামাজ আদায় করা এবং বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে যাতায়াত করার মধ্যেই উৎসব সীমিত থাকতে দেখা যায়। অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক উৎসব আয়োজন করতে দেখা যায়। ২০১৫, অর্থাৎ গত বছরের ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আয়োজিত আন্দানুষ্ঠানে বিপুল দর্শকের উপস্থিতিতে একজন মেয়েকে দীর্ঘ বাঁশ হাতে দড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা যাচ্ছে একটি চিত্রে। বিপুল দর্শক উপস্থিতি উৎসবের ব্যাপকতা প্রমাণ করছে। এ উৎসব, ঈদ জামাত এবং ঈদের শোভাযাত্রা মূলত মুঘল আমলের পরমপরাগত উৎসবেরই অংশ।

মুঘল ইন্ডিয়ার কথা অনেকেরই জানা যে, সে সময় ঈদ এবং ঈদের অনুষ্ঠানকে সরকারিভাবে গুরুত্ব দেয়া হতো। মুঘল সাম্রাজ্যে যেসব অনুষ্ঠান হতো সেসব অনুষ্ঠানের আবার চিত্রাঙ্কনও করা হতো। এমনই একটি চিত্রে প্রথম মুঘল সম্রাট বাবরকে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তারা কোর্টের সভাসদরকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে দেখা যাচ্ছে। প্রায় সব মুঘল সম্রাটদেরকেই ঈদের নানা উৎসব পালন করতে দেখা গেছে। এ সব তথ্য ইতিহাসে যেমন আছে, তেমনি আছে শিল্পী অঙ্কিত চিত্রেও। মুঘল সাম্রাজ্যের শিল্প সংস্কৃতির প্রতি উদার হৃদয় সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর তার ইংরেজ অফিসার টমাস মেটকাফেকে দিয়ে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করিয়েছেন। যেগুলো ইতিহাসের পাতায় স্থান লাভ করেছে।

টমাস মেটকাফে ১৭৯৫ সালের ২ জানুয়ারি ৪৯, পোর্টল্যান্ড প্লেস, লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দিল্লি আসেন ১৮১৩ সালে। এই সময় থেকে তিনি ৪০ বছর দিল্লিতে বসবাস করেন। স্যার টমাস মেটকাফে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিভিল সার্ভেন্ট ছিলেন। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের কোর্টে কাজ করবার কারণে মেটকাফে সম্রাটের প্রিয়ভাজন হওয়ার সুযোগ লাভ করেন। বাহাদুর শাহ জাফর স্যার টমাস মেটকাফেকে দিয়ে ভারতের শিল্প সংস্কৃতির ওপর জরিপ করা এবং সেগুলোর ওপর চিত্রাঙ্কন করার দায়িত্ব প্রদান করেন। এরূপ একটি সুন্দর দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার পর মেটকাফে অতি উৎসবের সাথে কাজ শুরু করেন। তিনি ভারতের শিল্পীদের সহযোগিতায় মুসলিম আর্টিটেকচারের ওপর গবেষণা ও চিত্রাঙ্কনের কাজ শুরু করেন। একে একে গুরুত্বপূর্ণ ইমারতগুলোর চিত্র অঙ্কন করেন। এরপর মুঘল আমলে ঈদকে কেন্দ্র করে যেসব অনুষ্ঠান হতো সেই অনুষ্ঠানেরও চিত্র অঙ্কনে অসাধারণ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। এমনই একটি চিত্রের নাম ‘ঈদের শেভাযাত্রা’। এই চিত্রটির আকার ৩,৯১৫´১,২৩০ পিক্সেলস। ফাইল সাইজ : ১.৪৭ এমবি, এমআইএমই টাইপ : ইমেজ/জেপেগ। চিত্রের মাধ্যমে কালি, তুলি ও রঙ। চিত্রটি কাগজে আঁকা। ১২ ফোল্ডের দীর্ঘ এই স্ক্রল চিত্রে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর, তার ছেলে এবং আত্মীয়স্বজন উপস্থিত রয়েছেন। উপস্থিত রয়েছেন স্যার টমাস মেটকাফে ও অন্যান্য সভাসদরা। ঈদ শোভাযাত্রার চিত্রের সর্বত্র রয়েছে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। সম্রাট, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সম্রাটের ছেলে ও আত্মীয়স্বজনেরা সুসজ্জিত হাতির পিঠে অবস্থান করছেন। ঘোড়ার পিঠেও রয়েছেন কেউ কেউ। যার সরাসরি উদ্যোগে এ চিত্র সৃষ্টি হয়েছে সেই টমাস মেটকাফে অবস্থান করছেন সুসজ্জিত হাতির পিঠে। যেসব শিল্পী চিত্রাঙ্কনের ক্ষেত্রে মেটকাফেকে সাহায্য করেছেন তাদের মধ্যে দিল্লির চিত্র শিল্পী মাজহার আলী খানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শিল্পী অঙ্কিত চিত্রটি কাল্পনিক নয়। বাস্তব দৃশ্য অবলম্বনেই ঈদুল ফিতরের এ চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী সাধারণ মানুষ যাতে মুঘল সম্রাট, সভাসদ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কর্মচারীদের সান্নিধ্যলাভে উৎসাহ বোধ করেন সে জন্য শোভাযাত্রার সর্ব পরিকল্পিতভাবে তাদের অবস্থানকে নিশ্চিত করেছে। এটাই এ চিত্রের বিশেষত্ব।

ঈদুল ফিতরের শোভাযাত্রার এ ঐতিহাসিক চিত্রটি ছাপা রয়েছে ‘দ্য গোল্ডেন ফান’ নামক গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থে। গ্রন্থটি লিখেছেন স্যার টমাস মেটকাফের মেয়ে ‘এমিলি’। এমিলির জন্ম ১৯৩০ সালে। বাবার সাথে থেকে ব্রিটিশ ভারতের সব কিছু দেখেছেন এবং নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছেন। তার সেই জ্ঞানও অভিজ্ঞতা থেকেই মুঘল ইন্ডিয়ার সব বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করেছেন এই গ্রন্থে। গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন এম এম কেই। আমি যখন আমেরিকা সরকারের ফুলব্রাইট গ্রান্টের অধিনে নিউ ইয়র্কের প্রাট ইনস্টিটিউটে উচ্চ শিক্ষার্থে অবস্থান করছিলাম (১৯৮৫-১৯৮৭) তখন ইনস্টিটিউট সংলগ্ন ফুটপাথের এক দোকান থেকে এই গ্রন্থটি ক্রয় করেছিলাম মাত্র এক ডলারে।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে সপ্তাহে একদিন প্রাট ইনস্টিটিউটের চার পাশের রাস্তার ফুটপাথে নানা ধরনের সামগ্রীর দোকান বসতো। সেই ফুটপাথের একটি দোকান থেকেই গ্রন্থটি ক্রয় করি ১৯৮৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২১ তারিখে। এই গ্রন্থে ঈদুল ফিতরের যে ছবি ছাপা আছে তার দৈর্ঘ্য ১০০ সে.মি. এবং প্রস্থ ২১ সে.মি.। উল্লেখ্য যে, এখানে পুরো শোভাযাত্রার ছবিকে সমান দুই ভাগ করে ওপর-নিচে ছাপা রয়েছে। অর্থাৎ সমগ্র শোভাযাত্রার চিত্রের দৈর্ঘ্য হচ্ছে ২০০ সে.মি। গ্রন্থে চিত্রটিকে ৬ ফোল্বেড ভাঁজ করে সংযুক্ত করা হয়েছে। উল্লিখিত চিত্রের আকৃতি গ্রন্থের আকার অনুযায়ী উল্লেখ করা হলো। প্রকৃত চিত্রের আকৃতি গ্রন্থের চিত্রের বহুগুণ বেশি। দ্য গোল্ডেন কাম নামক এই গ্রন্থটির আকৃতি ৯ ইঞ্চি বাই ৮ ইঞ্চি। স্যার টমাস মেটকাফের কন্যা এমিলি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই গ্রন্থটি লিখেছেন।

পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের রাজ দরবারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের কারণে সম্রাট পরিবারের সাথে টমাস মেটকাফের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠে। আর এই ঘনিষ্ঠতার কারণে সম্রাট অন্দরমহল পর্যন্ত মেটকাফের যাতায়াত ছিল। স্যার টমাস মেটকাফের জন্ম ইংল্যান্ডে হলেও জীবনের পুরোটাই কাটিয়েছেন মুঘল দরবারে। ফলে তিনি মুঘল সাম্রাজ্যকে অত্যন্ত ভালোবেসেছিলেন। ভালোবেসেছিলেন সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের পরিবারকেও। ফলে মেয়ে এমিলিকে নিয়ে সুখেই ছিলেন সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের দরবারে। কিন্তু তার এই সুখ একদিন অসুখে পরিণত হলো। স্যার টমাস মেটকাফে পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হলেন। কোনো কিছুই হজম করতে পারতেন না। পেটের পীড়ায় ভুগে ভুগে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন (এ কেস অব দিল্লি পয়জনিং এবং দ্য দিল্লি বুক অব টমাস মেটকাফে)। মৃত্যুর পর স্যার টমাস মেটকাফেকে সমাধিস্থ করা হয় দিল্লির কাশ্মিরি গেটের সংলগ্ন সেন্ট জেমস চার্চে। স্যার টমাস মেটকাফে এবং তার সুযোগ্য মেয়ে এমিলি মুঘল ইন্ডিয়া এবং মুঘল ইন্ডিয়ার ইসলামি সংস্কৃতিকে কতটা ভালোবেসে ছিলেন তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত ‘গোল্ডেন কাম’ নামক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটি। ২১০ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থের প্রতিটি পাতায় রয়েছে ইসলামি সংস্কৃতির নিদর্শনগুলো। গ্রন্থের বিভিন্ন অংশে টমাস মেটকাফে মেয়ে এমিলি ঈদ সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন। তারাবির এবং ঈদের জামাতের শৃঙ্খলা তাকে অভিভূত করেছে। ঈদের পবিত্রতায় তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। কোরবানি ঈদের ত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের বিষয়টি তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি যেমন ঈদ দেখেছেন তেমনি ঈদের শোভাযাত্রাও দেখেছেন। ফলে তার পক্ষে সব বিষয়কে যথাযথভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে। এমিলি লিখিত এই গ্রন্থ এবং গ্রন্থে সন্নিবেশিত ঈদুল ফিতরের শোভাযাত্রার দীর্ঘ চিত্র বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়কে যুগযুগ ধরে অনুপ্রাণিত করবে। সম্মানিত পাঠক চিত্রে বর্ণিত ঈদ এবং ঈদের আনন্দ আমাদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করুক এটাই কামনা করি। সবাইকে ঈদ মোবারাক। সূত্র: দৈনিক নয়াদিগন্ত।

Comment here