ক্রীড়াপাহাড়ের সংবাদপ্রবন্ধ ও কবিতারাঙ্গামাটি সংবাদশিরোনামস্লাইড নিউজ

পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনাময় স্থান যমচুগ বনাশ্রম

jamchuk 2॥ বিহারী চাকমা ॥
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিখ্যাত শমথ ও বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র যমুচুগে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। রাঙামাটি শহরের উত্তর পুর্ব দিকে সদর উপজেলার বন্দুকভাঙা মৌজার সর্ব্বোচ্চ পাহাড় চুড়ায় এই কেন্দ্রের অবস্থান। যমচুগের চারিদিকে অনেক ছোট-বড় উচু নীচু পাহাড় রয়েছে। রয়েছে অসংখ্য পাহাড়ি ছড়া-ছড়ি ও ঝর্ণা।

কণর্ফুলী নদীর শাখা নদী কাচালং ও চেঙ্গী নদীর মাঝখানের পাহাড়টিতে যমচুগ বনাশ্রম ভাবনা কেন্দ্রটি ১৯৮৩ সালে স্থাপন করা হয়। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১৩০০ফুট উচ্চতার এ যমচুগ পাহাড়ে উঠলে চেঙ্গী ও কাচালং নদীর স্বচ্ছ ও নীল জলরাশি দেখে আগন্তুকদের মন ছুয়ে যায়। এছাড়া নদীতে চলাচলকারী ছোট বড় নৌযান গুলো ঢেউ তুলে নদীর বুক চিড়ে চলে যাওয়ার দৃশ্য ভাবুকের হৃদয়েও আবেগের সৃষ্টি করে। আশপাশের উচু-নীচু ছোট-বড় পাহাড়গুলোতে সবুজের সমারোহ যেন অনবরত পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকে।

এ বিহারে রয়েছে বহু বছর আগে যম চাকমা রোপিত পত্র-পল্লবে সুশোভিত একটি বটগাছ (বোধিবৃক্ষ)। যার নীচে মহামতি গৌতম বুদ্ধের প্রতিমুর্তি। রয়েছে ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য দ্বিতল বিশিষ্ট একটি পাকা ভবন, নির্মাণাধীন রয়েছে তিনতলা বিশিষ্ট বুদ্ধ মন্দির। শমথ ও বিদর্শন ভাবনা অনুশীলনের জন্য ৯টি ছোট ছোট ভাবনা কুটির ও একটি মাটির গুদাম, একটি দেশনালয়, একটি বেইন ঘর, ১টি ভিক্ষুদের ভোজন শালা, অষ্টশীলধারীদের জন্য একটি কুটির, একটি রন্ধনশালা, একটি অতিথি শালা ও পরিচালনা কমিটির অফিসঘর। সবচে আশ্চর্য্যজনক বিষয় হচ্ছে কোনো সড়ক যোগযোগ ছাড়াই এই বিহারে দু’দুটি তিনতলা ও দ্বিতল বিশিষ্ট পাকাভবন নির্মাণ করা হয়েছে স্থানীয় জনগণের কঠোর শারীরিক পরিশ্রমে। বিল্ডিং নির্মাণের যাবতীয় নির্মাণ সামগ্রী কাধে বহন করে নেয়া হয় বলে জানান যমচুগ বনাশ্রম ভাবনা কেন্দ্রের অধ্যক্ষ কল্যাণ জ্যোতি স্থবির। নানা প্রজাতির ফলজ বনজ ও ওষুধি গাছ ছাড়াও বিহারের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট বড় অনেক বট গাছ, নাগেশ্বর গাছ ও রয়েছে। এসব গাছের নীচে ছায়ায় বসে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা একাগ্রমনে সুত্র আবৃত্তি ও ধর্মগ্রন্থ পাঠ করেন এবং সুমধর স্বরে ধর্মীয় গাথা ও বন্দনাদি আবৃত্তি করেন। রয়েছে রঙ-বেরঙের নানা প্রজাতির ফুলগাছ ও ফুলের বাগান। যেখানে আগন্তুকরা এক নজর দৃষ্টি না দিয়ে সেখান থেকে চলে যায় না। বিহারের চারিদিকে ঘোরাফেরা করার সুবিধার্থে সুন্দরভাবে নির্মাণ করা হয়েছে রাস্তা। এসব রাস্তাও প্রশস্তভাবে কাটা হয়েছে।

বিহারের পুর্বপাশে রয়েছে যমকুয়া বা যমপুঅ। যম চাকমা এ কুয়া থেকে পানি খেয়েছেন বলে এ নাম। এ কুয়া থেকে এখনো খাবার পানি সংগ্রহ করা হয়। কুয়ার পাশে ছড়ায় ছোট একটা দেয়াল দিয়ে অন্য একটি কুয়াও নির্মাণ করা হয়েছে। ভিক্ষু এবং সাধারণ মানুষ সেখানে স্নান কার্যাদি সম্পাদন করেন এবং এই কুয়া থেকে মেশিন দিয়ে বিহারে পানি সরবরাহ করা হয়।

স্থানীয়রা জানান,  যমচুগ পাহাড়টির পুর্ব নাম ছিল বন্দুককোণা মোন। মোন মানে হচ্ছে উচু পাহাড় চুড়া। দুর থেকে পাহাড়টিকে অনেকটা বন্দুকের মত দেখাতো বলে এলাকার লোকজন এ নামকরণ করেছিলেন বহু আগে। প্রায় শত বছর আগে বন্দুক কোণা মোনে ইমিলিক্যা চাকমা যম নামে এক চাকমা তান্ত্রিক সাধক এই পাহাড়ে যোগ সাধনা করেছিলেন। তিনি দীর্ঘকাল যাবৎ সেখানে বসবাস করেন।

১৯৮৩ সালে এখানে বৌদ্ধ বিহার স্থাপন করার সময় ইমিলিক্যা চাকমার স্মৃতিকে ধরে রাখার মানসে তারই নামানুসারে বিহারের নামকরণ করা হয় যমচুগ বনাশ্রম ভাবনা কেন্দ্র। পার্বত্য চট্টগ্রামের কিংবদন্তী বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু সাধনানন্দ মহাস্থবির বনভান্তের দিক-নির্দেশনা ও আর্শীবাদ নিয়ে স্থানীয় লোকজন বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। বিহারের পুর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৫০টির বেশি গ্রামের মানুষ বিহার স্থাপন কাজে এগিয়ে আসে। সাধনাননন্দ মহাস্থবির বনভান্তের শিষ্যরা এখানে নিয়মিত শমথ ও বিদর্শন ভাবনা অনুশীলন  করেন। কেউ কেউ ধুতাঙ্গব্রতও পালন করেন। কোরীয়া সিঙ্গাপুর, থাইওয়ান, ভারত থেকে বিভিন্ন সময় বৌদ্ধ ভিক্ষু এসে যমচুগ বনাশ্রম ভাবনা কেন্দ্রে ধ্যান সাধনা করেছিলেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এ ছাড়া রাঙামাটির বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এ বিহারে সফর করেছিলেন  এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী কল্প রঞ্জন চাকমা, চাকমা রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায়, পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার, সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান চিংকিউ রোয়াজা, ড. মানিক লাল দেওয়ানসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং উচ্চ পদস্থ সরকারী কর্মকর্তারা এ বিহার পরিদর্শনে এসেছিলেন বলে জানা যায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী থাকাকালীন সময় কল্প রঞ্জন চাকমা বিহারে যাতায়াতের সুবিধার্থে নদী থেকে বিহার পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী থাকাকালে মনি স্বপন দেওয়ান এমপি এ বিহারের জন্য সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, এনজিও, রাজনৈতিক দলের লোক, সমাজের বিত্তশালী মানুষসহ সর্বস্তরের মানুষ যমচুগের উন্নয়নে দান করেছেন।

বনভান্তের প্রধানশিষ্য নন্দপাল মহাস্থবির বহু বছর এই যমচুগ বনাশ্রম ভাবনা কেন্দ্রে শমথ ও বিদর্শন ভাবনা করেছিলেন। ১৭ বৎসর যাবৎ এই পাহাড়ে ধ্যান সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছেন বলে তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্য ও ভক্ত দায়ক-দায়িকাদের বিশ্বাস। তিনি ভারতের বুদ্ধগয়া, অরুনাচল, কলকাতাসহ বিভিন্ন প্রদেশে বন বিহার প্রতিষ্ঠা করে বুদ্ধধর্ম প্রচার করে চলেছেন। রাজধানী নয়াদিল্লী,  মুম্বাই, আসামসহ বিভিন্ন স্থানে তিনি ভক্তদের কাছে ধর্মোপদেশ দিতে যান বলে জানান তাঁর শিষ্য দেবধাম্মা মহাস্থবির। নন্দপাল মহাস্থবির বর্তমানে কম্বোডিয়া, নেপাল, থাইল্যান্ড ইত্যাদি বৌদ্ধ প্রধান দেশের নানা প্রান্তে ভগবান বুদ্ধের অহিংসা সাম্য মৈত্রী ও মুক্তির বাণী প্রচারের পাশাপাশি তাঁর গুরু বনভান্তের হিতোপদেশ প্রচারে ব্যস্ত রয়েছে। তাঁর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একটাই। গুরুর মত ধ্যান সাধনায় সিদ্ধিলাভের পর বুদ্ধ ধর্মের চরম লক্ষ্য নির্বাণ সাক্ষাৎ করা।

যমচুগে যেভাবে যাবেন : রাঙামাটি শহর থেকে নদীপথে যমচুগে যাওয়া যায়। রাজবন বিহার ঘাট, রাজবাড়ী ঘাট, পাবলিক হেলথ ঘাট, বনরুপা সমতা ঘাট, রিজার্ভ বাজার ঘাট থেকে দেশীয় ট্রলার যোগে যাওয়া যায়। এছাড়া স্পীড বোটেও যাওয়া যায়। রাঙামাটি শহর থেকে স্পীড বোটে যমচুগের ঘাটে পৌঁছতে সময় লাগে আধ ঘন্টা। সাধারণ দেশীয় ট্রলারে যেতে সময় লাগে ২ ঘন্টা। ঘাট থেকে হাটা পথে যমচুগে উঠতে সময় লাগে ১ ঘন্টা। ওঠার সময় রাস্তার পাশে পাহাড়িদের বাড়ীতে বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ রয়েছে। চাইলে রাত্রিযাপনও করা যায়। সেখানকার মানুষরা খুবই অতিথি বৎসল। তাছাড়া যমচুগে যাওয়া হচ্ছে জানলে কদরটা আরেকটু বেড়ে যায়।

যমচুগ বনাশ্রম ভাবনা কেন্দ্র পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রূপক চাকমা যুবক্যা জানান, এ জায়গাটি সম্পর্কে প্রচার-প্রচারণা না থাকায় এবং পর্যটন নিয়ে রাঙামাটিতে যারা কাজ করেন তারা গুরুত্ব না দেয়ার কারণে অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং পর্যটন সংশ্লিষ্টরা যমচুগ বনাশ্রম ভাবনা কেন্দ্র ও  আশেপাশের এলাকায় পর্যটন শিল্প বিকাশে এগিয়ে এসে অপার সম্ভাবনাময় এ জায়গাটিকে কাজে লাগিয়ে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের জন্য আকর্ষনীয় পর্যটন স্পট হবে বলে মনে করেন  স্থানীয়রা।

Comment here