খাগড়াছড়িখাগড়াছড়ি সংবাদপাহাড়ের সংবাদশিরোনামস্লাইড নিউজ

খাগড়াছড়িতে ককবরক দিবসে ভাষা সাহিত্য প্রতিযোগীতার পুরষ্কার বিতরণ

দহেন বিকাশ ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ি: ককবরক ত্রিপুরা জাতির মাতৃভাষা এবং ত্রিপুরা রাজের আদি ভাষা ককবরক। ১৯৭৯ সালের ১৯ জানুয়ারীতে ত্রিপুরা রাজ্যের একটি সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করায় প্রতিবছর এই দিনে ককবরক দিবস পালিত হয়। এবারে দিবসটি উপলক্ষে তৃতীয় বারের মতো গত রবিবার (১৭জানুয়ারী ২০২১) থেকে তিনদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ (বিটিকেএস) এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নলেন্দ্র লাল ত্রিপুরার সভাপতিতে শুভ উদ্বোধন করেন খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শরনার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, এমপি।

আর সমাপনী দিনে মঙ্গলবার (১৯ জানুয়ারী ২০২১খ্রি.) বিকাল ৪টায় ককবরক উৎসব উদযাপন কমিটির আয়োজনে বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ (বিটিকেএস); ত্রিপুরা স্টুডেন্টস্ ফোরাম-বাংলাদেশ (টিএসএফ), য়ামুক (একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন) ও ককবরক রিসার্চ ইনস্টিটিউট এর সম্মিলিত সহযোগিতায় আলোচনা সভা, ককবরক ভাষা সাহিত্য উপর প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরষ্কার বিতরণী ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে। সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ’ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অনন্ত কুমার ত্রিপুরার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মংসুইপ্রু চৌধুরী অপু।

এসমময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য খোকনেশ্বর ত্রিপুরা, পাজেপ সদস্য হিরণজয় ত্রিপুরা ত্রিপুরা, ককবরক (ত্রিপুরা ভাষা) লেখক ও নাট্যকার অলিন্দ্র ত্রিপুরা, ভাইবোনছড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পরিমল ত্রিপুরা, পেরাছড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান তপন বিকাশ ত্রিপুরা, বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ’ কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক ও নারী নেত্রী শাপলা দেবী ত্রিপুরা প্রমুখ। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মংসুইপ্রু চৌধুরী বলেন, ভাষা সংস্কৃতি চর্চার জন্য খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ যা যা সহযোগিতা করা দরকার তা বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। অনুষ্ঠানে ৪৩তম ককবরক দিবস উদযাপন কমিটির সদস্য জয় প্রকাশ ত্রিপুরার সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন ৪৩তম ককবরক দিবস উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যান সংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাহিত্য ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা।

এসময় বাংলাদেশে এ পর্যন্ত বিভিন্ন বই, পুস্তিকা, ম্যাগাজিন ইত্যাদি প্রকাশনার মাধ্যমে ককবরকে যতটুকু সাহিত্য চর্চা হয়েছে সেই কাজকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে নতুন প্রজন্মের ককবরক প্রেমীদের আরোও অধিক সক্রিয় হতে হবে। কারণ ত্রিপুরাদের আত্মপরিচয়ের একটি প্রধান উপাদান বলেই শুধু নয়, তাদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্যও ককবরকের লিখিত চর্চার বিকাশ ঘটানো দরকার বলে উল্লেখ করেন বক্তারা । এছাড়াও দিবসটি উপলক্ষে ধারণা পত্রও বিলি করা হয়। এতে উল্লেখ যে, বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতা, বদান্যতা ও বিশেষ অবদান স্মরণীয়। ইতোমধ্যে ২০১৭সাল থেকে সরকারের উদ্যোগে ককবরকভাষি শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের নিমিত্তে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে প্রাক-প্রাথমিক থেকে ৩য় শ্রণি পর্যন্ত ককবরক পাঠ্যবই প্রণীত হয়েছে এবং পাঠদানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

ককবরক সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে হলে নতুন প্রজন্মকে অধিকতর সক্রিয় হতে হবে। এসময় প্রাথমিক শিক্ষা যেহেতু জেলা পরিষদের একটি হস্তান্তরিত বিষয়, সেহেতু মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাকে যথাযথ ও পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়নের কর্তৃপক্ষ হলো পার্বত্য জেলা পরিষদ। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মংসুইপ্রু চৌধুরীর মাধ্যমে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট ককবরক উৎসব উদযাপন কমিটি কয়েকটি আবেদন ও প্রস্তাবনা পেশ করেন। তা হলো:- ১) মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য সরকারি নির্দেশনা জারি করা। এই কাজটি করার জন্য পার্বত্য জেলা পরিষদ কর্তৃক উচ্চ পর্যায়ে লবি করা। ২) মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম (এমএলই প্রোগ্রাম) বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করার জন্য জেলা পরিষদ কর্তৃক যথাযথ প্রবিধান প্রণয়ন করে এর বাস্তবায়ন ও পরিচালনার রূপরেখা তৈরি করা। প্রয়োজনে জেলা পরিষদের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ করা বা কেন্দ্রীয় সরকার থেকে প্রয়োজনীয় বাজেট নিয়ে এসে তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। ৩) প্রয়োজনীয় শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ ও স্ব স্ব মাতৃভাষার স্কুলে স্ব স্ব জাতির শিক্ষক পদায়ন করা। ৪) শিক্ষকদের জন্য পিটিআই ও অন্যান্য প্রশিক্ষণে মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করা। ৫) ককবরক সমার্থক শব্দভান্ডার নিয়ে ডিকশনারি প্রকাশ করার জন্য প্রজেক্ট তৈরি করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা। ৬) জেলা পরিষদ কর্তৃক সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট (ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট/উসাই) এর মাধ্যমে গবেষণা ও প্রকাশনা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা। এ কার্যক্রমকে জোড়দার করার জন্য ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর জন্য উসাই এ সহকারি পরিচালক ও গবেষক পদ সৃষ্টি করা (এই পদগুলি ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠী সকলের জন্য সৃষ্টি করা)।  ৯) লেখক, গবেষক ও প্রকাশকদেরকে বই বা ম্যাগাজিন প্রকাশনা ও গবেষণা কাজে পৃষ্ঠপোষকতা করা। ১০) লেখক, গবেষক ও প্রকাশকদেরকে স্বীকৃতি বা পুরস্কার প্রদান করা।

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে ককবরকের লিখিত চর্চা দেখা যায় চল্লিশ দশকের প্রথমার্ধে। ১৯৪২সালে সাধক খুশী কৃষ্ণ (বলং রায় সাধু) সর্বপ্রথম ককবরকে আধ্যাত্মিক গান রচনা করে প্রকাশ করেন। ককবরকে রচিত তার প্রথম বইটর নাম‘‘ত্রিপুরা খা-কাচংমা খুমবার বই’’। তারই পদাঙ্ক অনুসরণ করে বর্তমান পর্যন্ত ককবরক সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে কতিপয় প্রবীন-নবীণ ব্যক্তিত্বের পদচারণা দেখা যায়। তন্মধ্যে বরেন ত্রিপুরা, সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, মহেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, সুরেশ মোহন ত্রিপুরা, প্রভাংশু ত্রিপুরা, অলেন্দ্র লাল ত্রিপুরা প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৬৬সালে বরেন ত্রিপুরার ‘‘অজানা পাহাড়ী সুর’’ নামে ককবরক ভাষায় (বাংলায় অনুবাদসহ) একটি গানের বই প্রকাশিত হয়।

ককবরকের লিখিত চর্চায় প্রয়াত সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার অবদান স্মরণীয়। তিনি ত্রিপুরা ককবরক গীতিকার, সুকরার ও শিল্পী গবেষক। তার লেখা দুইটি উল্লেখযোগ্য বই হল ‘‘ককবরক অভিধান ও ব্যাকরণ’’ (১৯৯০) এবং ত্রিপুরা শিক্ষার প্রথম পাঠ’’ (১৯৮৪)। ত্রিপুরা সমাজে বহুল প্রচারিত একটি জনপ্রিয় গীতিকাব্য ‘‘পুন্দাতান্নায়’’ বা জিজোক পুন্দা গীতিকাব্য  বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ থেকে ১৯৭৯সালে প্রকাশিত হয়। সাধু চিত্তরঞ্জন ত্রিপুরা সর্বপ্রথম বাংলা থেকে শ্রী ভাগবদ গীতাকে ‘‘ককবরক’’ ভাষায় অনুবাদ করেন। লেখক প্রভাংশু ত্রিপুরা ‘‘কক্-বরক ও আদি শিক্ষা’’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছেন। রেডিও বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে পাহাড়িকা অনুষ্ঠানে ত্রিপুরা ভাষায় স্থানীয় সংবাদ ও গান প্রচারিত হয়।