খাগড়াছড়িখাগড়াছড়ি সংবাদপাহাড়ের সংবাদমাটিরাঙ্গাশিরোনামস্লাইড নিউজ

ফলোআপ: মাটিরাঙ্গায় মসজিদ পুকুরের প্রকল্প চুরির নেপথ্যে আসলে কারা ?

দিদারুল আলম রাজু, খাগড়াছড়ি: খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার গোমতি ইউনিয়নের মধ্য গড়গড়িয়া পাড়া জামে মসজিদ পুকুরের প্রকল্প চুরির নেপথ্যে উঠে এসেছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নাম। সরকারিভাবে প্রকল্প বরাদ্দ দেয়া হয়েছিলো মসজিদের পুকুর খনন ও ঘাট নির্মাণের জন্য, অথচ সেই প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে প্রবাসী বাবুল হোসেনের মালিকানাধীন পুকুরে। গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, মেম্বার ও মসজিদ পরিচালনা কমিটি। তবে তাদের সেই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে না পেরে এখন একে অপরকে দোষারোপ করে দিচ্ছেন পাল্টাপাল্টি বক্তব্য।
প্রবাসী বাবুল হোসেনের ছেলে গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘পুকুরের প্রকল্প নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই পুকুরের জায়গাটি মসজিদের নামে লিখে দেয়ার জন্য আমাদের উপর নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। মসজিদ পরিচালনা কমিটি, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও মেম্বার আমাদের কাছে এমন অযৌক্তিক আবদার করছেন। আমরা এতে রাজী না হওয়ায় আমাদের নানাভাবে হুমকিও দেয়া হচ্ছে। তারা এমনও বলেছেন যে, মসজিদ কর্তৃপক্ষ আমাদের একটি না-দাবী পত্র দেবেন তবুও যেন আমরা জায়গাটি লিখে দেই। আমাদের জায়গা মসজিদের নামে লিখে দেয়ার প্রশ্নই আসে না। প্রয়োজনে আমরা মসজিদ পরিচালনা কমিটির বিরুদ্ধে মামলা করবো।’
গোলাম কিবরিয়া অভিযোগ করে আরও বলেন, ‘আমার বাবা বাবুল হোসেন প্রবাসে থাকেন। জায়গাটি মূলত উনার নামেই। সরকারিভাবে প্রকল্পটি বরাদ্দ হবার পর স্থানীয় মেম্বার, চেয়ারম্যান ও মসজিদ পরিচালনা কমিটি আমার কাছে আসেন। প্রকল্পটি আমাদের জায়গায় বাস্তবায়নের অনুমতি চান এবং এর বিপরীতে ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা দাবী করেন আমাদের কাছে। আমরা তাতে রাজী হইনি। তবুও তারা আমাদের জায়গাতে পুকুরেই খনন কাজ শুরু করে দেন।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি গোলাম হোসেন বলেন, আমি বয়োবৃদ্ধ একজন নিরীহ মানুষ। সভাপতি হিসেবে আমি কেবল নামেই আছি, সবকিছু হয় এলাকার মেম্বার ও চেয়ারম্যানের নির্দেশে। তারাই সব জানেন।
অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শাহজাহান সিরাজ বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। এসব চেয়ারম্যান এবং মসজিদ পরিচালনা কমিটির কাজ।
তবে অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে গোমতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যন বলেন, ‘বিষয়টি আমি মিমাংসার চেষ্টা করেছিমাত্র। বাবুল মিয়ার ছেলে কিবরিয়ার কাছে পুকুরের জায়গাটি মসজিদের নামে লিখে দেয়ার অনুরোধ করেছিলাম। এখানে অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিলো না। তবে এখন আমি এর ধারে-পাছে নেই, এ ব্যাপারে আর মাথাও ঘামাতে চাই না।
এদিকে সংবাদ প্রকাশের পরপরই পুকুরের খনন কাজ বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। এ বিষয়ে তদন্ত করে তিন কার্য দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে মাটিরাঙ্গা উপজেলা প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো।
খাগড়াছড়ি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহজাহান বলেন, ‘অভিযোগটি তদন্ত করে প্রাথমিকভাবে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। মসজিদ পরিচালনা কমিটি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি পুকুরকে মসজিদের পুকুর হিসেবে দেখিয়ে প্রকল্পটি আত্মসাৎ করতে চেয়েছিলো। এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই দাপ্তরিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এছাড়া খনন কাজের কোন বিল দেয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহজাহান।
এদিকে অনিয়ম করেছে মসজিদ পরিচালনা কমিটি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অথচ তার খেসারত দিচ্ছেন পুকুর খনন কাজের উপ ঠিকাদার। ইতোমধ্যে প্রায় খনন কাজের প্রায় ৮০ শতাংশ সমাপ্ত হয়েছে। সেই কাজের বিল পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় আছেন তিনি।
খনন কাজের উপ-ঠিকাদার মাটিরাঙ্গা পৌরসভার কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘অনিয়ম করলে তা করেছে মসজিদ পরিচালনা কমিটি কিংবা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। এখানে আমাদের কোন অপরাধ নেই। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর হতে আমাদের যেখানে খনন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো আমরা সেখানেই খনন করেছি। অথচ বিনা অপরাধে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
প্রসঙ্গত, সারাদেশে পুকুর ও খাল উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গেলো বছরের ডিসেম্বরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে বরাদ্দ আসে মধ্য গড়গড়িয়া পাড়া জামে মসজিদের পুকুর খনন ও ঘাট নির্মাণ কাজের। ওই পুকুরটি খননে ১০ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৫ টাকা এবং ঘাট নির্মাণের জন্য ৬ লাখ ৯৭ হাজার ১৯ টাকা চুক্তিমূল্যে বরাদ্দ দেয়া হয়। খনন কাজের জন্য ‘ফারহানা আকতার’ ও ঘাট নির্মাণে ‘রুবেল এন্টার প্রাইজ’ নামে পৃথক দুটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান অনুমতি পায়। ঘাট নির্মাণের কাজ এখনো শুরু না হলেও ইতোমধ্যে খননের কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সমাপ্ত হয়ে গেছে। তবে তা বাস্তবায়িত হচ্ছিলো মসজিদের পাশ্ববর্তী প্রবাসী বাবুল হোসেন এর মালিকানাধীন একটি পুকুরে। এই নিয়ে পাহাড়ের আলো পত্রিকাসহ বিভিন্ন অনলাইন ও প্রিন্ট ভার্সনে অনিয়মের সংবাদ প্রকাশ করে।