খাগড়াছড়িখাগড়াছড়ি সংবাদপাহাড়ের সংবাদশিরোনামস্লাইড নিউজ

অবকাঠামো সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত খাগড়াছড়ি জেলা ও দায়রা জজ আদালত

মোবারক হোসেন: অবকাঠামো সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত খাগড়াছড়ি জেলা ও দায়রা জজ আদালত। বিচারকদের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যাঘাত হবার পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে রয়েছে বিচার প্রার্খীরা।

জেলা ও দায়রা জজ আদালত সূত্রে জানা যায়, জেলার ৯ উপজেলার ৩৮ ইউনিয়নের আয়তন প্রায় ২৭০০ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ৭ লক্ষ। জনগণকে আইনী সেবা নিশ্চিত করার জন্য ১৯৯৪ সালে প্রতি তলায় ৪ কক্ষ করে মোট ৮ কক্ষ বিশিষ্ট দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়। সেই ভবনটি নির্মান করার হয় তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও সিভিল জজের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর নির্বাহী বিভাগ হতে বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর সেই ৮ কক্ষ বিশিষ্ট ভবনেই ২০০৮ সালের ১জুলাই খাগড়াছড়িতে শুরু হয় জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারিক কার্যক্রম। প্রথম পর্যায়ে একজন জেলা ও দায়রা জজ এবং একজন যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ পদায়ন করা হয়। ২০০৮ সাল হতেই এই জেলায় ২টি বিচারিক আদালত পরিচালিত হয়ে আসছিলো। ২০১৮ সালে এসে যোগ হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দ্রমন ট্রাইবুন্যালের বিচারিক কার্যক্রম এবং লিগ্যাল এইড কার্যক্রম। এই ভবনে চার বিচারকের জন্য এজলাস, ব্যক্তিগত অফিস বাদ দিলে রেকর্ড রুম, নকল শাখা, প্রশাসনিক শাখাসহ অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য কক্ষ নেই বললেই চলে। ভবন সংকট থাকায় কোন রকম ছোট এজলাসে চলছে বিচারিক কার্যক্রম। অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত, সিনিয়র সহকারি জজ আদালত এবং সহকারি জজ আদালত প্রতিষ্ঠা কাগজে কলমে থাকলেও ভবন সংকটে বাস্তবে নেই পৃথক পৃথক আদালত। ফলে প্রায় ৩হাজার মামলা পড়েছে জটের মধ্যে। এতে করে সময় মতো বিচার পাওয়ার শঙ্কার পাশাপাশি বিচার প্রার্থীদের ভোগান্তি বেড়েছে বহুগুন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, এজলাসে বিচারকের বসার চেয়ার সেই মান্ধাতার আমলের। আইনজীবীদের বসার জন্য লম্বা বেঞ্চ রয়েছে তিন সারিতে। ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম এখনো চালু করা হয় নি। বিচারচলাকালীন সময়েও ছোট এজলাসে জায়গা হয়না আইনজীবীদের। অনেক আইনজীবীকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় বাহিরে। এমনকি আসামী কাঠগড়ায় কোন রকম দাঁড়াতে পারলেও স্বাক্ষীদের দাঁড়ানোর পর্যাপ্ত জায়গা নেই। জেলা ও দায়রা জজের খাস কামরায় পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় জরুরি প্রয়োজনে বিচারকরা একত্রিত হয়ে বৈঠক করার সুযোগ সীমিত। প্রায় ২৬ বছর আগে ছোট পরিসরে নির্মিত অপরিকল্পিত ভবনে ডিজিটাল যুগের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা কোনোভাবেই সম্ভব না। জেলা ও দায়রা জজ এবং অন্যান্য বিচারকদের যাতায়াতের জন্য নেই প্রয়োজনীয় যানবাহন। বেশিরভাগ বিচারককে একটি মাইক্রোবাসেই ভরসা রাখতে হয়। জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে গাড়ি পার্কিং নেই। নেই দুর্গম এলাকা হতে প্রতিদিন বিচারের জন্য আসা লোকজনের জন্য বিশ্রামাগার বা শোচাগার। আসামী রাখার জন্য যে কক্ষ তাতে ১০ জন এক সাথে রাখা কষ্ট সাধ্য হলেও কখনো কখনো সেখানে দ্বিগুন বা তিনগুন আসামীকে গাদাগাদি করে রাখা হয়। সম্প্রতি জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ শহীন উদ্দিন যোগদানের পর বর্তমান আদালতে বাস্তবচিত্র উল্লেখ করে আইন মন্ত্রণালয়ে একটি পত্র লিখেছেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, এই জেলার ভৌগলিক অবস্থা, দূরুত্ব, অবহেলিত ও অনুন্নত পাহাড়ি জনপদ, পিছিয়ে পড়া দারিদ্র জনগোষ্টি, অর্থনৈতিক অবস্থা, দিন দিন জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ সার্বিক বিবেচনা করে খাগড়াছড়ি বিচারিক আদালতকে ২টি ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে। জনসাধারণরে দুর্ভোগ কমাতে ২টি অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত, আরো ১টি যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ১টি সিনিয়র সহকারি জজ আদালত ও ২টি সহকারি জজ আদালত সৃষ্টি করা জরুরী। কাঠামোগত উন্নয়ন ও নতুন পদ সৃষ্টি করে জনবল নিয়োগের প্রস্তাবনা দেয়া উক্ত পত্রে। এটি বাস্তবায়ন হলে বিচারক, বিচারপ্রার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের দুর্ভোগ কমে আসবে অনেকাংশে।

দিঘীনালা উপজেলা থেকে আসা বিচার প্রার্থী হোসনেয়ারা বেগম, মিলন ত্রিপুরা, মাটিরাঙা উপজেলা থেকে আসা আবুল হাসেম, লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা থেকে আসা সুমন চাকমা বলেন, খাগড়াছড়ি কোর্টে আসা বিচার প্রার্থীদের কষ্ট আর দু:খের শেষ নেই। এখানে আমাদের বসার ব্যবস্থা নেই, টয়লেটের ব্যবস্থা নেই, পানির ব্যবস্থা নেই, আদালতে গিয়ে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা নেই। কোটে আসলে মনে হয় নরকে এসে পড়েছি। এই ব্যবস্থা হতে উত্তরণের জন্য তার দ্রুত আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ অবকাঠামো নির্মাণের দাবী জানান।

খাগড়াছড়ি জেলা রেডক্রিসেন্টর ভাইস চেয়ারম্যান এ্যাড. জসিম উদ্দিন মজুমদার বলেন, জেলা পর্যায়ের প্রায় সকল কর্মকর্তা অত্যাধুনিক বাড়ি ও গাড়ির সুবিধা ভোগ করলেও সেই সুযোগ সুবিধা পায়নি খাগড়াছড়ি জেলা ও দায়রা জজ। জেলা পর্যায়ের সর্বোচ্চ পদবীর বিচারকের বাসার পলেস্তারা খসে পড়ছে। বর্বাকালে পানি পড়ছে। আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া নেই, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারের আইন মন্ত্রণালয় সরকার প্রধান এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এই প্রত্যাশা করছি।

খাগড়াছড়ি জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট আশুতোষ চাকমা, সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আকতার উদ্দিন মামুন, পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট বিধান কানুনগো বলেন বিচার বিভাগ স্বাধীনের কয়েক দশক পার হলেও তার সুফল পায়নি খাগড়াছড়িবাসী। বিচারকদের জন্য পর্যাপ্ত কক্ষ নেই, আইনজীবী ও বিচার প্রার্থীদের জন্য কোন সুযোগ নেই বললেই চলে। বিচার ব্যবস্থা অত্যাধুনিক করতে অবকাঠামোসহ সকল ক্ষেত্রে উন্নয়ন কর্মকান্ড সম্পন্ন করতে বিভিন্ন সময় আইন মন্ত্রনালয়ের প্রতি অনুরোধ করা হয়েছে। আশাকরি সুফল আমরা পাবো।

খাগড়াছড়ি জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন জানান, ভবন শুধু ছোটই নয়, অনেক পুরাতন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বিচার কার্যক্রম নিশ্চিত করতে অত্যাধুনিক অবকাঠামোসহ জনবল সংকট সমাধানের জন্য আইন মন্ত্রনালয়কে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আশাকরি সাধারণ জনগণের বিচারপ্রাপ্তি ভোগান্তি ও দুর্ভোগ লাঘবে সরকার ও আইনমন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।