• June 19, 2024

ইউপিডিএফ’র আধিপত্য বিস্তার লড়াইয়ে বিভীষিকাময় জনপদ খাগড়াছড়ি

এম সাইফুল ইসলাম: পাহাড়ি সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তারে খাগড়াছড়ি বিভীষিকাময় জনপদে পরিণত হয়েছে। সপ্তাহকাল ধরে চলছে পাল্টা-পাল্টি হামলা, বাড়ীঘর ভাংচুর অগ্নিসংযোগ অব্যাহত রয়েছে। পাল্টা-পাল্টি হামলায় জীবন গেছে অন্তত ৭ জনের। নিখোঁজ রয়েছে অনেকে। আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সহিংসতার কারণে বহু পাহাড়ি পরিবার তাদের বৈসাবি উৎসব পালন করতে পারেনি। প্রাণ ভয়ে অন্তত ৪০টি গ্রামের পাহাড়ি পরিবার উদ্বাস্তু হয়ে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। শুধু মহালছড়িতে আশ্রয় নিয়েছে ২৫টি গ্রামের ৪৪টি পরিবারের নারী ও শিশু। অনেকে এসেছে এক কাপড়ে। অনেক ছাত্র-ছাত্রীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ক্লাশ ও পরীক্ষা চললেও তাতে অংশ নিতে পারছে না কেউ।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, বৈসাবি উৎসবের মধ্যে খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ (প্রসীত), ইউপিডিএফ (বর্মা) ও জেএসএস (এমএন) গ্রুপের নেতকর্মীরা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। অপহরণ, হামলা, পাল্টা হামলা প্রাণ হারায় অন্তত ৭জন। তবে অধিকাংশ লাশ গুম করা হয়েছে। প্রতিপক্ষের হামলা, হুমকি, বাড়ীঘর ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অন্তত ৪০ টি গ্রামের দেড় শতাধিক পরিবারের নারী ও শিশু খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এ সময় সন্ত্রাসীরা নিপীড়ন ও নির্যাতনের পাশাপাশি অর্থ-সম্পদ লুটের অভিযোগ করেছেন। ভুক্তভোগীরা জানান, বাড়ীঘর ছেড়ে তারা এক কাপড়ে এসেছে। অনেকের লেখা পড়া বন্ধ হয়ে গেছে।

জেলার মহালছড়ি উপজেলার খুলরাম উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে শুক্রবার সকালে বিভিন্ন স্থান পালিয়ে আসা উদ্বাস্তু পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এ সময় মহালছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান বিমল কান্তি ত্রিপুরা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামান্না নাসরিন উর্মি ও উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান কাকলি খীসাসহ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা উপস্থিত ছিলেন। উদ্বাস্তু পরিবারগুলোকে মশারি, চাউল, ডাল বিতরণ করা হয়। তবে ত্রাণ বিতরণের ঘটনাকে ইউপিডিএফ’র জেলা সংগঠক মাইকেল চাকমা একটি মহলের সাজানো নাটক আখ্যায়িত করে বলেন, কেউ কাউকে উচ্ছেদ হয়নি।

খুলরাম উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ত্রাণ নিতে আসে, মহালছড়ি উপজেলার বেতছড়ি পুরাতন পাড়ার বাসিন্দা সপ্তম শ্রেনীর ছাত্রী লিজা চাকমা। বেতছড়ি জেনারেল ওসমানী উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেনীতে পড়ুয়া এ ছাত্রী বলেন, এক সপ্তাহ আগে সন্ত্রাসীরা তাদের পরিবারকে বসতবাড়ী থেকে উচ্ছেদ করে দেয়। এখন তার পড়ালেখা বন্ধ।

লক্ষীছড়ি উপজেলার বাইন্না ছোলা থেকে পালিয়ে কনিকা চাকমা জানান, তার স্বামী জেএসএস (এমএন) গ্রুপ করে এ অজুহাতে এক সপ্তাহ আগে তাদের ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সন্ত্রাসীরা এক কাপড়ে বাড়ী থেকে বের করে দেয়। দুল্যাতলী ইউনিয়ন থেকে আরো ৩টি পরিবারকে এলাকা ছাড়াে হুমকি দিয়েছে বলে জানা গেছে। মহালছড়ির ফরেষ্ট অফিস এলাকার অদর্শী তালুকদার জানান, সন্ত্রাসীদের এক ঘন্টার নোটিশে তাকে বাড়ী ছাড়া করা হয়। আগামী ২১ এপ্রিল থেকে পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ুয়া তার সন্তান ওপেন চাকমার পরীক্ষা শুরু হবে। সে নিয়ে তিনি চিন্তিত।

ইউপিডিএফ (বর্মা) গ্রুপের গণমাধ্যম শাখার সমন্বয়ক মিঠুন চাকমা বলেন, ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের হামলা ও হুমকিতে গত এক সপ্তাহে অন্তত দেড় শতাধিক পরিবার বসতবাড়ী থেকে উচ্ছেদ হয়েছে। তারা গ্রামে গ্রামে আমার কর্মী-সমর্থকসহ সাধারণ মানুষকে মারধর করছে। পক্ষান্তরে ইউপিডিএফ’র (প্রসীত) এর জেলা সংগঠক মাইকেল চাকমা পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, একটি বিশেষ গোষ্ঠীর সহযোগিতায় মুখোশবাহিনী পুরো জেলায় অরাজকতা চালাচ্ছে। প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

মহালছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামান্না নাসরিন উর্মি বলেন, মানবিক কারণে তারা অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। পাশাপাশি নিরাপত্তার দেওয়া কথাও বলেন ঐ কর্মকর্তা। মহালছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান বিমল কান্তি চাকমা ঘটনাগুলোকে অমানবিক ও নিন্দনীয় বলে মন্তব্য করে বলেন, আমিও আতংকিত ও হতাশ।  তিনি আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের লড়াই বন্ধ না হলে খাগড়াছড়িতে মানবিক বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে বলে মত প্রকাশ করেন।

পাহাড়ের আলো

https://pahareralo.com

সর্বাধিক জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল। সর্বশেষ সংবাদ সবার আগে জানতে চোখ রাখুন পাহাড়ের আলোতে।

Related post