খাগড়াছড়িখাগড়াছড়ি সংবাদপাহাড়ের সংবাদবান্দরবান সংবাদরাঙ্গামাটি সংবাদশিরোনামস্লাইড নিউজ

পাহাড়ে আবারো লাশ!

আলমগীর হোসেন: পাহাড়ে আবারো একের পর এক লাশ। অশান্ত হয়ে উঠেছে খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক দলের কোন্দলনে সবুজ পাহাড়। প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গ্রুপগুলো আধিপত্ত বিস্তারে সুযোগ পেলেই একে-অপরের ওপর আক্রমন চালাচ্ছে। যে কারণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আঞ্চলিক দলগুলোর নেতাকর্মীসহ খাগড়াছড়ি এলাকার সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কে আছেন। একের পর এক নৃশংস ঘটনা মানুষকে চরম ভয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। একাধিক সূত্র বলেছে, বড় ধরনের নৃশংসতার আশঙ্কা করছেন অনেকেই। সবশেষ রবিবার ১৫জুলাই মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইন্দং ইউনিয়নের স্বর্বস্বপাড়ায় প্রতিপক্ষের গুলিতে ১ জেএসএস (সংস্কার) কর্মী নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভোর ৫ টার দিকে তাইন্দং ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের সর্বস্বপাড়ার পেজেন্দ্র লাল চাকমার ছেলে শান্তি জীবন চাকমা (৪৫) র বাড়ি ঘেরাও করে কতিপয় অস্ত্রধারী ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা। এসময় শান্তি জীবন চাকমা ইউপিডিএফ’র উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যাবার সময় ঘরের পাশের লোঙ্গাতে পড়ে গেলে সন্ত্রাসীরা তার ২ পায়ে ২টি গুলি করে এবং পরে তার গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়। ঘটনার পর থেকে বিজিবি ও পুলিশ ঐ এলাকা ঘিরে রেখেছে এবং বর্তমানে ঐ এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

নিহত শান্তি জীবন চাকমা পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন জেএসএস (সংস্কার)’র কর্মী বলে জানা গেছে। নিরাপত্তাবাহিনীর সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সূত্রগুলো এঘটনায় পাহাড়ের চুক্তি বিরোধী আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফকে দায়ী করলেও ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে কোন বক্তব্যে পাওয়া যায়নি। একের পর এক নৃশংস ঘটনা মানুষকে চরম ভয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। একাধিক সূত্র বলেছে, বড় ধরনের নৃশংসতার আশঙ্কা করছেন অনেকেই।

দুই মাস হতে না হতেই পার্বত্য অঞ্চলের আরেক উপজেলা চেয়ারম্যান দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত হয়েছেন। খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা চেয়ারম্যান চঞ্চুমনি চাকমা গত শুক্রবার দুপুরে মোটরসাইকেলে বাসায় যাওয়ার পথে খাগড়াছড়ি প্রেস ক্লাব সংলগ্ন ইসলামিয়া মাদরাসার সামনে দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত হন। একই দিনে খাগড়াছড়ির আলুটিলায় প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত ইউপিডিএফ কর্মী জ্ঞানেন্দু চাকমার লাশ নিতে আসা তার ছোট ভাই কালায়ন চাকমাকে (২২) অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা। আগের দিন জ্ঞানেন্দু চাকমা নিহত হন। এ ঘটনায় জেএসএস সংস্কারকে দায়ী করে ইউপিডিএফ। পরদিন দুপুরের দিকে ভাইয়ের লাশ নিতে গেলে কালায়ন চাকমাকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যায়। জ্ঞানেন্দু চাকমাকে গুলি করে হত্যার পর থেকে তার লাশ মহালছড়িতে না নিতে পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিয়ে আসছিল হত্যাকারীরা।

গত ৩ মে রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তি চাকমাকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ওই ঘটনার পর অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন বড় ধরনের সহিংস ঘটনার। অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমা ২০১০ সালে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি থেকে বেরিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) নামে গঠিত নতুন দলে যোগ দেন। সংস্কারপন্থী এই নেতা ছিলেন ওই সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি।

ওই আশঙ্কা ঠিকই একদিন পরই প্রমাণিত হয়। পরদিন ৪ মে শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়ায় অংশ নিতে গিয়ে পথে সশস্ত্র হামলায় নিহত হন ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা, একই দলের নেতা সুজন চাকমা, সেতুলাল চাকমা ও টনক চাকমা। তাদের বাঙালি গাড়িচালক সজীবও নিহত হন।
ওই ঘটনার মাস তিনেক আগে নিহত হয়েছেন ইউপিডিএফের ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাবেক সভাপতি মিঠুন চাকমা। মিঠুন হত্যার কয়েক দিন আগে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক নামে দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। মিঠুন ওই দলে যোগ দিয়েছিলেন। গত ৩ জানুয়ারি কোর্টে হাজিরা শেষে বাড়িতে গেলে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী তাকে অপহরণ করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাহাড়ে চারটি সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠন প্রতিনিয়ত খুন-খারাবির ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। প্রথমে এই অঞ্চলে সশস্ত্র সংগঠন ছিল শুধু জেএসএস। সেটি ভেঙে ইউপিডিএফ গঠিত হয়। তখন থেকে পাহাড়ি অঞ্চলে জেএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ হতো। পরে জেএসএস সংস্কার নামে আরেকটি সশস্ত্র গ্রুপের আত্মপ্রকাশ ঘটলে তখন সংঘর্ষ হতো তিন গ্রুপে। ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর খাগড়াছড়ির খাগড়াপুরে একটি কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে আত্মপ্রকাশ করে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক নামের আরেকটি গ্রুপ। ইউপিডিএফ থেকে শৃঙ্খলাভঙের দায়ে বহিষ্কৃত ও জনসংহতি সমিতির সংস্কারপন্থী অংশের কিছু নেতাকর্মী এই দলটি গঠনের পেছনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। দল ভাঙার দেড় মাসের মাথায় খুন হন মিঠুন চাকমা। এর আগে খুন হন দলের নেতা অনিল চাকমা ও অভিলাষ চাকমা। এ ছাড়া অনিল চাকমার অনুসারী সন্দেহে লক্ষ্মীছড়িতে রয়েল মারমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই কায়দায় রঞ্জন মুনি চাকমার (আদি) নেতৃত্বে বাঘাইছড়ির জারুলছড়িতে তার শ্বশুরবাড়িতে সাহসী ও দক্ষ কর্মী স্টেন চাকমাকেও গুলি করে হত্যা করা হয়।

ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এবং জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-এমএন লারমার) পাঁচ নেতাকর্মী খুনের এক মাসের মধ্যে গত ২৮ মে বাঘাইছড়ি উপজেলায় নিহত হন সুনীল চাকমা সনজিৎ (৩০), অটল চাকমা (৩০) ও স্মৃতি চাকমা। নিহতরা ছিলেন প্রসিত বিকাশ খিসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফের সদস্য। ইউপিডিএফর দাবি ছিল, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) ও জেএসএস (এমএন লারমা) এই খুনের সাথে জড়িত।
স্থানীয় সূত্র জানায়, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তিচুক্তির পর এক হাজারের ওপরে নেতাকর্মী নিহত হয়েছে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কেন্দ্র করে।