খাগড়াছড়িখাগড়াছড়ি সংবাদপাহাড়ের সংবাদপ্রবন্ধ ও কবিতাশিরোনামস্লাইড নিউজ

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি গল্প ‘স্মৃতিময় সেই ভয়াল রাত’

                                                ॥ রুপা মল্লিক রুপু ॥  
“চারিদিকে গুলির শব্দ, একটানা অনেকক্ষণ  ধরে চলছিল! মনে হচ্ছিল আজি বোধহয় আমার জীবনের শেষ দিন।” কথা গুলো বলতে বলতেই সজোরে কাঁদছিল সালেহা বানু। আমার শ্রদ্ধেয় দাদীমণি। দাদীর মুখে নানা ধরনের গল্প শুনতে অনেক ভালো লাগে, তাইতো রোজ দাদীর গল্প শোনার বায়না ধরি।
আজ দাদীর জীবনের ভয়ংকর কোন  ইতিহাস জানতে চাইলে তার মনে পড়ে যায় ৭১-এর নরপিশাচ হানাদার বাহিনীদের সেই ভয়াল আক্রমনের চিত্র। সদ্য বিবাহিত ছিলেন দাদী আমার। ঘরে ছিলেন আমার দাদী, দাদাভাই, দাদীর শাশুরী, ননদি তারা ক’জন।
রাত তখন প্রায় ২টা। কিছুটা দূরে জোরে জোরে বুলেটের শব্দ, আশেপাশের লোকজন যে যার মত বাঁচার তাগিদে ছুটছে। কিছু বুঝে উঠার আগেই দরজায় শব্দ, তোমরা পালাও হানাদাররা মেরে ফেলবে। এমন অবস্থায় মানুষের অবস্থা কেমন হতে পারে ভাবতেই গা শিউরে উঠে।
ঘরের পুরুষ বলতে দাদাভাই একাই ছিলেন। তিনি দাদীকে, নিজের মা ও বোনকে, একসাথে ধরে ঘরের ধানের গোলায় ঢুকে পড়লেন। সামনের দরজাটাও একটু ফাকা করে রাখলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বুট জোতার ঠক ঠক শব্দ, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করছে, ‘সালারা সবকি সব ছুপ গেয়া, নেহি ছোরেঙ্গা কিছিকো’ এসব বলছে আর লাথি মেরে ঘরের দরজা ভেঙে দিচ্ছে, কয়েকটা গুলিও ছুড়তে লাগলো ঘরের ভেতর। কিন্তু ভাগ্যিস কেউ ঘরে ঢুকে সার্চ করেনি। কিন্তু একটু পরেই তারা কারো জোড়ে চিতকার শুনলো আর বেশ কটি গুলির শব্দ শুনতে পেল, কিন্তু বাইরে যাবার মত কোন অবস্থা ছিলনা।
এদিকে দাদী আর তার ছোট ননদী ভয়ে কাঁদতে লাগলো, কিন্তু দাদাভাই আর তার মা দুজনের মুখ চেপে ধরে রাখলো যতক্ষণ না শত্রুরা চলে গেল। অনেকটা শ্বাস রুদ্ধকর সময় পার করতে হলো তাদের। কিন্তু, সে রাতে তারা কেউ আর সেই গোলা থেকে বের হলোনা।
পরদিন তারা সবাই নিচে নেমে এলো। বাইরে এসে পাশের বাড়ীর কাছে যেতেই যে দৃশ্য তারা দেখল তা ছিল আরো ভয়ঙ্কর। পাশের বাড়ীর তিন জন সদস্যকে এমন ভাবে নির্যাতন করে এরপর গুলি করেছে যে তাদের চেহারা দেখে আর চেনার উপায় থাকল না।
এভাবেই নিজেদের জীবনকে হাতের মুঠোই নিয়ে যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন তারা। জীবনের এমন সব কঠিন স্মৃতি গুলো আজও তারা করে দাদীমাকে। আজ দাদাভাই নেই কিন্তু দাদাভাইয়ের স্মৃতিগুলো দাদীর মনে সবসময় ছবির মতই ভেসে উঠে।
প্রতিটি বিজয় দিবসে আমার দাদী নিজেই শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধে ফুল দিতে যান পরিবারের সবাইকে সাথে নিয়ে। কারণ দাদী জানেন কত কষ্টের বিনিময়ে এই বিজয় আমরা পেয়েছি।- লেখক: রুপা মল্লিক রুপু