পর্যটনপ্রবন্ধ ও কবিতাবিশেষ প্রতিবেদনশিরোনামস্লাইড নিউজ

স্বপ্নের সাজেক ঘুরে আসতে পারেন আপনিও….

                                                      :: মোবারক হোসেন ::

জীবনে এই প্রথম গেলাম মেঘের রাজ্য অপরুপ সৌন্দর্যের লিলাভূমি সু-উঁচ্চ নান্দনিক সবুজ পাহাড় বেষ্টিত স্বপ্নের সাজেকে। যদিও পাহাড়ের ছেলে। পাহাড় দেখার অভিজ্ঞতা যেমেন আছে-পাহাড়ে হাঁটার অভ্যাসও রয়েছে।

সাজেক যাবো বলে বেশ কয়কবার দিন তারিখ ঠিক করেও কর্মব্যস্ততার কারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রাম সিডিউল থাকায় প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্বেও যাওয়া হয় নি। এবারো অনেকটা কাকতালীয়ভাবে সাজেক সফর। মূলত ২৪/২৫ ফেব্রæয়ারি প্রোগ্রাম ছিল চট্টগ্রামের বহুল প্রচারিত দৈনিক সাঙ্গু পত্রিকার আয়োজনে সমুদ্র সৈকত ক´বাজারে প্রশিক্ষণ ও আনন্দ ভ্রমণ। অনিবার্য কারণে সেই প্রোগ্রাম এক সপ্তাহ পিছিয়েছে। যেহেতু ক´বাজার সফর পরিবর্তন সে জন্যই সাজেক যাওয়া। এখানে বলে রাখি গত এক মাস ধরে আমার মেয়ের মামা ও মামিরাসহ পারিপারিক ভ্রমনে সাজেক যাওয়ার কথা কিন্তু আমি সময় দিতে না পারায় ৩দফা পিছিয়েছে সাজেক যাওয়া। আমি বললাম আমার ক´বাজার যাওয়া আপাদত বাতিল হয়েছে চল সবাই মিলে সাজেক যাই। বললাম সহধর্মীনিকে। কিন্তু মেয়ের মামারা সবাই বছরের হালখাতা নিয়ে ব্যস্ত তাই এ সময় যেতে পারছেন না। কি আর করা আমি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম। বন্ধু মারফকে বললাম মোটরসাইকেল নিয়ে সকাল ৮টায় বাসায় আসতে সাজেক যাবো। যাত্রা করবো খাগড়াছড়ি শহর থেকে।

২৪ ফেব্রæয়ারি বৃহস্পতিবার পেশাগত দায়িত্বের কারণে আমাকে এ দিন খাগড়াছড়িতে অবস্থান করার কথা। ফোন দিলাম এক সহকর্মী সালেহ আহমদ ভাইকে। তাকে বললাম আমি একটু বাহিরে যেতে হচ্ছে আমাকে যেনো সহযোহিতা করে। সকাল ৯টা বাজার আর ২/১মিনিট বাকি। যাত্রা শুরু করে সাড়ে ৯টার মধ্যে দীঘিনালা পৌছলাম। আমার পত্রিকার(পাহাড়ের আলো) দীঘিনালা প্রতিনিধি আল-আমিন এর সাথে দেখা করলাম। মারুফের বন্ধুদের সাথে চা খেয়ে আবার যাত্রা শুরু। সাড়ে ১১টার মধ্যে বাঘাইহাট ক্যম্প অতিক্রম করে অসংখ্য উঁচ-নিচু পাহাড় উঠা-নামা করে প্রায় পৌনে ১টার দিকে সাজেকে পৌছলাম। তবে মোটরসাইকেল ইঞ্জিন ঠান্ডা করেত গিয়ে একটু যাত্রা বিরতি করতে হয়েছে।

সাজেকে কসমেটিক দোকানের মালিক নাজমুল ভাইয়ের সাথে পরিচয় হলো আমার সহযাত্রী বন্ধু মারুফের সুবাধে। সেখান থেকে এক লিটার পানি নিলাম ৩০টাকা দিয়ে। তার কাছ থেকে কিছু তথ্য জানার চেষ্টা করলাম। এতে করে আমাদের পরবর্তি কার্যক্রম সম্পাদন করতে অনেকটা সহজ হয়ে গেলো। মারুফ যেহেতু আগেও গিয়েছে তার অনেক জানা। এর পর চলে গেলাম সোজা সবচেয়ে উচু পাহাড়ের চুড়ায় কংলাকে। আমি যেহেতু ব্যাটমিন্টন খেলি প্রায় সময় হাঁটার অভ্যাস আছে আমার ওঠতে খুব একাট অসুবিধা হলো না। মারুফ’র এই পাহাড়টি ওঠতে একটু কষ্ট হয়েছে। সময়টা দুপুর। নারি পুরুষ, শিশু সহ প্রায় ৫০ থেকে ৬০জন পর্যটকের দেখা মিললো তখন। অনেকেই কেনা-কাটা করছে। জিগ্যেস করাতে কেউ বলল এই প্রথম এসেছি আবার কেউ বলল একাধিকবার এসেছি। রবিউল ইসলাম সরকার ৪০ জনের বহর নিয়ে চুয়াডাঙ্গা থেকে এসেছে। তারা অবশ্য রাত্রীযাপন করবে না চলে যাবেন বান্দরবানে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রচুর পর্যটকরা এখানে এসেছে।

বেলা ১টা ৫৫ মিনিট। দুপুরে ভাত খেলাম সেনি লুসাই রেস্টুরেন্ট এ। দুই বন্ধু সাশ্রই মূল্যেই দুপরের খাবারটা সেরে নিলাম। পরিচয় পেয়ে ডিসকাউন্ট করলো হোটেল মালিক।

একটু জানিয়ে রাখি সাজেক থেকে সকাল ১০টা এবং বিকাল ৩টায় পর্যটকরা একসাথে গাড়ি বহর নিয়ে যাত্রা করার নিয়ম এখানে চালু রয়েছে। অপর দিকে বাঘাইহাট থেকে সকাল সাড়ে ১১টা এবং বিকেল ৩টায় একইভাবে গাড়ি বহর নিয়ে যাত্রা শুরু করে সাজেকের উদ্দেশ্যে। এতে করে নিরাপত্তার ঝুঁকিটা একটু কম থাকে। আমরাও ভাবছি সময় তো আছে ৩টার মধ্যে সাজেক থেকে বের হয়ে বাড়ি ফেরা যাবে। সহকর্মী বন্ধু অবশ্য থাকার ব্যাপারে উৎসাহ দিলো। যাই হোক থাকার উদ্দেশ্যে করে এক বন্ধুর মাধ্যমে হোটেল বুকিং নিলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম শেষে আবার বের হলাম। সোজা পায়ে হেঁটে সাজেকেরে প্রধান আকর্ষন হেলিপ্যাড প্রাঙ্গনে যেখান থেকে সূর্যাস্ত দেখা যায়। আকাশ কোয়াশাচ্ছন্ন থাকায় সূর্যাস্থ সেভাবে অবলোকন করা গেলো না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে সকল কর্টেজ ও রিসোর্টে এর পর্যটকরা বেড়িয়ে এলো রাতের সাজেক দেখার জন্য রাস্তায়। প্রচুর পর্যটকের ভীর জমলো সাজেকের পাহাড়ে। আনন্দ ভ্রমণ। কেই পরিবার নিয়ে এসেছে। স্কুল শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও এসেছে। এসেছে বন্ধুদেও নিয়ে। মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকায় কেউ প্রিয়জনের সাথে, বন্ধুদের সাথে কথা বলছে। আবার কেউ ছবি তুলছে। সেলফিটাও সেরে নিচ্ছে কেউ কেউ। তবে এখানে বলে রাখি জেলার গুরুত্বপূর্ণ নিউজ থাকায় বিকিলের কোনো একটি সময়ে পেশাগত দায়িত্বটাও সেরে নিয়েছি।

এবার রুমে ফেরার পালা। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা হেলিপ্যাড থেকে নীচে আসলাম। অনেকগুলো চায়ের দোকান। বাঁশের তৈরী চায়ের কাপ। অনেকেই মজা করে চা খাচ্ছে। তেঁতুলের চা, দুধের চা, কফি এবং রং চাও আছে। লিত্তি ত্রিপুরা সুন্দর করে চা বানিয়ে দিলো। তবে বাঁশের কাপে নয় আমাদের ইচ্ছাতেই ওয়ান টাইম গøাসে দিলো দুধ চা। এবার তাঁর সাথে আড্ডা দিচ্ছি। ভীর কম থাকায় তার পারিবারিক অনেক বিষয় শেয়ার করলাম। তার দু:খ সে বেশি বেঁচতে পারে না। অনেকটা সহজ, সরল ও দয়ালু মনে হলো। আমাদের চায়ের প্রকৃত মূল্য থেকে কিছুটা কম নিলো। তেঁতুলের চা দাম বেশি ৪০টাকা। বিক্রি করতে না পারলে নিজে খেয়ে ফেলে এবং পাশের একজন মুসলিম দোকানদার আছে তাকেও বিনামূল্যে চা খাওয়ান। প্রতিদিন এক রকম বেঁচা-বিক্রি হয় না। তবে পরিবারাও আরো একটি চায়ের দোকান চালায়। এই দোকান দিয়েই তার পরিবারের খরচ চলে।

সন্ধা গড়িয়ে রাত হলো। বলছিলাম রুমে ফিরবো কিন্তু না। আবারো সেই রেস্টুরেন্টএ। মালিক জহিরুল ইসলাম ভাই। পরিচয়টা আর একটু গভির হলো। স্থানীয় সাংবাদিক জুয়েল ভাইকে সে চেনে। তাই ফোন দেয়ার সাথে সাথেই জুয়েল ভাই এসে হাজির। গুইমারা একটি প্রোগ্রামে প্রথম দেখা হয়েছিল এই জুয়েল ভাইয়ের সাথে। সম্ভবত সে ১০ বছর আগের কথা। এরি মধ্য পরিচয় হলো সিএনজি চালক সোহান ভাইয়ের সাথে। তার মধ্যমে পরিচয় হলো আরো একজন রিসোর্ট এর মালিক জামাল ভাইয়ের সাথে। এর পর রুমে আসা। এর আগে রাতের খাবার হিসেবে পরোটা আর বারবিকিউ। প্রথম পরিচয়ে সম্পর্ক মালিক বিল নিলেন না। আবার সকালে নাস্তার দাওয়াত দিয়ে দিলেন।

রাতে রুমে ফেরা হলো। বেলকনিতে বসে বাহিরের দৃশ্য দেখছি। অনেক পর্যটক রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে যার যার গন্তব্যে। কয়েজন ছেলেকে দেখলাম নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে। সহজেই বুঝে নিলাম খাওয়া একটু বেশি হয়েছে, তাই মাতলামী করছে। কিছুক্ষণ পর চলে গেলো।

২৫ ফেব্রæয়ারি সকাল ৮টা নাস্তা সেরে এবারের উদ্দেশ্যে খা¯্রাং রিসোর্ট এর উদ্দেশ্যে। খা¯্রাং রিসোর্ট আসলে দেখার মত একটি জায়গা। খা¯্রাং বিনোদন-এটা ত্রিপুরা ভাষা। হরেক রকম ফুল। মন ভরে যায়। শুক্রবার জুমা’র দিন। তাই আর দেরি না করে দীঘিনালার উদ্দেশ্যে যাত্রা। সুস্থ্য ও নিরাপদে বাড়িতে ফেরা হলো। মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া-আলহামদুলিল্লাহ। সাজেক সফর সফল করতে যে যেভাবে সহযোগিতা করেছেন, সবার কাছে কৃতজ্ঞ। স্বপ্নের সাজেক। আবারো আসছি…। আপনিও যেতে পারেন স্বপ্নের এই সাজেক ভ্রমণে। তবে দক্ষ চালক, ত্রæটিমুক্ত যানবাহন ছাড়া যাত্রা করবেন না। আর একটা কথা মনে রাখতে হবে আঁকা-বাঁকা পথ, উচুঁ-নিচু পাহাড়। আপনার যানবাহন অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রেকে গতি কমিয়ে রাখুন। সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি।

উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনটি লেখার স্বার্থে ব্যক্তিগত কারণে বেশ কিছু স্থানে ছদ্দ নাম ব্যবহার করা হয়েছে। কখনো যদি এই লেখাটা কারো নজরে পরে তাহলে মনে কষ্ট নেবেন না। সাজেক ভ্রমণের স্মৃতির পাতা থেকে আংশিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরলাম। সময় স্বল্পতা ও নানা কারণে লেখাটি ভাষা সমৃদ্ধ করতে পারিনি। অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়ত বানানের ভুল থাকতে পারে। ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। -আল্লাহ হাফেজ। লেখক:  মো: মোবারক হোসেন,সংবাদকর্মী।