খাগড়াছড়ি আসনে কড়া নিরাপত্তায় ভোটের প্রস্তুতি, ১২১ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত

শেয়ার করুন

খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক,খাগড়াছড়ি: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়িতে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনের ২০৩টি ভোটকেন্দ্রে নির্বাচনী সরঞ্জাম পাঠানো শুরু হয়েছে। বুধবার সকাল থেকে জেলার ৯টি উপজেলা ও ৩টি পৌরসভার কেন্দ্রে পর্যায়ক্রমে সরঞ্জাম সরবরাহ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুর্গম তিনটি কেন্দ্রে হেলিকপ্টারযোগে সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, খাগড়াছড়ি জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১১৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮০ হাজার ২০৬ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৭৩ হাজার ৯০৪ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৪ জন। পুরুষ ও নারী ভোটারের ব্যবধান খুবই সামান্য—যা এবারের নির্বাচনে নারী ভোটারদের গুরুত্ব বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এ আসনে মোট ১১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে তিনজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। নির্বাচনী মাঠে প্রচার-প্রচারণা শেষে এখন সবার দৃষ্টি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের দিকে।

দুর্গম পাহাড়ে হেলিকপ্টারযোগে সরঞ্জাম: ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও দুর্গমতার কারণে খাগড়াছড়ির কিছু ভোটকেন্দ্রে সরঞ্জাম পৌঁছানো সবসময়ই বড় চ্যালেঞ্জ। এ বাস্তবতায় দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের নাড়াইছড়ি কেন্দ্র এবং লক্ষীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ও ফুত্যাছড়ি এলাকার দুটি কেন্দ্রে হেলিকপ্টারযোগে নির্বাচনী সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট জনবল পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এস এম শাহাদাত হোসেন জানান, “দুর্গম এলাকাগুলোতে আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে সময়মতো ও নিরাপদে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করা যায়। ১২১ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ, নিরাপত্তায় বহুস্তরীয় ব্যবস্থা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১২১টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর মধ্যে ৬৮টি কেন্দ্রকে ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নির্বাচনকে ঘিরে সোমবার বিকেল থেকে জেলার গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে যৌথ টহল ও মহড়া শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনীর সদর রিজিয়ন থেকে বের হওয়া টহল দল জেলার প্রধান সড়কগুলোতে মহড়া দেয়। তাদের সঙ্গে বিজিবি ও র‌্যাব সদস্যরাও অংশ নেন। প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এ টহল কার্যক্রম সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি জোরদার করেছে। নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলায় মোতায়েন থাকছেন,২ হাজার ৬৩৯ জন আনসার ও ভিডিপি সদস্য ১ হাজার ২৫০ জন পুলিশ সদস্য ৩০ প্লাটুন বিজিবি, র‌্যাবের একাধিক টহল দল: সেনাবাহিনীর মোবাইল টিম। প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে গড়ে ১৩ জন আনসার সদস্য ও ৩ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি ও র‌্যাবের টহল থাকবে। ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশ ইনচার্জদের কাছে বডিওর্ন ক্যামেরা সার্বক্ষণিক চালু থাকবে।

২০৩ কেন্দ্রে ১,০৮৫ ভোটকক্ষ: খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসন ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত। এ আসনে রয়েছে খাগড়াছড়ি সদর, মাটিরাঙ্গা, পানছড়ি, দীঘিনালা, গুইমারা, লক্ষীছড়ি, মহালছড়ি, রামগড় ও মানিকছড়ি,মোট ৯টি উপজেলা। এছাড়া রয়েছে ৩টি পৌরসভা ও ৩৮টি ইউনিয়ন।এই বিস্তীর্ণ এলাকায় মোট ২০৩টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ১,০২০টি স্থায়ী ভোটকক্ষ এবং ৬৫টি অস্থায়ী ভোটকক্ষ রয়েছে,মোট ১,০৮৫টি ভোটকক্ষ। নির্বাচনী দায়িত্বে থাকছেন ২০৩ জন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, ১ হাজার ১০০ জন সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা এবং ২ হাজার ২২০ জন পোলিং কর্মকর্তা।

সিসিটিভির আওতায় ১৫৫ কেন্দ্র: জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এস এম শাহাদাত হোসেন জানান, “এবারের নির্বাচনে ২০৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৫৫টিতে সিসিটিভি স্থাপন নিশ্চিত করা হয়েছে। বাকি কেন্দ্রগুলোতেও কার্যক্রম চলমান রয়েছে।”
তিনি আরও জানান, দুইজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সার্বিক তদারকিতে থাকবেন। জেলার প্রত্যেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে ভোটকেন্দ্রগুলোতে নির্বাচনী সরঞ্জাম হস্তান্তর সম্পন্ন হয়েছে। তরুণ ও নারী ভোটারদের দিকে নজর: এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ ও নতুন ভোটার রয়েছেন, যারা ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচনী প্রচারণায় প্রার্থীদের তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা ছিল চোখে পড়ার মতো। একই সঙ্গে নারী ভোটারের সংখ্যা প্রায় পুরুষ ভোটারের সমান হওয়ায় তাদের ভোট আচরণও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রত্যাশা শান্তিপূর্ণ ভোটের: পাহাড়ের দুর্গমতা, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা এবং ভৌগোলিক বিস্তৃতি,সবকিছু মিলিয়ে খাগড়াছড়ি-২৯৮ আসনের নির্বাচন পরিচালনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে প্রশাসনের দাবি, সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রযুক্তির ব্যবহার সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করবে। এখন সময়ের অপেক্ষা কড়া নিরাপত্তার এই প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে পাহাড়ের মানুষ কেমন রায় দেন, সেটিই দেখার বিষয়।