চরম বৈষম্য পার্বত্য উপদেষ্টার বরাদ্দ: এমন বিভাজন কাম্য ছিলো না

মোবারক হোসেন: মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ উল ফিতর এবং পাহাড়ে আসন্ন বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু (বৈসাবি) কে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক যতটা না সরগরম তার চেয়ে বেশি সরগরম পার্বত্য উপদেষ্টার আপদকালীন বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা। গত কয়েকদিন যাবত নিশ্চই সাধারণ মানুষ দেখেছে পাহাড়ের অনলাইন মিডিয়া ও জাতীয় অনলাইন ও পত্রিকায় স্থান পেয়েছে পার্বত্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রেরিত উপদেষ্টার প্রকল্প বরাদ্দ ও প্রকল্প বন্টনের চরম বৈষম্য বিষয় নিয়ে। প্রকল্প তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় চলতি বছর ১৯ জানুয়ারি ১ম বরাদ্দ দেয়া হয় ৭শ ৫১ মে: টন চাল। এই বরাদ্দে চাকমা ৪৬০ মে: টন, মারমা ৯২ মে: টন, ত্রিপুরা ৬৬ মে: টন এবং বাঙ্গালি ১৩৩ মে: টন। ২৫ মার্চ ২য় বরাদ্দে ৩ কোটি ১২লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে চাকমা ২ কোটি ৩২লাখ ৬০ হাজার টাকা, মারমা ২১লাখ ৭০ হাজার, ত্রিপুরা ৯লাখ ৮০ হাজার এবং বাঙ্গালি ৪৭লাখ ১০হাজার এর মধ্যে হিন্দুদের জন্য দেয়া হয় ১লাখ ৩০হাজার টাকা। ২৭ মার্চ ৩য় সবশেষ বরাদ্দে ১হাজার ৮১৩ মে: টন চাল এর মধ্যে ১হাজার ৮১৩ মে: টন পেয়েছেন চাকমারা, মারমা ২০ মে. টন, মুসলিম বাঙ্গালি ৮০ মে. টন বরাদ্দ দিলেও ত্রিপুরা, হিন্দু, সাঁওতাল ও বড়–য়াদের কোনো বরাদ্দ না দিয়ে বঞ্চিত করা হয়েছে। এছাড়াও এই তালিকায় নাম নেই ল²ীছড়ি উপজেলার বাঙ্গালি জনগোষ্টির একজনেরও। পার্বত্য উপদেষ্টার এমন বরাদ্দ নিয়ে চলছে বিতর্ক। প্রতিবাদ, বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ চলছে। পার্বত্য উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার কুশপত্তলিকা দাহ করা হয়েছে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলা শহরে। এ অসম বন্টন তালিকা বাতিল করা না হলে বৃহত্তর আন্দোলনে নামার হুশিয়ারি দিয়েছে আন্দোলনরত বিক্ষুব্দ জনতা। সমালোচনার ঝড় বইছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তুমুল সমালোচনা এবং জাতিগত বিভাজনের ষড়যন্ত্র অংশ হিসেবেই মনে করছেন বৈষম্যের শিকার বঞ্চিত জনগোষ্টিরা।
চাথোয়াই প্রæ চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এভাবেই বলেন, আমি লিখতে চাইনি যখন দেখলাম চাকমা বনাম মারমা ত্রিপুরা জাতিগত ঐক্য বিনষ্টের দিকে এগোচ্ছে আমার মনে হয় কিছু লেখা দরকার। খাগড়াছড়িতে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বাঙালি বসবাস। বৈষম্যের বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার বিদায় নিতে হয়েছে। নতুন বাংলাদেশ শুরু হয়েছে প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়েছে। পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের জনগণ পাহাড়ের জনগন “বৈষম্যের” শব্দের আশায় নতুন দিগন্তের অপেক্ষায়-সে মুহূর্তে খাগড়াছড়িতে সরকারি সকল অনুদান ও প্রকল্প তালিকাতে চাকমা সম্প্রদায়ের নামে প্রকল্প বরাদ্দ দেখা যায় তখনই মারমা, ত্রিপুরা সম্প্রদায় প্রতিনিধিরা নিয়মিত প্রতিবাদ জানাতে থাকে। বৈষম্য একটা সীমা থাকে কিন্তু সে বৈষম্য যদি ভয়াবহ হয় তখন জনগণ অবশ্যই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাবেই। কিছুদিন আগে পার্বত্য মন্ত্রণালয় থেকে ৭৫১ মে: টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে খাগড়াছড়িতে যা বাজার মুল্য ৩কোটি টাকার বেশি সকল প্রকল্প তালিকাতে চাকমাদের নাম। গত কয়েকদিন আগে আপতকালিন অনুদান পাঠানো হয়েছে ৩ কোটি ১২ লক্ষ টাকা সেখানেও মাত্র ১২ লাখ টাকা মারমাদের বাকী ৩ কোটি চাকমাদের। এরপর ১হাজার ৯১৩ মে: টন চাল বরাদ্দ পাঠানো হয় যা বাজার মুল্য ৮কোটি টাকা বেশি। সেখানেও একজন মারমা পেয়েছে মাত্র ১০ টন। জনগন তো বর্তমানে অবুঝ নয়-বৈষম্য একটা লিমিট থাকতে হয় সে বৈষম্য যদি চরম ভয়াবহ হয় প্রতিবাদ হবেই। পার্বত্য মন্ত্রণালয় হলো উন্নয়নের প্রতিষ্ঠান সে প্রতিষ্ঠান যদি এক জাতিকে উন্নয়ন করেন জনগন তো কথা বলবেই। প্রতিবাদ করতে গেলে চাকমা বিরোধী হয় সেটা আর বলার ভাষা নেই।
খুকু ত্রিপুরা নামে একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেন, ত্রিপুরা মারমা অনেক খেয়েছে আর না, এই উক্তিটির বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ তাহলে শুরু হলো’’ পার্বত্য উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা দায়িত্ব পাওয়ার পর এক অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।
বিনোদন ত্রিপুরা নামে এক উন্নয়ন কর্মী লিখেন, কোন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এই তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে জাতির নিকট উন্মুক্ত করুন পার্বত্য উপদেষ্টা মহোদয়। আরেকজন লিখেন, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে ২৪ এর জুলাই আন্দোলনের প্রতি চরম অসম্মান দেখিয়েছেন পার্বত্য উপদেষ্টা। নিজ জেলা খাগড়াছড়িতে ৩কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, রাঙামাটিতে ১ কোটি ২২ লাখ টাকা ও বান্দরবানে ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। খাগড়াছড়িতে পার্বত্য উপদেষ্টার বাড়ি। আত্মীয় স্বজনে ভরা। তাই বিঝু উদযাপনে মনখোলে বরাদ্দ দিয়েছেন। এখানে কি অন্য দুই জেলার সাথে বৈষম্য করা হয়নি?
আবুল কাশেম নামে এক ব্যক্তি লিখেন, খাদ্যশস্যের তালিকায় ৫৮জনের মধ্য মাত্র ৫জন বাঙালি, আর বাকী সবই একটি সম্প্রদায়ের। অপরদিকে, অর্থ বরাদ্দের তালিকায় রয়েছে স্বজনপ্রীতি, অনৈতিকভাবে প্রকল্প গ্রহণ এবং বৈষম্যমূলক। এভাবে চলতে থাকলে জনমনের আস্থা অর্জন করে নেবে পরিকল্পনাকারীরা। এ প্রসঙ্গে সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অংগপ্রæ মারমা বলেন, বরাদ্দে চরম বৈষম্য করা হয়েছে। বাঙ্গালিদের পাশাপাশি মারমাদেরও বঞ্চিত করা হয়েছে। ল²ীছড়ি উপজেলা উল্লেখ্যযোগ্য বিশাল জনগোষ্টি রয়েছে মারমা। তাদের বাদ দিয়ে এমন একটি বরাদ্দ তালিকা মেনে য়ো যায় না। এই প্রকল্প বাতিলের দাবি জানান তিনি।
গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা মো. সামশুল ইসলাম বলেন, পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ দেখে বাঙ্গালিরা হতাশ। আপদকালীন প্রকল্পে দেয়া বরাদ্দে নয়-ছয় করা হয়েছে। পার্বত্য উপদেষ্টার বরাদ্দে বঞ্চিত হয়েছে মারমা, ত্রিপুরা ও বাঙ্গালিরা। সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছে ল²ীছড়ি উপজেলার বাঙ্গালীরা। ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের নামে-বেনামে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে ল²ীছড়িতে ২৯টি প্রকল্প দেয়া হলেও একটি প্রকল্পও বাঙ্গালীর নাম নেই। অধিকাংশ প্রকল্পই একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে। বঞ্চিত হয়েছে এখানকার মারমা জনগোষ্টিও। ল²ীছড়িতে জনসংখ্যার বড় একটি অংশ বাঙ্গালি কিন্তু কোনো বরাদ্দ রাখা হয় নি। যা অত্যন্ত দু:খজনক। এই তালিকায় শুধু বাঙ্গালি নয় এখানকার মারমা ও ত্রিপুরাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। আমরা এই বরাদ্দ বাতিলের দাবি জানাচ্ছি। এ বরাদ্দ তালিকা বাতিল করা না হলে সাধারণ মানুষকে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে জানান তিনি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলনের খাগড়াছড়ি শাখার সাধারণ সম্পাদক মো. আসাদ উল্লাহ জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যায় পাহাড়ি-বাঙালি উভয় সম্প্রদায়কে সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয় সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সার্বিক উন্নয়ন, চিকিৎসা ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে যে বরাদ্দ দিয়েছে তাতে আমরা দেখলাম পাহাড়ীদের মধ্যে চাকমা সম্প্রদায় বেশী বরাদ্দ পেয়েছে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মিলে বাঙালী মাত্র ৩৮টি প্রকল্প পেয়েছে। পার্বত্য উপদেষ্টার অসৌজন্যমূলক আচরণ, অনিয়ম নিয়ে পাহাড়ে বহুবার আন্দোলন হয়েছে। এ বৈষম্যের বিরুদ্ধে আমরা আবারও আন্দোলনে নামবো।
উল্লেখ্য গত ২৫ মার্চ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়-১ শাখার উপ-সচিব মোহাম্মদ নাহিদ ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে, খাগড়াছড়ির ১’শ ৮৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাঝে ৩ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এছাড়াও ২৭ মার্চ ৫৮টি প্রকল্পের মাধ্যমে ১হাজার ৯১৩ মে: টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ করা হয়।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের অনুকূলে সহিসংতায় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সদস্যদের সার্বিক উন্নয়ন, চিকিৎসা ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে এ বরাদ্দ উল্লেখ করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে। পৃথক ২টি তালিকা বিশ্লেষণে প্রকল্পের অধিকাংশ ভুয়া প্রতিষ্ঠান, একই ব্যক্তি ও পরিবারকে একাধিক বরাদ্দ, স্বজনপ্রীতি, জেলা পরিষদ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দের চিত্র উঠে এসেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি তিন পার্বত্য জেলায় খাদ্যশস্য ও প্রকল্প বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগে প্রতিবাদ জানিয়ে উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমার কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়। একই সঙ্গে বৈষম্যমূলক এই বরাদ্দ বাতিল করা না হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে এই উপদেষ্টাকে প্রতিহতের ঘোষণাও দেওয়া হয়। বৈষম্যমূলক এই বরাদ্দ তালিকা বাতিলের দাবিতে ইতিমধ্যেই খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে বিক্ষোভ মিছিল ও কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছে।