খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক: ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি পাহাড়ের ঢালে। কুয়াশার নরম আবরণ সরতে না সরতেই চেঙ্গী নদীর তীরে জড়ো হতে থাকেন শত শত ত্রিপুরা নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী ও শিশুরা। কারও হাতে রঙিন ফুল, কারও হাতে জ্বালানো প্রদীপ, আবার ছোট্ট শিশুদের হাতে নিজেদের বোনা নতুন রিনাই-রিসা। একসময় নদীর জলে ভাসতে থাকে ফুল আর নতুন কাপড়—প্রকৃতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এভাবেই খাগড়াছড়িতে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসুর সূচনা হলো ‘হারি বৈসু’র মধ্য দিয়ে।
ত্রিপুরাদের এই প্রাচীন আচারটির পূর্ণ নাম “তৈবুকমা-অ-খুম বকনাই বাই রি কাতাল কাসক-রনাই”, যার অর্থ মা গঙ্গার প্রতি পুষ্প অর্পণ এবং নতুন বস্ত্র নিবেদন। সংক্ষেপে ‘হারি বৈসু’ নামে পরিচিত এই দিনটি মূলত বৈসু উৎসবের প্রথম দিন এবং সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সূচনা পর্ব।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকাল থেকে খাগড়াছড়ির পল্টনজয় পাড়াস্থ চেঙ্গী নদী, খাগড়াপুরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষ গঙ্গাদেবীর প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রদীপ জ্বালিয়ে এবং শিশুদের হাতে বোনা ঐতিহ্যবাহী নতুন রিনাই, রিসা (থামি-খাদি) নদীতে ভাসিয়ে ‘হারি বৈসু’ উদযাপন করেন তারা।
বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে ‘হারি বৈসু’র উদ্বোধন করেন জেলা বিএনপির প্রধান উপদেষ্টার সহধর্মিণী জাকিয়া জিনাত বিথী। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা।
পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, “বৈসু আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মূলভিত্তি। এই উৎসব নতুন প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করে এবং আমাদের অস্তিত্বকে শক্তিশালী করে।”
জাকিয়া জিনাত বিথী বলেন, “ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের এই উৎসব শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি সম্প্রীতি ও সৌন্দর্যের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।”
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের সদস্য ধনেশ্বর ত্রিপুরা, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম এন আবছার এবং বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শুভ্রদেব ত্রিপুরা সাইমন।
ধনেশ্বর ত্রিপুরা বলেন,
“হারি বৈসু আমাদের পূর্বপুরুষদের থেকে পাওয়া অমূল্য ঐতিহ্য। এটি আমাদের সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।”
এম এন আবছার বলেন, “এ ধরনের উৎসব আমাদের পারস্পরিক সম্প্রীতির বন্ধনকে শক্তিশালী করে এবং সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসে।”
অ্যাডভোকেট শুভ্রদেব ত্রিপুরা সাইমন বলেন, “আমরা চাই নতুন প্রজন্ম এই ঐতিহ্যকে ধারণ করুক এবং বিশ্ব দরবারে তুলে ধরুক।”
হারি বৈসুর দিনটি শুরু হয় ভোরবেলায় ফুল সংগ্রহের মধ্য দিয়ে। তরুণ-তরুণীদের মাঝে চলে ফুল তোলার আনন্দঘন প্রতিযোগিতা। সেই ফুল দিয়ে ঘরবাড়ি সাজানো হয় এবং একাংশ দিয়ে নদীর তীর, মন্দির ও পবিত্র স্থানে ধূপ-দীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা করা হয়।
ত্রিপুরা তরুণী প্রথমা ত্রিপুরা বলেন, “এই দিনটি আমাদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলোর একটি। সবাই মিলে ফুল তোলা আর নদীতে ভাসানো—এ যেন এক অন্যরকম অনুভূতি।”
টিনা ত্রিপুরা পিকাই বলেন, “আমরা নিজের হাতে তৈরি কাপড় নদীতে ভাসাই। এতে আমাদের বিশ্বাস, নতুন বছর আমাদের জন্য শুভ হবে।” উৎসবের আমেজে যুক্ত হয়েছে আরও অনেক তরুণ-তরুণীর প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ।
লাইফশ্রী ত্রিপুরা বলেন, “বৈসু আমাদের হৃদয়ের উৎসব। এই দিনে আমরা প্রকৃতির কাছে ফিরে যাই, নিজের সংস্কৃতিকে নতুন করে অনুভব করি।”
ঐশীতা ত্রিপুরা বলেন, “হারি বৈসু শুধু আনন্দ নয়, এটি আমাদের আধ্যাত্মিকতারও একটি বড় অংশ। প্রার্থনার মাধ্যমে আমরা নতুন বছরের জন্য আশীর্বাদ কামনা করি।”
ঐশ্বরিক ত্রিপুরা মিম বলেন,“প্রতি বছরের মতো এবারও আমরা হারি বৈসুতে নদীতে ফুল দিয়ে প্রার্থনা করেছি। পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে সব দুঃখ-গ্লানি ভুলে নতুন বছরে নতুনভাবে জীবন শুরু করার প্রত্যাশা নিয়েই আমরা ফুল অর্পণ করি এবং নতুন কাপড় ভাসাই। সবার জীবনে শান্তি ও মঙ্গল বয়ে আসুক—এই কামনায় সবাইকে বৈসুর শুভেচ্ছা।”
সাধন ত্রিপুরা বলেন,“ছোটবেলা থেকে এই উৎসব দেখে বড় হয়েছি। এখন নিজেরাও অংশ নিয়ে বুঝতে পারছি, এটি আমাদের পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”
ভ্যালেন্টিনা ত্রিপুরা বলেন, “নদীতে ফুল আর কাপড় ভাসানোর মুহূর্তটি সত্যিই আবেগঘন। মনে হয় যেন আমরা প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাচ্ছি।”
ডজি ত্রিপুরা বলেন, “এই উৎসব আমাদের একত্রিত করে। সবাই মিলে আনন্দ ভাগাভাগি করার মধ্যে যে আনন্দ, তা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।” দিনভর আচার-অনুষ্ঠানের পর বিকেলে শুরু হয় নাচ-গান। ত্রিপুরা তরুণ-তরুণীরা গরয়া নৃত্যের তালে তালে উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। হাসি-আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।
উল্লেখ্য, ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান এই বৈসু উৎসব তিন দিনব্যাপী উদযাপিত হয়। প্রথম দিন ‘হারি বৈসু’, দ্বিতীয় দিন ‘বৈসুমা’—যেখানে খাদ্য উৎসব ও ‘গন্তক’ রান্নার আয়োজন থাকে, এবং তৃতীয় দিন ‘বিসিকাতাল’—যেদিন নতুন বছরকে বরণ করা হয় এবং বড়দের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেওয়া হয়।
এ সময় ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা—সুকুই (গিলা), ওয়াকরাই, চপ্রিং, কাংটি ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয় এবং গরয়া নৃত্যের মাধ্যমে ফুটে ওঠে তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রাণবন্ত রূপ। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে “কমা বতই” নামে পবিত্র পানি ছিটিয়েও মঙ্গল কামনা করা হয়।
সব মিলিয়ে, পাহাড়জুড়ে শুরু হওয়া বৈসু উৎসব যেন নতুন বছরের আনন্দ, সম্প্রীতি ও মঙ্গলের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে সর্বত্র। ফুল, প্রার্থনা আর ঐতিহ্যের এই মিলনমেলা ‘হারি বৈসু’কে করে তুলেছে পাহাড়ের সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতীক।