খাগড়াছড়িখাগড়াছড়ি সংবাদগুইমারাপাহাড়ের সংবাদশিরোনামস্লাইড নিউজ

বিজু এলো বলে: বৈসাবি উৎসবে বর্নিল গুইমারা’র পাহাড়ি জনপথ

স্টাফ রিপোর্টার: হাতে মাত্র ক’টা দিন। নিজে ও স্ত্রী, নাতী-নাতনীদের নতুন বছরের পোষাক ও যাবতীয় জিনিস পত্র কিনতে শেষ পর্যন্ত গরু বাছুর বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়ে খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা বাজারের গরু হাটে ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ। স্ত্রী সংগ মালা চাকমার আপত্তি থাকা সত্ত্বেও গৃহ পালিত পশু বিক্রি করাতে মন খারাপ সংগ মালা চাকমা’র। তারপরও বিজু বলে কথা। বছরের এদিনে নতুন পোষাক আনন্দ আয়োজন থাকবে না তা কি করে সম্ভব? কথা হচ্ছিল খাগড়াছড়ি’র গুইমারা উপজেলার দূর্গম মোহন্যা কারবারীপাড়া’র বাসিন্দা শরৎ মোহন চাকমার সাথে।

গরু বিক্রির টাকায় স্ত্রী সংগ মালা চাকমা, দুই নাতী-নাতনী ও নিজের জন্য কিনেছে সাধ্যমত নতুন পোষাক, সাথে অতিথি আপ্যায়নের সামগ্রী। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে ফেরার পথে তিনি জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙ্গালীদের পাশাপাশি বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর বর্ষ বরণের কথা। তবে বর্তমানে নববর্ষ পালনে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছে নতুন মাত্রা স্বীকার করে তিনি জানান, পয়লা বৈশাখ বা বাংলার নববর্ষ পালনে চাকমা সম্প্রদায়ের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি ও আচার অনুষ্ঠান। বিজু নামে পরিচিত নববর্ষের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে প্রতিবছর ১২এপ্রিল অর্থাৎ পুরাতন বছরের শেষ দুইদিনে চাকমা সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণীরা সূর্যোদয়ের সাথে সাথে ঐতিহ্যবাহী পোষাক পরে স্থানীয় ছড়া কিংবা নদীতে জলদেবতার উদ্দেশ্যে ফুল ভাঁসিয়ে শুরু করে বিজু উৎসব। এসময় পাড়ায় পাড়ায় ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার পাশাপাশি অতিথি আপ্যায়নের ব্যবস্থা।

ত্রিপুরা সম্প্রদায় হিন্দু ধর্মের অনুসারী হলেও উৎসব পার্বণে রয়েছে ভিন্নতা। তারা নববর্ষ পালন করে বৈজুক নামে। গরিয়া দেবতার পূজার মাধ্যমে শুরু হয় ত্রিপুরাদের বৈসু উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। পাড়ায় পাড়ায় গরিয়াদের আগমনে ত্রিপুরা পল্লীগুলোতে চলে বৈসুর আমেজ। পিনন-খাদি ও ধুঁতি পড়ে ঢোল আর বাঁশি বাজিয়ে নানা মুদ্রায় নৃত্য করে গরিয়া দেবতার প্রার্থনা করা হয়। এছাড়া নানা প্রকার সব্জির পাঁচন(বিশেষভাবে তৈরী এক প্রকার খাবার), নানা রকম পিঠা-পুলি এবং মিষ্টান্ন তৈরী করা হয় এই উৎসবে।

চাকমা ও ত্রিপুরাদের মতো মারমাদেরও রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। বাংলা নববর্ষের একদিন পরে মঘাব্দ শুরু হওয়ায় ১৫এপ্রিল থেকে শুরু হয় মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাইং উৎসব। ঐতিহ্যবাহী পোষাক আর বর্ণিল সাজে এ দিন মারমা তরুনীরা-তরুনদের সাথে জলকেলী উৎসবে মেতে ওঠে। একে অন্যকে পানি ছিটিয়ে, নেচে গেয়ে পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানায় তারা। পাহাড়ের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা, প্রধান তিন সম্প্রদায়ের নিজ নিজ উৎসবের নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে প্রাণের এ উৎসবকে  বলা হয় বৈসাবি”। এ নামটি পার্বত্য চট্টগ্রামে বহুল পরিচিত ও আলোচিত। মুলত চৈত্রের শেষ দু’দিন ও বৈশাখের প্রথমটিকে ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজ করতে অন্য রকম আবহ। যে দিনটির অপেক্ষায় থাকে পাহাড়ের মানুষ পুরোটা বছর।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য স্থানের মত গুইমারা উপজেলা শুরু হয়েছে উৎসবের আমেজ। ইতিমধ্যে বৈসাবি উৎসবকে নিয়ে দেওয়ানপাড়া, আমতলীপাড়া, সাইংগুলিপাড়া, বটতলাপাড়া, হেডম্যানপাড়া সহ বিভিন্ন পাড়ায় মহল্লায় শুরু হয়েছে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া প্রতিযোগীতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ধ’ আহলারে, পেং সহ মারমাদের নানা ক্রীড়া প্রতিযোগীতার সাথে চলছে বৌদ্ধ মুর্তি ¯œ্যান করানো, কেনাকাটা নানা আয়োজন।

খাগড়াছড়ি জেলা সদরের পরেই সব চেয়ে জাঁকজমকভাবে গুইমারাতে পালিত হয় বৈসাবি উৎসব। প্রতিবছর গুইমারা সাংগ্রাইং উদযাপন কমিটি আয়োজন করে থাকে বর্নাঢ্য র‌্যালী। বরাবরের মত খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী র‌্যালিতে নেতৃত্ব দেবেন বলে জানিয়েছে গুইমারা সাংগ্রাইং উদযাপন কমিটির সভাপতি সাহলাপ্রু মারমা। এছাড়াও গুইমারা উপজেলা প্রশাসন দিবসটি পালনে গ্রহণ করেছে নানা আয়োজন। ১৪এপ্রিল গুইমারা রিজিয়ন মাঠে ৩দিনব্যাপী বৈশাখী মেলার পাশাপাশি সেনাবাহিনীর উদ্যোগে পয়লা বৈশাখে বর্নিল আনন্দ র‌্যালি বের করা হবে বলে জানিয়েছে গুইমারা রিজিয়নের জিটুআই মেজর আশিকুর রহমান। গুইমারা রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ কামরুজ্জামান আনন্দ র‌্যালিতে অংশগ্রহণ শেষে মেলার উদ্ধোধন করবেন বলে নিশ্চিত করেন তিনি।

১১এপ্রিল সকালে বৈসাবি উৎসবকে নিয়ে গুইমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পঙ্কজ বড়–য়ার সভাপতিত্বে গুইমারা উপজেলা প্রশাসন উদ্যোগে এক আইন-শৃংখলা সভা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অস্থায়ী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। বৈসাবি অনুষ্ঠানকে ঘিরে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানোর জন্য বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়।

চৈত্রের শেষ দুদিন এবং পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষকে ভিন্নরুপে উদযাপন করে পার্বত্যাঞ্চলের মানুষ। বাংলা বর্ষ বিদায় ও বরণের মহান উৎসবে, মারমা, ত্রিপুরা ছাড়াও, তংচঙ্গাদের বিষু, ম্রো সম্প্রদায়ের “ক্লবং পাই” সাওতালদের পাতাবাহা উৎসবকে সামনে রেখে এখন মুখরিত গুইমারার প্রতিটি পাড়া মহল্লা।