খাগড়াছড়িখাগড়াছড়ি সংবাদদীঘিনালাপাহাড়ের সংবাদমাটিরাঙ্গাশিরোনামস্লাইড নিউজ

ভুয়া নামে ঋণ বিতরণ করে মৃত দেখিয়ে খাগড়াছড়িতে আনন্দ এনজিও’র বিরুদ্ধে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদক: নাম-ঠিকানা ও পরিচয়হীন ব্যক্তিদের নামে প্রথমে প্রায় ১৭ লক্ষ টাকা ঋণ বিতরণ, অতপর: জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে মৃত সনদপত্র তৈরি করে তাদেরকে (ঋণ গ্রহিতাদের বা তাদের অভিভাবকদের) মৃত দেখিয়ে প্রায় ৯ লক্ষ ঋণের টাকা মওকুপ করার অভিযোগ উঠেছে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ”আনন্দ” এনজিওি’র বিরুদ্ধে।

আনন্দ এনজিওর কতিপয় কর্মকর্তা নিজেরাই পৌরসভার কাউন্সিলর ও ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারদের নামে সীল বানিয়ে, জনপ্রতিনিধিদের নাম জাল স্বাক্ষর করে, ঋন গ্রহিতা বা তাদের স্বামী বা তাদের অভিভাবকদের মৃত সনদ সংযুক্ত করে এসব প্রতারণা করেছে উল্লেখ করে সংস্থাটির বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা। তবে এসব প্রক্রিয়ায় নিয়মের ব্যাতয় হয়েছে স্বীকার করলেও দুর্নীতি ও জাল-জালিয়াতির বিষয় মানতে রাজী নন সংস্থার কর্মকর্তারা।

তথ্যানুসন্ধ্যানে জানা যায়, আনন্দ সংস্থার কমিউনিটি অর্গেনাইজার ম্যামাচিং মারমা, ইউনিট ম্যানেজার শংকরি বিশ^াস, সংস্থার প্রোগাম অফিসার (ক্রেডিট) মো: জাহাংগীর আলম এবং রিজিওনাল ম্যানেজার বিজয় কৃষ্ণ বালা পরষ্পর যোগসাজশে বিভিন্নসময় খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার কমলছড়ি ইউনিয়নের ২নং ওয়াডের মেম্বার শান্তি বিকাশ চাকমা ও পেরাছড়া ইউনিয়নের মেম্বার কংজরী মারমার নামীয় সীল ও স্বাক্ষর জাল করে ৩১ জনকে, দীঘিনালা উপজেলার বোয়ালখালী ইউনিয়নের মেম্বার দিলু মোহাম্মদ ও কবাখালী ইউনিয়নের মেম্বার আবুল কালামের সীল ও স্বাক্ষর জাল করে ১২জনকে. মাটিরাঙা পৌরসভার কাউন্সিলর মোস্তফা মিয়া, মো: আলী হোসেন, এমরান হোসেন, সোহেল রানা, হাসেম ভুইয়া, আলা উদ্দিন লিটনের সীল ও স্বাক্ষর জাল করে ২১জনকে, খাগড়াছড়ি পৌরসভার মো: মাসুদুল হক ও অতিশ চাকমার সীল ও স্বাক্ষর জাল করে ৫০জনকে মৃত দেখিয়ে প্রায় ৯ লক্ষ টাক ঋণ মওকুপ করেছেন।

খাগড়াছড়ি পৌরসভার ৯নং ওয়াডের্র সাবেক কাউন্সিলর মো: মাসুদুল হক অভিযোগ করে জানান, বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা আনন্দ ২০০৭ সাল হতে বিভিন্ন সময় তার ওয়ার্ডের নাম-পরিচয় ও ঠিকানাহীন ১৬ জনসহ ৮১ জনকে ১৭ লক্ষ টাকা ঋন দিয়েছেন এবং ২০১৭ সালে এসে তার ওয়ার্ডের ঋণগ্রহিতাদের মৃত দেখিয়ে ১,৩৬.৫৬২ টাকাসহ প্রায় নয় লক্ষ টাকা ঋণ মওকুপ করেছেন। ঋন মওকুপ করতে খাগড়াছড়ি ও মাটিরাঙা পৌরসভা, কমলছড়ি, পেরাছড়া, কবাখালী, বোয়ালখালী ইউনিয়ন পরিষদের ১২জন জনপ্রতিনিধির সীল ও স্বাক্ষর জাল করে ঋন গ্রহিতা এবং কতিপয় ক্ষেত্রে তাদের অভিভাবকদের মৃত দেখিয়ে আনন্দ এনজিওর কর্মকর্তারা আত্মসাৎ করেছেন মর্মে অভিযোগ করেন। তিনি সংস্থার কর্তাদের আইনী নোটিশ পাঠিয়েছেন উল্লেখ করে জানান, জবাব সন্তোষজনক না হলে তিনি সংস্থার কর্মকতাদের বিরূদ্ধে মামলা করবেন।

মাটিরাঙা পৌরসভার কাউন্সিলর আলা উদ্দিন লিটন, মো: মোস্তফা মিয়া বলেন, তারা কখনো কাউকে মৃত হিসেবে সনদ দেননি। আনন্দ এনজিওর প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসলে তারা ঋণ গ্রহিতাদের খবর নিয়েছেন। কারো ঠিকানা সঠিক পাচ্ছেন না উল্লেখ করে বলেন”তাহলে ঋন প্রকৃত পক্ষে কাদেরকে দিলেন-তারা কারা? কাদের ঋণ মওকুপ করলেন? আনন্দ এনজিওর কর্মকর্তারাই পরষ্পর যোগসাজশে টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ করেন এসব জনপ্রতিনিধি।

কমলছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার শান্তি বিকাশ চাকমা জানান, তিনি তার ওয়ার্ডে খোঁজ খবর নিয়ে দেখেছেন যাদের নামে ঋণ বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে তাদের বেশিরভাগের নাম ঠিকানা সঠিক নয়। দু,একজনের নাম মিললেও তারা জীবিত আছেন, তবে মিলেনি তাদের স্বামীর নাম ও ঠিকানা। ভুয়া নাম পরিচয় ব্যাবহার করে সংস্থার লোকজনই টাকা উত্তোলন করেছেন এবং পরে আবার ঋণ গ্রহিতাদের মৃত দেখিয়ে নিজেরাই টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে তিনিও অভিযোগ করেন। খাগড়াছড়ি পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অতিশ চাকমা বলেন, আনন্দ সংস্থার কর্মকর্তারা পরষ্পর যোগসাজশে তার ১নং ওয়ার্ডে ৩৪জনকে ৩,১২,০০০ টাকা ঋণ দিয়েছেন এবং ২০১৭ সালে এসে ২৩জন ঋণ গ্রহিতা এবং ১১জন অভিভাবককে মৃত দেখিয়ে ১,২৪,৪৩৮ টাকা ঋণ মওকুপ করেছেন মর্মে দেখা যায়।

কাউন্সিলর অতিশ চাকমা বলেন, তিনি কাউকে মৃত হিসেবে সনাক্ত করার বা সনদ দেবার ক্ষমতা রাখেন না। জন্ম বা মৃত্যু সনদ একমাত্র মেয়র ইস্যু করে থাকেন। তার সীল ও স্বাক্ষর জাল করে আনন্দ এনজিও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ঋণ গ্রহিতা বা তাদের স্বামী বা অভিভাবকদের মৃত দেখিয়ে ঋণ মওকুপ দেখিয়ে ঋনের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তিনিও সংস্থাটি বিরূদ্ধে আইনানুগ ব্যাবস্থা নেবেন বলে জানান। আনন্দ এনজিওর ইউনিট ম্যানেজার শংকরি বিশ^াস বলেন যেহেতু ঋণ গ্রহণের পর ঋণ গ্রহিতারা তা পরিশোধ করছিলো না, সেহেতু কর্মকর্তারা সবাই মিলে ২০/০৬/২০১৭ইং তারিখে অনুষ্ঠিত সভায় ঋণ মওকুপের সিদ্ধান্ত নেয়।

”আনন্দ” এনজিওর খাগড়াছড়ি রিজিওনাল ম্যানেজার বিজয় কৃষ্ণ বালা সাংবাদিকদের জানান, তাদের ফান্ড বিদেশ হতে আসে। সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী তারা মাইক্রো-ক্রেডিটের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। যে কোন ফাইল অফিসিয়াল প্রক্রিয়ায় অনুমোদন হয়। জনপ্রতিনিধিদের স্বাক্ষর জাল করে মৃত দেখানোর বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং সত্যতা পেলে দোষীদের বিরূদ্ধে ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে। ঋণ যাদেরকে দেওয়া হয়েছে তাদের নাম-পরিচয় ও ঠিকানা সঠিক নেই এবং যে দু’একজনের নাম মিলেছে তারা জীবিত আছে-এটা কিভাবে সম্ভব? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করেন-তারা তা ভালো বলতে পারেন। তবে যে অভিযোগ উঠেছে-তা গুরুতর অনিয়ম, কিন্তু দুর্নীতি নয়। কারণ ঋণ মওকুপ করা হয়েছে, আত্মসাৎ করা হয়নি। এ বিষয়ে আবারো যোগাযোগ করা হলে টাকা আত্মসাতের বিষয়টি সত্য নয় বলে দাবি করেন। পুরো ঘটনাটি তদন্ত করা হয়েছে বলে জানান, ”আনন্দ” এনজিওর খাগড়াছড়ি রিজিওনাল ম্যানেজার বিজয় কৃষ্ণ বালা। খাগড়াছড়ি জেলা সমবায় অফিসার পুরো ঘটনাটি তদন্ত করছেন প্রয়োজনে তাঁর সাথে কথা বলে দেখতে পারেন।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে খাগড়াছড়ি জেলা সমবায় অফিসার আশিক কুমার দাশ বলেন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হতে এক পত্রের মাধ্যমে আমাকে তদন্ত করার দায়িত্ব দেয়া হয়। আমি সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করেছি। যেহেতু দীর্ঘ দিন ধরে ঋণ খেলাপী হয়ে পরেছে কু-ঋণ তহবিল হতে ঋণের টাকা সমন্বয় করা হয়েছে। ঋণ মহকুপের ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তি দেখানো হয়েছে এ বিষয়ে কী বলবেন এমন প্রশ্নের জবাবে তদন্ত অফিসার জেলা সমবায় কর্মকর্তা আশিক কুমার দাশ বলেন, অন্তত কিছু মানুষ ঋণের দায়মুক্ত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
”আনন্দ” এনজিওর উপ-পরিচালক মো: মনিরুজ্জামান’র কাছে জানতে চাইলে তিনি জরুরী এজিএম মিটিং আছেন, পরে জানাবেন বলে ফোন কেটে দেন।

সংস্থাটি ২০০৭ ও ২০০৮ সালে মোট কতজনকে কতটাকা ঋণ দিয়েছেন এবং সব মিলিয়ে কতজনকে মওকুপ করেছেন এবং ২০০৭ সাল থেকে এই পর্যন্ত কতজনকে কতটাকা ঋণ দিয়েছেন এবং কতজনকে মৃত দেখিয়ে ঋণ মওকুপ করেছেন-তা জানাবেন বলে প্রতিশ্রæতি দিলেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সাংবাদিকদের কোনো তথ্য সরবরাহ করা হয় নি।