অপু মজুমদার লেকচারার, আইসিটি বিভাগ লক্ষ্মীছড়ি সরকারি কলেজ, লক্ষ্মীছড়ি, খাগড়াছড়ি :
খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার রাণী নিহার দেবী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে দুই শিক্ষার্থীকে ৭২ সহপাঠীর মাধ্যমে থাপ্পড় দেওয়ার অভিযোগ সাম্প্রতিক সময়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষক নাঈমুল হকের নির্দেশে অষ্টম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীকে সহপাঠীরা থাপ্পড় দেয়। এ ঘটনায় শিক্ষক নিজের ভুল ও অন্যায় স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তদন্ত কমিটি গঠন, সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়ার কথাও জানা গেছে।
এখানে প্রথমেই বলা দরকার, বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে চূড়ান্তভাবে অপরাধী ঘোষণা করা উচিত নয়। একই সঙ্গে এটিও স্পষ্ট যে অভিযোগটি এতটাই গুরুতর যে একে সাধারণ শাসন বা শিক্ষকের কঠোরতার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীরা ভুল করলে বিদ্যালয় অবশ্যই সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে; কিন্তু কোনো শিক্ষার্থীকে সহপাঠীদের দিয়ে শারীরিকভাবে অপমান বা আঘাত করা শিক্ষার স্বাভাবিক পদ্ধতি হতে পারে না।
শাসন ও সহিংসতা এক বিষয় নয়
আমাদের সমাজে এখনো অনেকের ধারণা, শিক্ষক কঠোরভাবে শাসন না করলে শিক্ষার্থীরা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এই ধারণার একটি সামাজিক ভিত্তি আছে। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে শৃঙ্খলা বজায় রাখেন, শিক্ষার্থীদের আচরণ সংশোধন করেন এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করেন। একজন শিক্ষকের কাছ থেকে শৃঙ্খলা আশা করা তাই স্বাভাবিক।
কিন্তু শৃঙ্খলা ও সহিংসতা এক জিনিস নয়। শিক্ষার্থীকে ভুলের কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা, অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করা, কাউন্সেলিং করা, লিখিত সতর্কতা দেওয়া বা আচরণ সংশোধনের পরিকল্পনা করা শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা হতে পারে। কিন্তু থাপ্পড়, অপমান, ভয় দেখানো কিংবা সহপাঠীদের দিয়ে কাউকে মারানো সংশোধনের পরিবর্তে ভয় ও প্রতিশোধের সংস্কৃতি তৈরি করে।
বিশেষ করে ৭২ সহপাঠীর সামনে কোনো শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া হলে তার শারীরিক কষ্টের সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক অপমান। একই সঙ্গে অন্য শিক্ষার্থীদেরও একটি বিপজ্জনক বার্তা দেওয়া হয়—ক্ষমতাবান কেউ নির্দেশ দিলে দুর্বল বা কম ক্ষমতাসম্পন্ন কাউকে আঘাত করা বৈধ। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে এমন সংস্কৃতি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
৭২ সহপাঠীর ভূমিকা: দায় নির্ধারণে সতর্কতা প্রয়োজন
ঘটনায় ৭২ শিক্ষার্থীর নাম বা ভূমিকা সামনে এসেছে। তবে তাদের সবাইকে একইভাবে দায়ী করা ন্যায়সংগত হবে না। তারা অপ্রাপ্তবয়স্ক বা কিশোর শিক্ষার্থী। একজন শিক্ষক নির্দেশ দিলে অনেক শিক্ষার্থী ভয়, আনুগত্য বা পরিস্থিতির চাপে তা পালন করতে পারে। কেউ হয়তো অনিচ্ছায় অংশ নিয়েছে, কেউ প্রতিবাদ করতে পারেনি, আবার কেউ হয়তো বিষয়টিকে নিয়মিত শাস্তির অংশ বলে মনে করেছে।
তাই তদন্তে পৃথকভাবে জানা দরকার—কে কী করেছে, শিক্ষক কী নির্দেশ দিয়েছিলেন, কোনো শিক্ষার্থীকে জোর করা হয়েছিল কি না, কেউ প্রতিবাদ বা অস্বীকৃতি জানিয়েছিল কি না, এবং শিক্ষার্থীরা ঘটনার সময় মানসিকভাবে কী অবস্থায় ছিল। শিশুদের বক্তব্য নিতে হবে নিরাপদ ও গোপন পরিবেশে, শিক্ষক বা প্রভাবশালী ব্যক্তির উপস্থিতি ছাড়া।
প্রধান শিক্ষক ও স্কুল প্রশাসনের দায়িত্ব
সংবাদে বলা হয়েছে, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক প্রথমে ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান। পরে তিনি একটি দীর্ঘ ফেসবুক পোস্ট দেন, যেখানে স্কুলের ওপর স্থানীয় চাপ, ভর্তি-সংক্রান্ত বিরোধ, সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা এবং বিদ্যালয় প্রশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অভিযোগের কথা উঠে আসে। পরে পোস্টটি মুছে ক্ষমা চাওয়ার কথাও প্রকাশিত হয়েছে।
প্রধান শিক্ষকের বক্তব্যের পূর্ণ উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্ত ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক হবে না। তিনি হয়তো প্রতিষ্ঠানকে বাইরের চাপ থেকে রক্ষা করতে চেয়েছেন, অথবা তদন্তের আগে শিক্ষককে একতরফাভাবে দোষী না করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সংকটের সময়ে স্কুলপ্রধানের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রমাণ সংরক্ষণ করা, অভিভাবকদের সঙ্গে স্বচ্ছ যোগাযোগ রাখা এবং নিরপেক্ষ তদন্তে সহযোগিতা করা।
বিদ্যালয়ের সুনাম কোনো ঘটনা গোপন করে রক্ষা করা যায় না। বরং ভুল হলে তা স্বীকার করে দ্রুত ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থা নেওয়া, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে একই ঘটনা ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়ার মাধ্যমেই একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা পায়।
তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর
তদন্ত কমিটির কাজ শুধু ঘটনার সত্যতা যাচাই করা নয়; ঘটনার পেছনে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক কারণও খুঁজে বের করা। তদন্তে অন্তত কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন:
• শিক্ষক ঠিক কী নির্দেশ দিয়েছিলেন?
• দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য ছিল কি না?
• ৭২ শিক্ষার্থীর সবাই কি অংশ নিয়েছিল?
• কোনো শিক্ষার্থীকে জোর বা ভয় দেখানো হয়েছিল কি না?
• সিসিটিভি ফুটেজ সম্পূর্ণ ও অক্ষত আছে কি না?
• শিক্ষার্থীদের বক্তব্য কি স্বাধীনভাবে নেওয়া হয়েছে?
• ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা নিরাপদ আছে কি না?
• স্কুল প্রশাসন ঘটনাটি জানার পর কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
• ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
তদন্ত চলাকালে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিশোধমূলক আচরণ করা যাবে না। তাদের পরিচয়ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রকাশ করা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে তাদের চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা দিতে হবে। একইভাবে অভিযুক্ত শিক্ষককেও সামাজিক বিচার বা অনলাইন হয়রানির শিকার না করে যথাযথ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখা উচিত।
বৃহত্তর শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট
রাণী নিহার বিদ্যালয়ের ঘটনা শুধু একজন শিক্ষক বা দুই শিক্ষার্থীর ঘটনা নয়; এটি আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন তোলে। শিক্ষকরা কি শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, রাগ নিয়ন্ত্রণ, শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ও অ-সহিংস শৃঙ্খলা বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পান? বিদ্যালয়ে কি সহজ ও গোপন অভিযোগের ব্যবস্থা আছে? শিক্ষার্থীরা কি জানে, শিক্ষক বা সহপাঠীর অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে তারা কোথায় অভিযোগ করবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নেতিবাচক হলে শুধু একজনকে শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিশু সুরক্ষা নীতি, অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা, নিয়মিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং অভিভাবক-শিক্ষক যোগাযোগ জোরদার করতে হবে। শিক্ষার্থীদেরও জানাতে হবে যে কোনো শিক্ষক নির্দেশ দিলেও তারা অন্য শিক্ষার্থীকে মারতে পারে না।
শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনাও অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। কিন্তু শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার নামে সহিংসতা ব্যবহার করা হলে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং সহিংসতার নতুন চক্র তৈরি হয়। শিক্ষার্থীরা যদি কোনো ভুল করে, তাহলে তাদের বক্তব্য শোনা, ঘটনার সত্যতা যাচাই, অভিভাবকের সঙ্গে আলোচনা এবং সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই হওয়া উচিত পথ।
শেষ কথা
রাণী নিহার বিদ্যালয়ের ঘটনায় সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা, শিক্ষকের ভূমিকা প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা এবং ৭২ সহপাঠীর ওপর অযথা সম্মিলিত দায় চাপিয়ে না দেওয়া। শিক্ষককে সম্মান করতে হবে, কিন্তু শিক্ষক আইনের ঊর্ধ্বে নন। শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা মানতে হবে, কিন্তু তাদের মানবিক মর্যাদা বিসর্জন দিতে হবে না।
আমরা এমন বিদ্যালয় চাই, যেখানে শৃঙ্খলা থাকবে কিন্তু ভয় থাকবে না; শিক্ষককে সম্মান করা হবে কিন্তু অন্ধ আনুগত্য দাবি করা হবে না; ভুল হলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে কিন্তু অপমান বা প্রতিশোধ থাকবে না।
শিক্ষার উদ্দেশ্য ভীত মানুষ তৈরি করা নয়; দায়িত্বশীল, মর্যাদাবান ও মানবিক মানুষ তৈরি করা। সেই লক্ষ্যেই রাণী নিহার বিদ্যালয়ের ঘটনার সত্য উদঘাটন এবং ন্যায়সংগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।