:: এম মহাসিন মিয়া ::
পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে বান্দরবানে পাসের হার ৪১.৪২ শতাংশ, রাঙামাটিতে ৩৩.২৪ শতাংশ এবং খাগড়াছড়িতে মাত্র ২৯.৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ তিন জেলার কোনোটির পাসের হারই বোর্ডের সামগ্রিক পাসের হার ৫২.০৭ শতাংশের কাছাকাছি নয়। চট্টগ্রাম বোর্ডে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২ হাজার ৯২৯ জন, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই পরিসংখ্যান কেবল পরীক্ষার ফলাফল নয়, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠদানের মান এবং শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা নিয়ে গভীরভাবে ভাবার অবকাশ তৈরি করেছে।
ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম সম্ভাব্য কারণ হলো বিষয়ভিত্তিক দক্ষ, অভিজ্ঞ ও মেধাবী শিক্ষকের দীর্ঘদিনের সংকট। আমাদের অঞ্চলের বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। কোথাও একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয়ের দায়িত্ব পালন করতে হয়, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় যোগ্যতার শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হয়। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক পাঠদানকারী শিক্ষক এবং শহর বা বোর্ড পর্যায়ে উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও মূল্যায়ন পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে কি না, সেটিও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। কারণ শিক্ষার্থীর প্রকৃত মেধা বিকাশে মানসম্মত পাঠদান ও সঠিক মূল্যায়ন দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শহর থেকে বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞ ও মানসম্মত শিক্ষক আমাদের অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগদান করলেও দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, আবাসন সংকট এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন অবস্থান করতে চান না। একপর্যায়ে তাঁরা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যান। ফলে দিনশেষে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আবারও অভিজ্ঞ শিক্ষক সংকটে পড়ে এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। এর পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা, শূন্য পদ পূরণে বিলম্ব, নিয়মিত পাঠদান পর্যবেক্ষণের অভাব এবং শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতাও পরিস্থিতিকে জটিল করতে পারে। দুর্গম এলাকায় শিক্ষকদের ধরে রাখতে বিশেষ প্রণোদনা ও আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ও দায়িত্বশীলতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি, পাঠ্যবই অধ্যয়ন, বাড়ির কাজ সম্পন্ন করা, পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার, এসব ক্ষেত্রে অনেক শিক্ষার্থীর ঘাটতি থাকতে পারে। বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায় থেকে উচ্চমাধ্যমিকে উত্তরণের সময় অনেক শিক্ষার্থী বিষয়ভিত্তিক মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতায় পিছিয়ে পড়ে। সেই ঘাটতি যথাসময়ে পূরণ না হলে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ বুঝতে সমস্যা হয়। আবার মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার, পড়াশোনায় অমনোযোগ, পরীক্ষাভীতি এবং সঠিক অধ্যয়ন পরিকল্পনার অভাবও ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত অধ্যয়ন, শৃঙ্খলাবোধ ও পড়াশোনার প্রতি দায়িত্বশীলতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
অভিভাবকদের সচেতনতা ও পারিবারিক আর্থসামাজিক অবস্থাও শিক্ষার্থীদের ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্কিত। অনেক অভিভাবক সন্তানের পড়াশোনার অগ্রগতি, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখতে পারেন না। দুর্গম এলাকার অনেক পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা, কৃষি ও জীবিকানির্ভর ব্যস্ততা, শিক্ষা উপকরণ কেনার সামর্থ্যের অভাব এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক শিক্ষার সুযোগ না থাকাও শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে দিতে পারে। কোথাও পারিবারিক দায়িত্ব বা জীবিকার প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত শিক্ষক-অভিভাবক যোগাযোগ, দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি এবং শিক্ষা উপকরণ সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এর বাইরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষের অভাব, বিজ্ঞানাগার ও ব্যবহারিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা, সমৃদ্ধ পাঠাগার না থাকা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সুবিধার ঘাটতিও শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় বর্ষাকালে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নিয়মিত ক্লাস পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া যেসব শিক্ষার্থীর মাতৃভাষা বাংলা নয়, তাদের ক্ষেত্রে বাংলা মাধ্যমে পাঠ্যবিষয় বোঝার অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে। এসব শিক্ষার্থীর জন্য উপযোগী ভাষাগত সহায়তা, ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ এবং ব্যবহারিক পাঠদানের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক এসব ঘাটতি চিহ্নিত না করলে প্রকৃত সমস্যা আড়ালেই থেকে যাবে।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের বিভাগভিত্তিক ফলাফলও শিক্ষাব্যবস্থার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৭৪.৪২ শতাংশ, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৫৪.১৪ শতাংশ এবং মানবিক বিভাগে ৩৮.৩১ শতাংশ। অর্থাৎ মানবিক বিভাগের ফলাফল তুলনামূলকভাবে অনেক পিছিয়ে। বোর্ডের অধীনে তিনটি কলেজে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি, বিপরীতে ছয়টি কলেজে শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। আবার বৈরী আবহাওয়া ও বন্যার কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত হয়ে পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব তথ্যের পাশাপাশি পার্বত্য তিন জেলার কলেজভিত্তিক ফলাফল, বিষয়ভিত্তিক অকৃতকার্যতার হার, শিক্ষকসংখ্যা ও উপস্থিতির তথ্য বিশ্লেষণ করলে সংকটের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।
সবকিছু বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসন, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড, জনপ্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারকদের কাছে দাবি থাকবে, পার্বত্য চট্টগ্রামে মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক। দুর্গম এলাকায় বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগ ও তাঁদের ধরে রাখার ব্যবস্থা, শূন্য পদ পূরণ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক শিক্ষা উপকরণ, বিজ্ঞানাগার, পাঠাগার, বৃত্তি এবং ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, অভিভাবকদের সচেতনতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ফলাফল বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে নিরপেক্ষ গবেষণা ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পর্যালোচনা জরুরি। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা সংকট শুধু পরীক্ষার ফলাফলের বিষয় নয়, এটি আগামী প্রজন্মের মেধা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক আঞ্চলিক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। – লেখক: এম মহাসিন মিয়া, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক লেখক।