জেএসএসের কাছে আধিপত্য হারাতে যাচ্ছে ইউপিডিএফ ?

শেয়ার করুন
‎
‎পার্বত্য চট্টগ্রামের সাজেক অঞ্চলে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তার ও আইন অমান্য করার নগ্ন বাস্তবতাকে উন্মোচিত করেছে। ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সাজেক ইউনিয়নের বিচার বিভাগের সমন্বয়ক এবং তথাকথিত সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা সম্প্রতি গণমাধ্যমে জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের বিরুদ্ধে সাজেকে অবস্থান নেওয়া, চাঁদা আদায় এবং মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের মতো নানা অপরাধের অভিযোগ এনেছেন। কিন্তু তিনি সুকৌশলে চেপে গেছেন যে, তার নিজস্ব সংগঠন ইউপিডিএফ (প্রসীত) দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ে একটি ভয়ঙ্কর সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে সাধারণ জনগণকে জিম্মি করে অপরাজনীতি ও অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাকস্বাধীনতা স্বীকৃত হলেও, অসত্য তথ্য ছড়িয়ে শান্তি বিনষ্ট করা আইনত দণ্ডনীয়। বাবুধন চাকমা নিজেদের অপকর্ম ঢেকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে আইনি প্রক্রিয়াকে তোয়াক্কা না করে একপেশে অভিযোগ তুলে ধরেছেন।
‎
‎জেএসএসকে (সন্তুকে) সাজেক থেকে হটাতে সরকার ও সেনাবাহিনীর কাছে বাবুধন চাকমার আল্টিমেটাম দেওয়া এবং সাজেকে জেএসএস এর অবস্থানের জন্য সরাসরি সরকার ও সেনাবাহিনীকে দায়ী করা একটি পরিকল্পিত ও রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশের ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ১২১ ও ১২১এ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌম প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অসত্য ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকার ও সেনাবাহিনী সব ধরনের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” নীতি অনুসরণ করছে এবং সন্ত্রাস দমনে আইনানুযায়ী অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এ অবস্থায় সাজেকে জেএসএসকে প্রবেশ করানোর অবাস্তব দাবি তুলে সেনা ও রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার যে অপচেষ্টা করা হয়েছে, তা কেবল ভিত্তিহীনই নয়, বরং দণ্ডবিধির ৫০০ ও ৫০৫(ক) ধারা অনুযায়ী সরাসরি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
‎
‎প্রকৃতপক্ষে, সাম্প্রতিক সময়ে খাগড়াছড়ির পানছড়ি, মাটিরাঙ্গা এবং রাঙামাটির সাজেকসহ আশপাশের এলাকায় ইউপিডিএফ (প্রসীত) ও জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের মধ্যে একাধিকবার সরাসরি মুখোমুখি সশস্ত্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইন (Arms Act) অনুযায়ী অবৈধ অস্ত্র বহন, সংরক্ষণ ও প্রয়োগ সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই সংঘাতের মূল উদ্দেশ্য পার্বত্যবাসীর কোনো মৌলিক অধিকার বা কল্যাণ সাধন নয়, বরং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার এবং বেআইনি চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য কায়েম রাখা। সংঘাতের এক পর্যায়ে ইউপিডিএফ (প্রসীত) তাদের ভৌগোলিক আধিপত্য হারিয়ে কোনঠাসা হয়ে পড়ে এবং সাজেক পর্যটন এলাকায় আশ্রয় নিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালায়। কিন্তু জেএসএস (সন্তু) সেখানেও হানা দিলে ইউপিডিএফ চূড়ান্তভাবে সাজেকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মুখোমুখি হয়, যা তাদের চরম অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দেয়।
‎
‎সশস্ত্র সংঘাত ও কৌশলে টিকতে না পেরে ইউপিডিএফ তাদের অনুগত সংগঠন “সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি” এবং “সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনকে” ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। সাধারণ পাহাড়ি জনগণকে অস্ত্র প্রদর্শন ও অর্থদণ্ডের ভয় দেখিয়ে বেআইনিভাবে জোরপূর্বক রাজপথে নামানো হয়। দণ্ডবিধির ৫০৬ (অপরাধমূলক হুমকি) এবং ৩৮৩ (জোরপূর্বক আদায় বা Extortion) ধারা অনুযায়ী সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে আন্দোলনের নামে জিম্মি করা গুরুতর অপরাধ। ইউপিডিএফের তৈরি এই পকেট সংগঠনগুলো সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালানোর পাশাপাশি সাজেক পর্যটন সড়ক অবরোধ করে চরম জনদুর্ভোগ তৈরি করে। এটি সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিত নাগরিকদের চলাফেরার স্বাধীনতা বা “Freedom of Movement” এর ওপর প্রত্যক্ষ আঘাত এবং জননিরাপত্তা আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
‎
‎আইনগত ও যুক্তিযুক্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি বা কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন কেবল জেএসএস (সন্তু) গ্রুপকে সাজেক থেকে সরানোর দাবি জানালেও ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপকে সরানোর কথা একবারও উচ্চারণ করে না। তাদের এই একপেশে ও পক্ষপাতমূলক অবস্থানই প্রমাণ করে যে, সামাজিক ব্যানারের আড়ালে ইউপিডিএফের পরিকল্পিত এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং সাজেকে ইউপিডিএফকে স্থায়ীভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা চলছে। কিন্তু ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়, বরং অপরাধ সংঘটনকারী সব ধরনের সশস্ত্র সন্ত্রাসী চক্রকে নির্মূল করতে আইনগতভাবে বাধ্য। সেনাবাহিনী ও সরকারের কার্যক্রম কেবল কোনো নির্দিষ্ট একক দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং পাহাড়ের সামগ্রিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় সব সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সমানভাবে কার্যকর। আর সরকার ও সেনাবাহিনী সে অনুযায়ীই করে আসছেন। পাশাপাশি কার্বারীরা প্রথাগত নেতৃত্বের আড়ালে যে পাহাড়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর সেটাও জুম্ম জনগণের কাছে উন্মোচন হয়েছে।
‎
‎আঞ্চলিক এসব অবৈধ সশস্ত্র গোষ্ঠীর ক্ষমতার লড়াই ও চাঁদাবাজির বলির পাঁঠা হচ্ছে পার্বত্য অঞ্চলের খেটে খাওয়া নিরীহ পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠী। সাজেক পর্যটন সড়ক বেআইনিভাবে অবরোধ করার ফলে স্থানীয় শত শত ব্যবসায়ী ও পর্যটন খাতের শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়েছে, যা সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত পেশা ও জীবিকা নির্বাহের স্বাধীনতার পরিপন্থী। সম্প্রতি সাজেক পর্যটক সড়ক অবরোধকালে সাজেকে আটকে পড়া প্রায় ৩ হাজার পর্যটককে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যখন আইনি হেফাজতে নিরাপদে ফিরিয়ে আনছিল, তখন ইউপিডিএফ নিরপরাধ জুম্ম জনগণকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাস্তা আটকে রাখে। এ সময় ইউপিডিএফের সশস্ত্র ক্যাডাররা পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর সরাসরি গুলিবর্ষণ করে, যা দণ্ডবিধির ৩০৭ ধারা (হত্যাচেষ্টা) এবং ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক উপাদান আইনের অধীনে মারাত্মক অপরাধ।
‎
‎নিরাপত্তা বাহিনী অত্যন্ত সাহসিকতা, ধৈর্য ও উচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে কোনো ধরনের হতাহতের ঘটনা ছাড়াই ৩ হাজার পর্যটককে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়ে তাদের আইনগত দায়িত্ব পালন করেছে। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০০৯ (Anti-Terrorism Act, 2009) এর ওপর ভিত্তি করে জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী এবং সার্বভৌমত্বের হুমকিপ্রদানকারী যেকোনো সশস্ত্র দলকে আইনিভাবে নিষিদ্ধ করার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। পাহাড়ের সাধারণ মানুষ এখন ইউপিডিএফ বা জেএসএস এর মতো অবৈধ সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর জিম্মিদশা থেকে চিরতরে মুক্তি চায়। শান্তিকামী পাহাড়বাসীর এখন একটাই সুনির্দিষ্ট ও জোর দাবি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ইউপিডিএফ ও জেএসএস সহ পার্বত্য অঞ্চলের সকল প্রকার সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনকে অবিলম্বে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তাদের আস্তানা পুরোপুরি ধ্বংস করতে হবে। ‎লেখক: এম এম রাহমান, লেখক ও গবেষক, ঢাকা। সূত্র: দৈনিক খাগড়াছড়ি।  বি: দ্র: লেখকের নিজস্ব মতামত। এই পত্রিকার কর্তৃপক্ষ দায়ি নয়।