:: মেহেদী হাসান পলাশ::
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক পর্যটন এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ দেশি বিদেশি পর্যটক পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণ করে থাকেন এবং এই পর্যটন পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনীতির চাকা ব্যাপকভাবে ঊর্ধমুখী সচল করেছে।
মানচিত্র দেখুন
এই পর্যন্ত সারা বছর অব্যাহত থাকলেও বছরের কিছু নির্দিষ্ট দিনগুলোতে তার চাপ ব্যাপকভাবে বাড়ে। বিশেষ করে দুই ঈদ, পূজা এবং সরকারি ছুটির দিনগুলোতে। এবারের পূজার ছুটি দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ব্যাপকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিল। অন্যান্য বছরগুলোতে এই সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন স্পটগুলোতে হোটেলে রুম না পেয়ে পর্যটকরা রাস্তায় রাত পার করে থাকে। আলু ভর্তা- ডাল – ভাত ৩০০-৪০০ টাকায় বিক্রি হয়। ফলে এবারের পর্যটন মৌসুমেও পর্যটন সংশ্লিষ্টরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিল।
পর্যটনে কেবল হোটেল মালিকরা লাভবান হয় না। এর সাথে রেস্টুরেন্ট মালিক, যানবাহন মালিক, দোকান মালিক সবাই লাভবান হয়। পর্যটকরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য, কমলা, মালটা, কলা, আদা, হলুদের মত বিভিন্ন কৃষি পণ্য ক্রয় করে থাকে। ফলে এর সাথে জড়িত কৃষক ও ব্যবসায়ীরাও লাভবান হয়। লাভবান হয় এই বিপুল কর্ম ক্ষেত্রে জড়িত শ্রমিক, কর্মচারী ও তাদের পরিবাররা। কিন্তু এবারে ইউপিডিএফ এর ডাকা অবরোধ পর্যটন নির্ভর মালিক, শ্রমিক ও কৃষকদের পেটে লাথি মেরেছে। তবুও সন্ত্রাসীদের ভয়ে তারা মিডিয়ার সামনে মুখ খুলতে সাহস করছে না। স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত তথ্য ও অভিজ্ঞতা বলছে, এই অস্থিরতা আরো কিছুদিন চলবে। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও তাদের উপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যরা আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে?
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আমার একটি চলমান গবেষণায় দেখতে পাচ্ছি, শান্তি চুক্তির পূর্বে নিরাপত্তা বাহিনী কীভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতো। কতটা গভীর বনাঞ্চল ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ভেতরেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা অপারেশন পরিচালনা করতে যেত। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর শত শত সদস্য শহীদ হয়েছেন, সহস্রাধিক আহত হয়েছেন। তবুও দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় প্রাণ উৎসর্গ করার চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সেসব অপারেশন চালাতে যেতেন তরুণ অফিসারগণ। অবসরপ্রাপ্ত অনেক অফিসারের কাছে তাদের তরুণ বয়সের এ ধরনের অভিযানের গল্প শুনে শরীর ও মন শিহরিত হয়ে ওঠে। তাদের দেশপ্রেমের চেতনা সঞ্চারিত হয় আমাদেরও শোণিতে ও চেতনায়।
কিন্তু শান্তিচুক্তির পর সেখানে কিছুটা ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। চুক্তির বাধ্যবাধকতা, আইনি সীমাবদ্ধতা নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রম সীমিত করে ফেলেছে। ফলে পাহাড়ের জঙ্গল ও সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকাগুলো এখন বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসীদের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে। সন্ত্রাসীরা পাহাড়ে, জঙ্গলে ও দুর্গম সীমান্তাঞ্চলে নিরাপদ বোধ করছেন। অস্ত্র হাতে লোকালয়ে না এলেও সেখান থেকে তারা তাদের অপরাধ কর্মকাণ্ড লোকালয়ে পরিচালনা করছে। প্রতিনিয়ত অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে সন্ত্রাসীদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ, হতাহতের ঘটনা ঘটছে।
এ সকল বন্দুকযুদ্ধ ও হতাহতের ঘটনা সন্ত্রাসী দলগুলোর অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ থাকায় সরকার যেন বিষয়টি উপেক্ষা করেই আসছে। সতীনের ছেলের বাঘ মারার গল্পের মত। কিন্তু এভাবে চলতে পারে না। ক্যান্সার শরীরে জিইয়ে রাখলে তা একসময় মৃত্যুর কারণ ঘটে। একটি সভ্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অবৈধ অস্ত্রধারী, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, বন্দুকযুদ্ধ চলতে পারে না। সেটা যতই দুর্গম ও লোকালয়হীন এলাকায় ঘটুক, এমন কি তাতে স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত না হলেও কোনো সভ্য রাষ্ট্র এভাবে তার জনগণের একটি অংশের হাতে অবৈধ অস্ত্র রেখে নিরাপদ বোধ করতে পারে না।
বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর যে সক্ষমতা ও প্রযুক্তি রয়েছে তাদের পক্ষে এই দেশের অভ্যন্তরের যেকোনো সন্ত্রাসী গ্রুপকে নির্মূল করতে তারা সক্ষম বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সেটা যত দুর্গম এলাকাতেই হোক। কিন্তু প্রয়োজন সরকারের যথাযথ নির্দেশনা, আইনি সীমাবদ্ধতা কাটানো এবং সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা। জঙ্গলে সন্ত্রাসীরা নিজেদের মধ্যে গোলাগুলি করবে আর শহরে ডিসি, এসপিরা আরাম আয়েসে দিন পার করবে, এই নীতির পরিবর্তন করতে হবে। সন্ত্রাসীরা যেখানেই থাকুক তাদের চেজ করতে হবে, তাদের ডেরায় ঢুকে তাদের ধ্বংস করতে হবে, ঠিক যেভাবে আশির দশক ও ৯০ দশকের প্রথমার্ধে করেছিল শহীদ লেফটেন্যান্ট মুশফিক ক্যাপ্টেন গাজী ক্যাপ্টেন মহসিনের মতো বাংলার দামাল তরুণেরা। লেখক: সম্পাদক পার্বত্যনিউজ ও চেয়ারম্যান পার্বত্য চট্টগ্রাম রিসার্স ফাউন্ডেশন ।