পাহাড়জুড়ে উৎসবের ঢেউ,শোভাযাত্রা, নৃত্য আর সংস্কৃতির রঙে জীবন্ত হয়ে উঠল বৈসু

শেয়ার করুন

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি: পাহাড়ে এখন উৎসবের ঋতু। বসন্তের রঙ, প্রকৃতির নবজাগরণ আর মানুষের অন্তরের আনন্দ মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য আবহ। সেই আবহেই খাগড়াছড়ি জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের প্রাণের উৎসব ‘বৈসু’র রঙিন উচ্ছ্বাস। যেন প্রতিটি পথ, প্রতিটি মুখ, প্রতিটি হৃদয়—সবই আজ উৎসবমুখর।
বৃহস্পতিবার (০৯ এপ্রিল) সকালে খাগড়াছড়ি পৌর টাউন হল প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হওয়া বর্ণাঢ্য আয়োজনটি পরিণত হয় এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়। বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ ও ত্রিপুরা যুব কল্যাণ সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসবে শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
শোভাযাত্রার শুরুতেই চোখে পড়ে রঙের বিস্ফোরণ। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ ও তরুণ-তরুণীরা নিজ নিজ ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও গহনায় সজ্জিত হয়ে অংশ নেন শোভাযাত্রায়। রঙিন বস্ত্র, হাতে ফেস্টুন-ব্যানার আর মুখভরা হাসি,সব মিলিয়ে যেন জীবন্ত এক চলমান চিত্রকর্ম। তাদের পদচারণায় শহরের প্রধান সড়কগুলো হয়ে ওঠে উৎসবের ক্যানভাস।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই পরিবেশিত হয় ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী গরিয়া নৃত্য ও বৈসু নৃত্য। ঢোলের তালে তালে নৃত্যের ছন্দ, তার সঙ্গে রঙিন পোশাকের ঝলক—দর্শকদের মুগ্ধতায় ভরিয়ে তোলে চারপাশ। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন বহন করে নিয়ে আসে শতবর্ষের ঐতিহ্য, পূর্বপুরুষের স্মৃতি আর সংস্কৃতির গর্ব।
শুধু নৃত্য নয়, ছিল বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক আয়োজন, লোকগান এবং ঐতিহ্যবাহী ডিসপ্লে প্রদর্শনী। এসব প্রদর্শনীতে ফুটে ওঠে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, কৃষিনির্ভর সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠান এবং প্রকৃতির সঙ্গে তাদের নিবিড় সম্পর্ক। নতুন প্রজন্মের জন্য এটি হয়ে ওঠে শিকড়কে জানার এক অনন্য সুযোগ।
পরে বের হয় বর্ণাঢ্য বৈসু শোভাযাত্রা। পৌর টাউন হল থেকে শুরু হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে চেঙ্গী স্কয়ার ঘুরে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ মাঠে গিয়ে শেষ হয় শোভাযাত্রাটি। পথজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের মুখেও ছিল বিস্ময় আর আনন্দের ছাপ—যেন সবাই এই উৎসবের অংশ হয়ে উঠেছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি কমল বিকাশ ত্রিপুরা। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা। তিনি বলেন, “বৈসু শুধু উৎসব নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ। এই উৎসব আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে, নতুন প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করে।”
শুধু ত্রিপুরা সম্প্রদায় নয়, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণে এ আয়োজন পেয়েছে সম্প্রীতির এক নতুন মাত্রা। স্থানীয় বাঙালি ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষও যোগ দিয়েছেন এ আনন্দযাত্রায়,যা পাহাড়ের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
উৎসবের আমেজ শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ নয়। পাহাড়ে, গ্রামে গ্রামে, এমনকি প্রতিটি ঘরেও ছড়িয়ে পড়েছে বৈসুর আনন্দ। পুরাতন বছরের সব গ্লানি ভুলে নতুন বছরের আহ্বান—এই বার্তাই বহন করে নিয়ে আসে বৈসু। প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে জীবনকে নতুন করে সাজানোর এক অনুপ্রেরণা দেয় এই উৎসব।
এ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম এন আবছার, প্রেসক্লাব সভাপতি তরুণ কুমার ভট্টাচার্য্য, সাধারণ সম্পাদক এইচ এম প্রফুল্ল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমানসহ ত্রিপুরা সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
খাগড়াছড়ির এই বর্ণিল আয়োজন যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়—পাহাড়ে উৎসব মানেই শুধু আনন্দ নয়; এটি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা, সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং সহাবস্থানের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। বৈসুর রঙে রাঙা এই জনপদ তাই বারবার ডেকে যায়,ফিরে আসো শিকড়ে, ফিরে আসো নিজের সংস্কৃতিতে।