প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরা খাগড়াছড়ি, মন জুড়াবে পাহাড়-ঝরনার দৃশ্য দেখে

শেয়ার করুন

মোবারক হোসেন: পাহাড়, নদী, ছড়া, ঝিরি, ঝরনা ও সমতল ভূমি মিলে একটি অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত অন্যতম একটি জেলা খাগড়াছড়ি। প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর রহস্যময়তায় ঘেরা জেলায় রয়েছে বিভিন্ন নামের পর্যটন কেন্দ্র। প্রকৃতিপ্রেমী, অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় বা ভ্রমণ বিলাসীদের ঘুরে বেড়ানোর জন্য একটি অন্যতম জনপ্রিয় স্থান আলুটিলা। যোগাযোগ ব্যবস্থা আর অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে খুব সহজে খাগড়াছড়ি সকল পর্যটন স্পট ঘুরে দেখা যায়। বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ছাড়াও পাহাড়ি এ জেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। ফলে এখানকার পর্যটন খাতের বৈচিত্র্যতাও বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে রাঙ্গামাটির সাজেকে যাওয়ার গেটওয়ে হিসেবেও খাগড়াছড়ি জেলা অন্যতম।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মোট আয়তন ২ হাজার ৬৯৯.৫৫ বর্গকিলোমিটার। এই জেলার উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা, পূর্বে ভারতের মিজোরাম রাজ্য ও ত্রিপুরা রাজ্য এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলা ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য অবস্থিত।

তিন পার্বত্য জেলাগুলোর মধ্যে পর্যটনের দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে এই জেলাটি। যদিও অপার পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকছে খাগড়াছড়ি।

সবুজের চাদরে আচ্ছাদিত খাগড়াছড়ি জেলায় রয়েছে আকাশ-পাহাড়ের মিতালি, চেঙ্গি ও মাইনি উপত্যকার বিস্তীর্ণ সমতল জনপদ। এখানকার প্রধান প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলো হচ্ছে আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র, রহস্যময় আলুটিলা গুহা, রিছাং ঝরনা, তৈদুছড়া ঝরনা, নিউজিল্যান্ড পাড়া, হাতিমাথা, মানিকছড়ি ডিসি পার্ক, দেবতা পুকুর, মায়াবিনি লেক, জেলা পরিষদ পার্ক, হেরিটেজ পার্ক। ঘুরতে পারবেন পানছড়ি শান্তিপুর অরণ্য কুঠির, মানিকছড়ি মং রাজবাড়ি ও লক্ষ্মীছড়ির ভাইরাল জুমপাহাড়।

এছাড়া রয়েছে নানা নামের বিভিন্ন খাবারের দোকান। ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন খাবারের স্বাদের যেমন চাহিদা আছে তেমনি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার আদলে গড়ে উঠেছে রেস্টুরেন্টও। ২/১টির নাম না বললেই নয়- যেমন: সাদামাটা রেষ্টুরেন্ট ও সিষ্টেম রেষ্টুরেন্ট উল্লেখযোগ্য আরো অনেক রেষ্টুরেন্ট রয়েছে।

প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়ার মতো সব বিনোদন কেন্দ্রই পর্যটকদের আরো বেশি আকৃষ্ট করতে কমবেশি দৃষ্টিনন্দন করা হচ্ছে। অবকাঠামাগোতও উন্নয়ন হয়েছে। ইট-পাথরের ছোঁয়ায় সাজানো হয়েছে আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রকে, যা আগের তুলনায় আরো বেশি আকৃষ্ট করছে পর্যটকদের। ঈদ ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বৈসাবি উৎসব এর সময় খাগড়াছড়ি বেশ রঙিন ও উৎসবমুখর পরিবেশ হয়ে ওঠে।

খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেলের প্রধান রিসিপশনিস্ট মং জানান,  বুকিং কিছুটা কম হলেও আশা করছি সামনে শীতের মৌসুমে অনেকটা ভালো হবে।

খাগড়াছড়ি শহরের আবাসিক হোটেল নূর মালিক তারেক আহমেদ চৌধুরী জানান, এখন পর্যন্ত হোটেলের রুমের বুকিং নেই। যে কয়েকটি বুকিং আছে তা আশানুরূপ নয়। সাজেকের পর্যটকদের আসা-যাওয়া বাড়লে হয়তো রুমের বুকিং বাড়তে পারে বলে জনিয়েছেন হোটেল মালিক।

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্র হলো ‘জেলা পরিষদ হর্টিকালচার হেরিটেজ পার্ক’। স্থানীয় ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের জন্য অ্যাডভেঞ্চারধর্মী বিনোদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সম্প্রতি জেলা পরিষদ পার্কটিতে আন্তর্জাতিক মানের সরঞ্জামে সুসজ্জিত জিপ লাইন (Zip Line) এবং জায়ান্ট সুইং (Giant Swing) চালু করেছে। নতুন অ্যাডভেঞ্চার রাইডগুলোর  চালু হওয়ার  মাধ্যমে পার্বত্য খাগড়াছড়ির পর্যটন খাতে একটি নতুন রোমাঞ্চকর মাত্রা যুক্ত হয়েছে।

কর্তৃপক্ষ জানান, জিপ লাইন (Zip Line): এটি প্রায় ৮০০ ফুট দীর্ঘ এক তারের সংযোগ পথ। নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে বা লেকের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা দেয় এই রাইডটি। জায়ান্ট সুইং (Giant Swing): এটি একটি বিশাল আকারের দোলনা রাইড, যা পর্যটকদের উঁচু স্থানে ঝুলিয়ে বেশ গতিতে দোলায়, যা থ্রিল এবং অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ।

এদিকে খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার মোরতোজা আলী খাঁন জানিয়েছেন উৎসব এবং পর্যটকদের ভ্রমণ নিরাপদ করতে পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার সব সময় ছিলো আগামীতেও থাকবে। যেকোনো ধরনের সহায়তার জন্য পুলিশ পর্যটকদের পাশে রয়েছে।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো: আনোয়ার সাদাত বলেন,  খাগড়াছড়ি কেবল পাহাড়, ঝরনা কিংবা উপত্যকার ভূমি নয়; এটি প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এবং এখানকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন। আলুটিলা গুহা, রিছাং ঝরনা, তারেং, মায়াবিনী লেক কিংবা মানিকছড়ির ডিসি পার্কের মতো স্থানগুলো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো এই প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রেখে একটি আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

জেলা প্রশাসক মো: আনোয়ার সাদাত আরো বলেন, পর্যটকদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার। ট্যুরিস্ট পুলিশ এবং জেলা পুলিশ সমন্বিতভাবে পর্যটন স্পটগুলো এবং সাজেকগামী সড়কগুলোতে সার্বক্ষণিক টহল ও নজরদারি নিশ্চিত করছে।