খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি: পাহাড়ের দুর্গম জনপদে বসবাস। জীবিকার সীমিত সুযোগ, প্রশিক্ষণের অপ্রতুলতা আর দূরত্বের কারণে দক্ষতা অর্জনের সুযোগও অনেকের নাগালের বাইরে। এমন বাস্তবতায় দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বেকার যুবক-যুবতী ও আগ্রহী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ।
কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, আত্মকর্মসংস্থানে উৎসাহিত করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগে খাগড়াছড়ি জোনের ব্যবস্থাপনায় এবং আনন্দ ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারের সহায়তায় শুরু হয়েছে দুটি বিনামূল্যের কারিগরি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে খাগড়াছড়ি সদর সেনা জোনের উদ্যোগে এ আনন্দ ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমিনুর রহমান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আনন্দ ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক শ্যামল আগষ্টিন রোজারিওসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমিনুর রহমান বলেন, “দক্ষতা অর্জনই একজন তরুণের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি। দুর্গম এলাকার বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মমুখী করে তুলতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে। পাহাড়ের মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে দক্ষতা উন্নয়নভিত্তিক উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।”
প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া বেকার যুবক-যুবতী ও স্থানীয় আগ্রহী জনগোষ্ঠীকে বাস্তবমুখী কারিগরি দক্ষতায় দক্ষ করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি প্রশিক্ষণে বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপন, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। অন্যটিতে মোবাইল ফোনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ শনাক্তকরণ, ত্রুটি নির্ণয় ও মেরামতের ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবেন প্রশিক্ষণার্থীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের টেকসই উন্নয়নে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং তাদের হাতে কর্মদক্ষতা তুলে দেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর। একটি দক্ষতা একজন তরুণকে চাকরির পাশাপাশি নিজেই কাজের সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে। ফলে ব্যক্তির আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবার ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রশিক্ষণার্থীরা বলেন, দুর্গম এলাকায় বসবাসের কারণে অনেকের পক্ষেই দূরবর্তী স্থানে গিয়ে কারিগরি প্রশিক্ষণ নেওয়া সম্ভব হয় না। নিজ এলাকায় বিনামূল্যে এমন বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ পাওয়ায় তারা অত্যন্ত আনন্দিত ও উপকৃত। প্রশিক্ষণ শেষে অর্জিত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের কর্মসংস্থান তৈরি, পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতে ছোট পরিসরে ব্যবসা পরিচালনার স্বপ্ন দেখছেন তারা।
তাদের মতে, পাহাড়ের প্রত্যন্ত এলাকায় এমন উদ্যোগ শুধু প্রশিক্ষণ নয়—এটি সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দেওয়ার মতো। বিশেষ করে তরুণদের কর্মমুখী করে তুলতে এ ধরনের কার্যক্রম নিয়মিত চালু রাখারও প্রত্যাশা জানিয়েছেন প্রশিক্ষণার্থীরা।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকার জনগোষ্ঠীর জন্য নেওয়া এ উদ্যোগে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রশিক্ষণার্থীরা ভবিষ্যতেও এ ধরনের প্রশিক্ষণের সুযোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রশিক্ষণ শেষে অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অংশগ্রহণকারীদের কেউ চাকরিতে যুক্ত হবেন, কেউ আত্মকর্মসংস্থানের পথ বেছে নেবেন, আবার কেউ গড়ে তুলবেন ক্ষুদ্র ব্যবসা। এতে একদিকে যেমন বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের আর্থিক সক্ষমতা ও আত্মনির্ভরশীলতা বাড়বে।
পাহাড়ের প্রান্তিক জনপদে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা তৈরি করে দেওয়ার দিক থেকেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।