খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি: কুষ্ঠ আক্রান্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, প্রয়োজন এবং সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাস্তবতা সম্পর্কে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সচেতন করতে খাগড়াছড়িতে ‘অধিকার ও প্রয়োজন’ বিষয়ক ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে।২৩ আগস্ট রোববার খাগড়াছড়ি সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে ‘Orientation on the Rights and Needs’ শীর্ষক এ ওরিয়েন্টেশনের আয়োজন করা হয়। এতে জেলা সিভিল সার্জন ডা. রতন খীসা, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আবু আবদুল্লাহ মোঃ ওয়ালী উল্লাহ, জাতীয় মহিলা সংস্থার জেলা কর্মকর্তা উথান চৌধুরীসহ বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও উপকারভোগীরা অংশ নেন।
আয়োজকরা জানান, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অধিকার ও প্রয়োজন সম্পর্কে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি এবং সেই অনুযায়ী আরও কার্যকর, সমন্বিত ও অধিকারভিত্তিক সেবা নিশ্চিত করাই এ ওরিয়েন্টেশনের মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে কুষ্ঠ আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের চিকিৎসা, পুনর্বাসন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মর্যাদা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কর্মশালায় প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন লেপ্রসি কন্ট্রোল অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন প্রজেক্ট ও দি লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল—সিএইচটি প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক পরশ চাকমা। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন সিএইচটি লেপ্রসি কন্ট্রোল অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন প্রজেক্ট ও দি লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, খাগড়াছড়ির সমন্বয়কারী বীর মোহন ত্রিপুরা।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, একসময় সমাজে কুষ্ঠরোগকে ভয়াবহ অভিশাপ হিসেবে দেখা হতো। আক্রান্ত ব্যক্তিকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে গ্রামের বাইরে কিংবা পাহাড়ের নির্জন কোণে ছোট ঘরে বসবাস করতে বাধ্য করা হতো। কুষ্ঠ হলে জীবন শেষ—এমন ভ্রান্ত ধারণার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিরা চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্য ও নানা ধরনের মানসিক যন্ত্রণার শিকার হতেন।
তবে সময়ের সঙ্গে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনসচেতনতার অগ্রগতিতে সেই চিত্র বদলেছে। চন্দ্রঘোনা মিশনারিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা, সচেতনতা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করায় কুষ্ঠ সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণা অনেকটাই কমেছে। চিকিৎসা নিয়ে বহু আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন এবং সমাজে নিজেদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানও তৈরি করেছেন।
বক্তারা বলেন, কুষ্ঠ এখন আর কোনো ভয়াবহ বা নিরাময়-অযোগ্য রোগ নয়। দ্রুত রোগ শনাক্ত করে নিয়মিত ও সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে আক্রান্ত ব্যক্তি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। তাই কুষ্ঠের লক্ষণ দেখা দিলে ভয় বা লজ্জায় গোপন না রেখে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি সহমর্মী ও মানবিক আচরণ করা জরুরি।
ওরিয়েন্টেশনে আরও বলা হয়, কুষ্ঠ আক্রান্ত ও সুস্থ ব্যক্তিদের চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের আর্থসামাজিক পুনর্বাসনেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সমাজসেবা, যুব উন্নয়ন, মহিলা বিষয়কসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদ্যমান সেবাগুলো কুষ্ঠ আক্রান্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে হলে তাদের অধিকার ও প্রয়োজন সম্পর্কে সেবাদানকারীদের সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।
আয়োজকদের মতে, কেবল চিকিৎসা নিশ্চিত করাই কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নয়। রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা, অধিকার, কর্মসংস্থান, পুনর্বাসন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং বৈষম্য থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা রয়েছে।
ওরিয়েন্টেশনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা, তাদের প্রয়োজন চিহ্নিতকরণ এবং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের করণীয় নিয়েও আলোচনা করা হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা ও সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের সংযোগ ঘটানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
The Leprosy Mission International-Bangladesh-এর আয়োজনে The Leprosy Mission Denmark ও Center for Church-Based Development (CKU)-এর সহযোগিতায় এ ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত হয়।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, এ ধরনের ওরিয়েন্টেশনের মাধ্যমে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও সচেতনতা আরও বাড়বে। পাশাপাশি কুষ্ঠ আক্রান্ত ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিক সেবা মানুষের দোরগোড়ায় আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।