পাহাড়ের আলো ডেস্ক: সেনানিবাসে বাবুর্চির কাজ দেওয়ার কথা বলে গত বছর রাশিয়ায় পাঠানো হয় লক্ষ্মীপুরের জাহাঙ্গীর আলমকে। কিন্তু খাবার তৈরি নয়, তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সরাসরি ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে।
সাত মাস পর বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে ফিরে আসেন জাহাঙ্গীর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শুরুতে প্রশিক্ষণ ছাড়াই অস্ত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে এক দিন তা চালানো শেখানো হয়। তাঁরা একসঙ্গে ১৬ জন ছিলেন যুদ্ধের ক্যাম্পে। চারজন মারা যাওয়ার পর তাঁর দিন কাটছিল আতঙ্কে। অসুস্থ হয়ে দুই মাস হাসপাতালে কাটান। সেখান থেকে পালান এবং দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে ফেরেন।
রাশিয়া কখনোই বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার ছিল না। বাংলাদেশি অদক্ষ শ্রমিকেরা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যান। মালয়েশিয়ায়ও অনেকেই যেতেন। আর্থিক দিক দিয়ে বেশি সচ্ছলেরা যান ইউরোপের দেশগুলোতে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলো রাশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোতে অনেকে যাচ্ছেন। গিয়ে অনেকেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
অন্যদিকে অবৈধ পথে ইউরোপের দেশে গিয়ে বহু মানুষ প্রতিবছর প্রাণ হারাচ্ছেন। তার মধ্যে বাংলাদেশিরাও রয়েছেন। কিন্তু অবৈধ পথে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে যাত্রা থামছে না।সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল দেশের বাইরে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরি করা। সেটার বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, বাহরাইনের মতো বাংলাদেশের কিছু বড় শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ অথবা কর্মী যাওয়া কমে গেছে। সমস্যাটি নতুন নয়, বেশ কয়েক বছরের। বিএনপি সরকার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার চেষ্টা করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত জুন মাসে মালয়েশিয়া সফর করেন। এরপর সম্প্রতি দেশটি শ্রমবাজার খোলার ঘোষণা দেয়। তবে এখনো খোলেনি। ইউরোপের দেশগুলোতেও যথেষ্টসংখ্যক কর্মী যেতে পারছে না। ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে কর্মীদের যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হওয়ার এটা একটা বড় কারণ।
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কম্বোডিয়ায় ১২ হাজার ২৬৩ জন বাংলাদেশি যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছেন। দেশটি ২০২৫ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারে ৮ নম্বর অবস্থানে উঠে এসেছে। রাশিয়ান ফেডারেশনে গেছেন ৪ হাজার ৭২৭ জন। রাশিয়া রয়েছে ১৩ নম্বর অবস্থানে। মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, লেবাননের মতো দেশের চেয়ে ২০২৫ সালে রাশিয়ায় গেছেন বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি।
সার্বিকভাবে বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশ যাওয়া কমছে। বিএমইটি বলছে, বিদেশে যেতে এ বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ছাড়পত্র নিয়েছেন প্রায় ৫ লাখ কর্মী। গত বছর একই সময়ে সংখ্যাটি ছিল প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার। তার মানে এ বছর কর্মীর ছাড়পত্র কমেছে ১ লাখ ৪০ হাজারের মতো।রাশিয়া কখনোই বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার ছিল না। বাংলাদেশি অদক্ষ শ্রমিকেরা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যান। মালয়েশিয়ায়ও অনেকেই যেতেন। আর্থিক দিক দিয়ে বেশি সচ্ছলেরা যান ইউরোপের দেশগুলোতে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলো রাশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোতে অনেকে যাচ্ছেন। গিয়ে অনেকেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, আরব আমিরাত ও কাতারের বাজার সংকুচিত। মালয়েশিয়ায় বন্ধ। দেশেও কাজ না থাকায় যেকোনো উপায়ে বিদেশে যেতে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন অনেকে, পাচারের ঘটনা ঘটছে। তাঁর দাবি, ৭০ শতাংশ কর্মী সৌদি আরবে যাচ্ছেন স্বল্প মেয়াদে। গিয়ে অনেকেই কাজ পান না।
আলী হায়দার চৌধুরী আরও বলেন, বন্ধ শ্রমবাজার চালু এবং নতুন বাজার তৈরি করতে না পারলে পাচার ও প্রতারণা কমবে না। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে কাজ করতে হবে এ খাতে।বিশ্লেষকেরা বলছেন, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, বাহরাইনের মতো বাংলাদেশের কিছু বড় শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ অথবা কর্মী যাওয়া কমে গেছে। সমস্যাটি নতুন নয়, বেশ কয়েক বছরের।
বিদেশে কর্মী পাঠানো কেন জরুরি
বাংলাদেশ থেকে ১৯৭৬ সালে বিদেশে কর্মী পাঠানো শুরু হয়। মূলত এটি বাড়তে শুরু করে নব্বইয়ের দশকে। অন্যদিকে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে বছরে কর্মী পাঠানোর গড় সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি কর্মী গেছেন ২০২৩ সালে, ওই বছর বিদেশে যান ১৩ লাখের বেশি কর্মী। সংখ্যাটি যত বড়ই হোক না কেন, বিদেশ যেতে আগ্রহী তরুণের তালিকা কখনোই ছোট হয়নি।
বাংলাদেশের তরুণ ও যুবাদের বড় অংশ বিদেশে গিয়ে নিজেদের ভাগ্য যেমন বদলাতে পেরেছেন, তেমনি তাঁদের পাঠানো অর্থে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বড় হয়েছে। গত পাঁচ অর্থবছরে বাংলাদেশিরা বছরে গড়ে ২ হাজার ৬৪৯ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়েছেন। রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে বাংলাদেশ।
দারিদ্র্য বিমোচন ও অভ্যন্তরীণ বাজার বড় হওয়ার ক্ষেত্রে দেশের তরুণদের বিদেশ যাওয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম বলে মনে করা হয়।নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশকেন্দ্রিক বাজারনির্ভরতা এখন জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সেসব দেশের কয়েকটিতে বাজার ছোট হয়েছে। অথবা নানা কারণে কর্মী পাঠানো বন্ধ।
১০টি দেশে গেছেন ৯৪% কর্মী
সমস্যা হলো, কয়েক দশক ধরে শ্রমবাজারটি গুটিকয়েক দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫ বছরে মোট ২০৩টি দেশে কর্মী পাঠানো হয়েছে। এ সময় মোট কর্মী গেছেন ১ কোটি ১০ লাখের বেশি। এর প্রায় ৭৯ শতাংশ কর্মী গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে। সব মিলিয়ে ৯৪ শতাংশ কর্মী গেছেন ১০টি দেশে।
বিদেশে কর্মসংস্থানের তালিকার শীর্ষে থাকা দেশের মধ্যে আছে সৌদি আরব, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কুয়েত, জর্ডান, বাহরাইন ও মালদ্বীপ। সবই এশিয়ার দেশ, যার মধ্যে সাতটি মধ্যপ্রাচ্যের। ৯৮টি দেশে দেড় দশকে ১০০ জন করেও কর্মী পাঠানো যায়নি। যদিও এসব দেশের অনেকগুলোর আর্থিক অবস্থা ভালো এবং শ্রমবাজারে চাহিদা রয়েছে।
নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশকেন্দ্রিক বাজারনির্ভরতা এখন জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সেসব দেশের কয়েকটিতে বাজার ছোট হয়েছে। অথবা নানা কারণে কর্মী পাঠানো বন্ধ।
মালয়েশিয়ায় ২০২৩ সালে কাজ নিয়ে যান সাড়ে তিন লাখের বেশি কর্মী। তবে অনিয়মের কারণে ২০২৪ সালের জুনে দেশটির শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। ওমানে ২০২৩ সালে কর্মী গিয়েছিলেন সোয়া লাখের বেশি। ২০২৪ সাল থেকে শ্রমবাজারটি কার্যত বন্ধ।ইশতেহারে যা আছে, তার প্রতিফলন দেখাতে হবে। সরকারের মানসিকতা বদলাতে হবে, না হলে প্রবাসী কর্মীরাই ভুক্তভোগী হবেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০২৩ সালে কর্মী গিয়েছিলেন প্রায় এক লাখ। ২০২৪ সালে দেশটিতে কর্মী গেছেন ৪৭ হাজার। ২০২৫ সালে কর্মী গেছেন ১৩ হাজার ৭৫০ জন। অর্থাৎ দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়া প্রায় বন্ধ।
বাহরাইনেও বাংলাদেশিরা অনেক দিন ধরে যেতে পারছেন না। লেবাননে রপ্তানি কম। দেশটিতে ইসরায়েলের হামলা চলছে অনেক দিন ধরে।বিদ্যমান শ্রমবাজারের পাশাপাশি আর কোথায় কোথায় নতুন শ্রমবাজার খোলা যায়, সে বিষয়ে কাজ হচ্ছে। ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো যেসব শ্রমবাজার আগে বড় ছিল, কিন্তু বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের কারণে সংকুচিত হয়ে গেছে, সেসব বাজারে বাংলাদেশের নাগরিকদের আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য আলাপ-আলোচনা চলছে।
কয়েক বছর ধরে কর্মসংস্থান বাড়ছে শুধু সৌদি আরবে। ২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক সৌদি আরব। দেশটিতে ফুটবল অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এতে অদক্ষ কর্মীর চাহিদা আছে। তবে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বলছেন, বাড়তির ধারা আগামী বছর থেকে আর না-ও থাকতে পারে।
দেশটিতে ২০২৪ সালে সোয়া ছয় লাখ বাংলাদেশি কাজের জন্য গিয়েছিলেন। গত বছর তা বেড়ে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ছাড়ায়। তবে এ বছরের প্রথম ছয় মাসে গেছেন ২ লাখ ১৫ হাজারের মতো কর্মী। অর্থাৎ কমছে। সৌদি আরবে গিয়ে চুক্তি অনুসারে কাজ না পাওয়ার অভিযোগ আছে। যে হারে কর্মী যাচ্ছেন, সে হারে কাজ নেই সেখানে।
বন্ধ থাকা শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিদ্যমান শ্রমবাজারের পাশাপাশি আর কোথায় কোথায় নতুন শ্রমবাজার খোলা যায়, সে বিষয়ে কাজ হচ্ছে। ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো যেসব শ্রমবাজার আগে বড় ছিল, কিন্তু বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের কারণে সংকুচিত হয়ে গেছে, সেসব বাজারে বাংলাদেশের নাগরিকদের আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য আলাপ-আলোচনা চলছে।’
সরকারের নানা উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে নুরুল হক বলেন, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল দেশের বাইরে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরি করা। সেটার বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে।
নতুন বাজারের নামে প্রতারণা
নতুন বাজারে কর্মী পাঠানোর নামে প্রতারণা বাড়ছে। যেমন কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশিদের নেওয়া হয় কলসেন্টারে চাকরির নামে। এরপর তাঁদের দিয়ে করানো হয় অনলাইন প্রতারণা। আন্তর্জাতিক চাপে সম্প্রতি এসব ‘স্ক্যাম সেন্টারে’ অভিযান চালিয়ে সেগুলো বন্ধ করে দিয়েছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর জুনেই ফিরে এসেছেন বাংলাদেশি ৬৪৬ কর্মী। প্রতিদিন ফিরছেন, আরও অনেকে ফেরার অপেক্ষায়।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কম্বোডিয়ার অর্থনীতি বাংলাদেশের চেয়ে ভালো নয়। সেখানে চাকরির সুযোগ কম। তারপরও সেখানে কর্মীদের পাঠানো হয় স্ক্যাম সেন্টারের জন্য। রাশিয়ায় পাঠানোর পর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কেউ কেউ পালিয়ে আসতে পেরেছেন। কেউ কেউ সেখানেই মারা যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে বার্তা পাঠাচ্ছেন।
ব্যাংককভিত্তিক ফোর্টিফাই রাইটস এবং ইউক্রেনভিত্তিক ট্রুথ হাউন্ডস নামে দুটি সংগঠন গত মার্চে জানায়, রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া শতাধিক বাংলাদেশি তরুণের মধ্যে সে সময় পর্যন্ত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন।
এদিকে উন্নত জীবনের প্রলোভনে ইতালি যেতে বিভিন্ন দেশ হয়ে লিবিয়ায় যাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। গিয়ে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, নির্যাতনের মুখে মুক্তিপণ দিতে হচ্ছে। এরপর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মারা যাচ্ছেন কেউ কেউ। আর কেউ কেউ পৌঁছাচ্ছেন ইতালি।রাশিয়ায় পাঠানোর পর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কেউ কেউ পালিয়ে আসতে পেরেছেন। কেউ কেউ সেখানেই মারা যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে বার্তা পাঠাচ্ছেন।
২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি গেছেন বিভিন্ন দেশের ৬৬ হাজার ৩১৬ জন। তাঁদের মধ্যে সমুদ্রে নিখোঁজ অথবা নিহত হয়েছেন ১ হাজার ১২৬ জন। এ বছরের জুন পর্যন্ত ১৪ হাজার ১৯৪ জন ইতালি গেছেন এই পথে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩২ শতাংশ বাংলাদেশি, ৩ হাজার ৬৯১ জন। যদিও লিবিয়া যেতে গত বছর ১০০ জন এবং এ বছর ৬৩ জন ছাড়পত্র নিয়েছেন। এর মানে মধ্যপ্রাচ্যসহ ভিন্ন দেশ হয়ে লিবিয়ায় যাচ্ছেন এসব কর্মী।
ইউরোপের কয়েকটি দেশে চাকরির প্রলোভন দিয়েও নিয়মিত প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতারিত কর্মীরা ফিরে এসে মানব পাচারের মামলা করছেন। আবার কোনো ক্ষেত্রে বিদেশে নিহত হওয়া প্রবাসীর পরিবারও মামলা করছে। প্রতিবছর মানব পাচারের মামলা বাড়ছে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মানব পাচারবিরোধী ইউনিটের (টিএইচবি) হিসাব বলছে, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৫৩৬টি মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে ১ হাজার ৬৫৭ জনকে; কিন্তু গ্রেপ্তার করা গেছে মাত্র ৩৫৩ জনকে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে পাঁচ বছরে (২০২০-২৪) হওয়া ৪ হাজার ৪২৭টি মামলার ৯৪-৯৫ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যান। পাচারকারীদের বিচার ও শাস্তি না হওয়ায় মানব পাচার থামানো যাচ্ছে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।বিশ্লেষকেরা বলছেন, লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কমিয়ে আনা দরকার। উল্লেখ্য, গত জুলাইয়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো নিয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের দায়ে করা একটি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমার পর ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার করে নেয় বিএনপি সরকার।
চাহিদার বাড়তি রিক্রুটিং এজেন্সি
অভিবাসন খাতের বেসরকারি সংগঠন রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু)বলছে, ভারতে মোট রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ১৯২, পাকিস্তানে ৪৬৪টি, নেপালে ৪১৬টি, শ্রীলঙ্কায় ২৪৮টি। সংখ্যা কম হলে নজরদারি করা সহজ হয়। বাংলাদেশে আগে এজেন্সির সংখ্যা ৮৫০ থেকে ৯০০টির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। গত আওয়ামী লীগ সরকার এটি বাড়িয়ে ২ হাজার ৪০০-এর কাছাকাছি নিয়ে যায়। গত বছর ২৫২টি নতুন এজেন্সির লাইসেন্স অনুমোদন করে অন্তর্বর্তী সরকার।
সব মিলিয়ে লাইসেন্স নিয়েছে ২ হাজার ৬৪৬টি এজেন্সি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কমিয়ে আনা দরকার। উল্লেখ্য, গত জুলাইয়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো নিয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের দায়ে করা একটি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমার পর ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার করে নেয় বিএনপি সরকার।
নিয়ম ‘মানায় উদাসীনতা’
অভিবাসন খাতে বহু ধরনের সমস্যার মধ্যে গত ১২ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেয় বিএনপি সরকার। দলটি তার নির্বাচনী ইশতেহারে যেমন পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর কথা বলেছে, তেমনি প্রতারণা ও ভোগান্তি নিরসন এবং দক্ষ শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক সনদ প্রাপ্তির সুযোগ সম্প্রসারিত করার কথা বলেছে।
অভিবাসন খাত বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর প্রথম আলোকে বলেন, নিয়ম মেনে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে উদাসীনতা আছে; তা বন্ধ হয়নি। ছাড়পত্র অনুমোদনের দায় সরকারের। যেসব দেশের নিয়োগপত্র যাচাই করা যাচ্ছে না, সেখানে কর্মী পাঠানোর দরকার কী। রাশিয়া, কম্বোডিয়ার মতো দেশে কীভাবে ছাড়পত্র দেয়। তিনি বলেন, ইশতেহারে যা আছে, তার প্রতিফলন দেখাতে হবে। সরকারের মানসিকতা বদলাতে হবে, না হলে প্রবাসী কর্মীরাই ভুক্তভোগী হবেন।বাড়িতে মশিউরের জন্য স্বজনেরা অপেক্ষা করছিলেন ঠিকই; কিন্তু তাঁর চিন্তা একটাই, পাওনাদারদের কী বলবেন?
ভুক্তভোগী অনেকেই হচ্ছেন। সৌদি আরব, কম্বোডিয়া, রাশিয়া, লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতারিত হয়ে কত কর্মী ফিরে আসছেন, তার একটা ধারণা পাওয়া যায় ট্রাভেল পাস নেওয়ার হিসাব থেকে। বিমানবন্দর সূত্র বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ট্রাভেল পাস (ভ্রমণের অনুমতিপত্র) নিয়ে ফিরেছেন ১৫ হাজার ২৪৫ জন। এরপর শুধু এপ্রিলেই ফিরেছেন ৮ হাজার ২১৫ জন।
সব হারিয়ে পাসপোর্ট না থাকা এসব কর্মী পুলিশের হাতে আটক হয়ে ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। গত মঙ্গলবার লিবিয়ায় বন্দিজীবন কাটিয়ে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় দেশে ফেরে বাংলাদেশিদের একটি দল। ওই দলে ছিলেন মশিউর রহমান নামে মাদারীপুরের এক যুবক। তিনি বলছিলেন, নিজের খাবার হোটেলের ব্যবসা ছেড়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। ৩২ লাখ টাকা খুইয়ে কোনোরকমে প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরে আসতে হয়েছে তাঁকে।
বাড়িতে মশিউরের জন্য স্বজনেরা অপেক্ষা করছিলেন ঠিকই; কিন্তু তাঁর চিন্তা একটাই, পাওনাদারদের কী বলবেন? সূত্র: প্রথম আলো।