মোঃ আরিফুল ইসলাম, খাগড়াছড়ি: মাত্র ছয় বছর বয়সে মাকে হারিয়েছে তানিয়া। বাবা দিনমজুর হওয়ায় অভাবের সংসারে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। পরিবারের বোঝা কিছুটা কমাতে দেড় বছর আগে তাকে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠানো হয় ঢাকায়। স্বজনদের আশা ছিল, সেখানে অন্তত দু’বেলা খাবার ও নিরাপদ আশ্রয় পাবে শিশুটি। কিন্তু বাস্তবে সেই আশাই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, ঢাকায় গৃহকর্মী হিসেবে যাওয়ার পর থেকেই তানিয়ার ওপর চালানো হয়েছে অমানুষিক নির্যাতন। দিনের পর দিন তাকে মারধর করা হয়েছে, শরীরের বিভিন্ন স্থানে দেওয়া হয়েছে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা। এমনকি তাকে টয়লেটের ভেতর বন্দী করে রাখা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। নির্যাতনের কারণে তার শরীরের বিভিন্ন অংশে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে। পচন ধরেছে পা ও পিঠে।
মুমূর্ষু অবস্থায় তানিয়াকে বর্তমানে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে থাকা শিশুটির শরীরজুড়ে নির্যাতনের ভয়াবহ চিহ্ন। ক্ষতস্থানগুলো থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে সে। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, দ্রুত উন্নত চিকিৎসা না পেলে তার অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হতে পারে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দেড় বছর আগে অভাবের কারণে তানিয়াকে ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ দেওয়া হয়েছিল। নিয়মিতভাবে তার সঙ্গে যোগাযোগও রাখতে পারেনি পরিবারটি। দীর্ঘ সময় পর যখন তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনা হয়, তখন তার শারীরিক অবস্থার ভয়াবহতা দেখে স্বজনেরা হতবাক হয়ে পড়েন। শরীরের বিভিন্ন স্থানে পোড়ার দাগ, আঘাতের চিহ্ন এবং পচন ধরা ক্ষত নিয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
তানিয়ার পরিবারের অভিযোগ, গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করার সময় তাকে পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না। অসুস্থ হলেও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। বরং অসুস্থতা ও দুর্বলতার মধ্যেই তাকে কাজ করতে বাধ্য করা হতো। কোনো অপরাধের শাস্তি হিসেবে কিংবা কাজের সামান্য ভুলের জন্য তাকে মারধর ও গরম বস্তু দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো বলে অভিযোগ পরিবারের।
একজন শিশুর ওপর এমন নির্যাতনের ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, তানিয়ার মতো অসহায় শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠানো হলে তারা সহজেই নির্যাতনের শিকার হয়। অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের কাছেও নির্যাতনের খবর পৌঁছায় না। ফলে নির্যাতন চলতে থাকে দিনের পর দিন।
তানিয়ার চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা, ওষুধ এবং আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। একই সঙ্গে তারা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। শিশুটির ওপর সংঘটিত নির্যাতনের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত শিশুদের নিরাপত্তা ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। কোনো শিশুকে নির্যাতন, বন্দী করে রাখা, অনাহারে রাখা বা আগুনে ছ্যাঁকা দেওয়া গুরুতর অপরাধ। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত হস্তক্ষেপ জরুরি।
তানিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা শিশুটির উন্নত চিকিৎসা ও ন্যায়বিচারের জন্য সবার সহযোগিতা চান। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা এই শিশুটিকে বাঁচাতে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তার পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।