“মাদকের শেষ শিকড় উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত অভিযান চলবে”- ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী

শেয়ার করুন

খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক: “আমরা এমন একটি সম্প্রীতির বাংলাদেশ চাই, যেখানে পাহাড়ি-বাঙালি, মুসলিম-হিন্দু কিংবা কোনো পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। প্রত্যেক মানুষ এ দেশের নাগরিক হিসেবে নিজের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচবে। আমরা সেই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আমাদের বর্তমান নির্বাচিত সরকারেরও এটাই প্রত্যাশা।”

খাগড়াছড়িতে মাদকবিরোধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী।

২৫ আগস্ট মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৩টায় খাগড়াছড়ি শহরের টাউন হল অডিটোরিয়ামে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে মাদকবিরোধী সুধী সমাবেশ ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মাদকবিরোধী একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি বের করা হয়। র‍্যালিটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে টাউন হল প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়।
সমাবেশে খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো. মোরতোজা আলী খাঁনের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী।

ডিআইজি বলেন, “আমরা আমাদের পারস্পরিক সম্প্রীতি অটুট রাখব। কেউ যদি এই সম্প্রীতি বিনষ্ট করার চেষ্টা করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ হব। আবহমানকাল থেকেই এ অঞ্চলে বাঙালি-পাহাড়ি, মুসলিম-হিন্দুসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। আমাদের এই সম্প্রীতি অটুট থাকবে, ইনশাআল্লাহ।”
মাদককে আইনশৃঙ্খলার বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে সর্বাত্মক অভিযানের ঘোষণা

মাদকের ভয়াবহতার কথা তুলে ধরে ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, “আমি কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছি। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলার সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো মাদক। এই মাদক আমাদের সমাজকে ভয়াবহভাবে কলুষিত করছে। মাদকের ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মাদকাসক্ত ব্যক্তি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে নিজের বাবা-মা, এমনকি বন্ধুকেও হত্যা করছে। এটি সমাজের জন্য একটি ভয়াবহ বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
তিনি বলেন, “একটি সুন্দর আগামী ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আমাদের মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে হবে। আজকের এই তরুণ প্রজন্মই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। তারা মাদকের অন্ধকার জগতে হারিয়ে যেতে চায় না। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে এবং দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান শুরু করার এখনই সময়।”
ডিআইজি বলেন, “আমরা সেই অভিযান শুরু করেছি এবং এ কাজে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা সবাই মিলে সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করবই, ইনশাআল্লাহ। এই সমাজে মাদকের কোনো স্থান থাকবে না।”
মাদক কারবারে জড়িত কাউকে ছাড় নয়
মাদকের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে ডিআইজি বলেন, “মাদকের সঙ্গে যে বা যারা জড়িত, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মাদক সেবনকারী, ব্যবসায়ী, বহনকারী, পাচারকারী কিংবা মাদক কারবারে অর্থ বিনিয়োগকারী—প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “মাদকের সাপ্লাই চেইন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে। বাংলাদেশকে মাদকমুক্ত না করা পর্যন্ত এই সর্বাত্মক অভিযান চলবে। মাদকের শেষ শিকড় উপড়ে না ফেলা পর্যন্ত অভিযান আরও জোরদার ও বেগবান করা হবে।”
দেশীয় মদ নিয়ে সতর্কতার আহ্বান
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী দেশীয় মদ প্রসঙ্গে ডিআইজি বলেন, “আমাদের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর—চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদের—দেশীয় চোলাই মদ তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। এটি নিয়ে আমাদের আপত্তি নেই। নিজেদের জন্য নিজেরা তৈরি করে তা সেবন করলে আইনি বাধা নেই। কিন্তু এটি অন্য সম্প্রদায়ের কাছে বিক্রি করা যাবে না এবং বিক্রির উদ্দেশ্যে বহনও করা যাবে না।”
তিনি বলেন, “তবে এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। ছোটবেলা থেকে নিয়মিত সেবনের ফলে আসক্তির প্রবণতা তৈরি হতে পারে। আর মদ্যপান করে মাতলামি করা, রাস্তাঘাটে হেলে-দুলে চলাফেরা করা বা জনশৃঙ্খলা নষ্ট করা অপরাধ। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।”
সন্তানদের মাদক থেকে দূরে রাখতে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান
অভিভাবকদের উদ্দেশে ডিআইজি বলেন, “আমাদের সন্তানদের মাদক থেকে দূরে রাখতে হবে। সমাজে মাদক সহজলভ্য থাকলে তরুণরা ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে পড়তে পারে। এতে তাদের জীবন, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সন্তানদের প্রতি পরিবারকে আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে।”
সমাজে মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীদের প্রভাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আজ মাদক কারবারি, মাদকসেবী ও সন্ত্রাসীদের ভয়ে অনেকে কথা বলতে চান না। কিন্তু আমরা কি এই দেশকে সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের রাজ্যে পরিণত করব? নাকি সমাজের সুশীল ও ভদ্রজনদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করব? আমরা সমাজের ভার মুরব্বি ও সম্মানিত মানুষের হাতে তুলে দিতে চাই। এই সমাজ মাদকসেবী কিংবা মাদক কারবারিদের কথায় চলবে না।”
সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান
মাদক কারবারিদের সামাজিকভাবে প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়ে ডিআইজি বলেন, “প্রত্যেকের নিজ নিজ জায়গা থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। জাতিকে রক্ষা করতে হলে, দেশকে রক্ষা করতে হলে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে দাঁড়াতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।”
তরুণ প্রজন্মের মাদকবিরোধী অবস্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আজকের শিশু-কিশোর ও তরুণরা মাদক চায় না। তাদের হাততালিই প্রমাণ করে, তারা মাদকমুক্ত সমাজে বেড়ে উঠতে চায়। তারা সুস্থ পরিবেশে বড় হয়ে আগামী দিনের সুস্থ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়।”
সবশেষে তিনি বলেন, “আপনার সন্তানদের সুস্থ ও সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে মাদকের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে আপনাদের সবাইকে অংশ নিতে হবে। জননিরাপত্তা, সামাজিক শৃঙ্খলা ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে আমরা সবসময় আপনাদের পাশে আছি এবং থাকব। এটি শুধু কথার কথা নয়—এটি আপনাদের প্রতি আমার অঙ্গীকার।”
সমাবেশে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হাসান মারুফ, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম এন আবছার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মিজানুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) কামরুল ইসলামসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।।